বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন ছিল নুসরাতের

ঢাকা, ২৪ আগস্ট, ২০১৯ | 2 0 1

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন ছিল নুসরাতের

আবদুল্লাহ আল-মামুন, ফেনী ৪:১০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৮, ২০১৯

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন ছিল নুসরাতের

‘মা দাখিলেতো (এসএসসি) আমি ৪.৯০ পেয়েছি, আলিমেও ইনশাআল্লাহ ভালো রেজাল্ট করলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাই’।

আলিম (এইসএসসি) এর ভালো ফলাফলের আশাবাদ ব্যক্ত করে মা শিরিন আখতারকে বলেছিলেন ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার মেধাবী ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি।

কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস মাদ্রাসার অধ্যক্ষের মদদে নিজের সহপাঠীর দেয়া আগুনেই পুড়ে মরতে হয়েছে নুসরাতকে।

এই প্রতিবেদককে এমনটাই বলছিলেন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার।

বুধবার (১৭ জুলাই) প্রকাশিত হয়েছে এইসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল। ফলাফলে এসেছে নুসরাতের নামও। যৌন নিপীড়নের পর হুমকি-ধমকি মাথায় নিয়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে দুটি পরীক্ষায় অংশ নেন নুসরাত। বুধবার সেই পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়।

মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা মো. হুসাইন বলেন, ফলাফল বিবরণীতে দেখা যায়, কোরআন মাজিদ, হাদিস ও উসুলে হাদিস পরীক্ষায় নুসরাত জাহান রাফি ‘এ’ গ্রেড পেয়েছে। সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে এবার আলিম পরীক্ষায় নুসরাতসহ ১৭৫ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এদের মধ্যে ১৫২ জন পাস করেছে। নুসরাতসহ ২৭ জন ফেল করে। এ মাদ্রাসায় এবার পাসের হার ৮৬.৮৬ শতাংশ।

তিনি বলেন, দুই বিষয়ে পরীক্ষা দেয় নুসরাত। সবগুলো পরীক্ষা দিতে পারলে ভালো ফল করতো। লেখাপড়ার প্রতি মেয়েটার কতটা আগ্রহ থাকলে এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পরীক্ষায় অংশ নেয়।

পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নুসরাতের সহপাঠী ও স্বজনরা শোক ধরে রাখতে পারছেন না। বুধবার মাদ্রাসায় পরীক্ষার ফলাফল জানতে আসা শিক্ষার্থীরা নুসরাতের জন্য কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় উপস্থিত শিক্ষকদের চোখেও নেমে আসে শোকের অশ্রু। এসময় মাদ্রাসায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

ফলাফল জানতে আসা নুসরাতের সহপাঠী তামান্না, নিশাত সুলতানা, নাসরিন সুলতানা, সাইফুল ইসলাম ও জাহেদুল ইসলাম জানান, নুসরাতেরও পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে এখন আনন্দে থাকার কথা ছিল। কিন্তু নুসরাত আজ আমাদের মাঝে নেই। দুটি পরীক্ষায় সে ‘এ’ গ্রেড পেয়েছে। বাকি পরীক্ষা দিতে পারলে সে ভালো ফল করতো।

এদিকে আলিম পরীক্ষার ফল প্রকাশের খবর পাওয়ার পর থেকে কান্না থামছে না নুসরাতের স্বজনদের। নুসরাতের মা শিরিনা আক্তারের বিলাপ যেন থামতেই চায় না।

ফল প্রকাশের পর নুসরাতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় অঝোরে কাঁদছেন নুসরাতের মা। তিনি বলেন, আমার মেয়ে অনেক মেধাবী ছাত্রী ছিলো, স্বপ্ন ছিলো অনেক বড় হবে ভালো কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, অনার্স করবে। কিন্তু সন্ত্রাসীরা আমার মেয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দিলো না। তারা আমার মেয়েকে পুড়িয়ে মেরেছে। এখন দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই দাবি আমার মেয়ের হত্যার বিচারটি যেন দ্রুত কার্যকর হয়।

নুসরাতের ভাই মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, ‘নুসরাতের সহপাঠীদের অনেকেই আমাকে ফোন দিয়েছে, তারা ভালো ফলাফল করেছে, তাদের বাড়িতে আনন্দের আবহ। কিন্তু আমাদের বাড়ি শোকার্ত। আমার বোনও পরীক্ষা দিলো অনেক ভালো ফল করতে পারতো।

২০১৯ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার দ্বিতীয় দিন (৬ এপ্রিল) নুসরাত রাফির শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয় খুনিরা। পরে ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নুসরাত মারা যান। ফলে কোরআন ও হাদিস বিষয়ের পরীক্ষা বাদে বাকি পরীক্ষাগুলো দেয়া হয়নি তার।

এর আগে গত ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী মাদ্রাসার ছাদে কৌশলে ডেকে নেন হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা। সেখানে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। আগুনে নুসরাতের শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে যায়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। এর চারদিন পর ১০ এপ্রিল আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হয়।

ফলাফল প্রকাশের দিনে নুসরাত হত্যাকাণ্ড মামলায় ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বুধবার বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আস সামশ জগলুল হোসেনের আদালতে বেলা ২টায় এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গত ১৬ জুন শাহবাগ থেকে মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

উল্লেখ্য, গত ২৭ মার্চ নুসরাত জাহান রাফিকে সোনাগাজী সিনিয়র মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা শ্রেণিকক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করেন। বর্তমানে নুসরাতের হত্যা মামলাটি ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশীদের আদালতে বিচারাধীন।

এ মামলায় এখন পর্যন্ত  ২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ  ও জেরা শেষ হয়েছে। এর আগে গত ২৭ জুন মামলার বাদী ও প্রথম সাক্ষী নুসরাতের বড়ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। শুরুর পর থেকে প্রতি কর্মদিবসেই আদালত সাক্ষ্যগ্রহণ চালিয়ে যাচ্ছেন।

এইচআর

 

চট্টগ্রাম: আরও পড়ুন

আরও