খুনের নেশায় উন্মত্ত মোখলেছ, বাকরুদ্ধ রাধানগরবাসী

ঢাকা, ১৭ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

খুনের নেশায় উন্মত্ত মোখলেছ, বাকরুদ্ধ রাধানগরবাসী

জহির শান্ত, কুমিল্লা ১০:৩৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০১৯

খুনের নেশায় উন্মত্ত মোখলেছ, বাকরুদ্ধ রাধানগরবাসী

বুধবারের সকাল ১০টা। কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার রাধানগর গ্রামের রিকশাচালক মোখলেছ (৩৫) বাড়ি ফিরে সঙ্গে সঙ্গেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে চুপচাপ। হাতে তার লম্বা-ধারালো ছেনি চোখে যেন রক্তের নেশা!

এরপরই শুরু হয় খুনের নেশায় উন্মত্ত এক রিকশাচালকের বীভৎস্যতা; প্রতিবেশীর রক্ত নিয়ে খেলা।

যাকে সামনে পাচ্ছে তাকেই কোপাতে থাকে, কেউ বাঁচাতে এলে ধারালো ছেনির আঘাতে রক্তাক্ত হচ্ছে সেও।

এভাবেই একে একে মা-সন্তানসহ ৪ জনকে হত্যা করে মোখলেছ। রক্তাক্ত জখম হয়েছেন আরো ৭/৮ জন।

বৃষ্টিভেজা সকালের এ বীভৎস্যতায় স্তব্ধ-হতবিহব্বল হয়ে পড়ে রাধানগরবাসী। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল বাড়তে থাকলে সবাই গণপিটুনি দেয় মোখলেছকে। প্রাণ হারায় সে।

মোখলেছের হামলার শিকার হয়েছেন রাধানগর গ্রামের নুরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী নাজমা বেগম। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন নুরুল। হামলায় নিহত হয়েছেন নাজমা বেগম।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে নুরুল ইসলাম জানান, সে বাড়ির লোকজনকে যেভাবে একের পর এক কুপিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল এটাতো কেবল সিনেমাতেই সম্ভব। যে মোখলেছ কখনো সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতো না, সে এসব কি কিরছে? কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই চোখের সামনে আরো কয়েকজনকে কুপিয়ে আমার স্ত্রীকেও কোপাতে থাকে। আমি দৌড়ে গেলাম, কিন্তু নাজমাকে বাঁচাতে পারিনি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেবিদ্বারের রাধানগর গ্রামের মর্তুজ আলীর ছেলে মোখলেছুর রহমান। পেশায় রিকশাচালক। বুধবার সকাল ১০টার দিকে রিকশা চালিয়ে বাড়িতে এসে ধারালো লম্বা ছেনি নিয়ে ঘরের বাইরে আসে। প্রথমে প্রতিবেশী নুরুল ইসলাম, তার স্ত্রী নাজমা বেগম ও মা মাজেদা বেগমকে কুপিয়ে মারাত্মক আহত করে। এতে ঘটনাস্থলেই নাজমার মৃত্যু হয়। পরে ঘাতক একই বাড়ির মৃত শাহ আলমের শিশুপুত্র আবু হানিফকে (১০) এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। এ সময় হানিফের মা আনোয়ারা বেগম ছেলেকে বাঁচাতে দৌড়ে গেলে ঘাতক মোখলেছ তাকেও কুপিয়ে হত্যা করে।

মা ও ছেলের মৃত্যু নিশ্চিত করে মোখলেছ রক্তমাখা উন্মুক্ত ধারালো ছেনি নিয়ে বাড়িতে ও রাস্তায় ফাহিমা, রাবেয়া, জাহানারাসহ ৪ জনকে কুপিয়ে আহত করে। অবস্থা বেগতিক দেখে স্থানীয় মসজিদের মাইকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে এলাকার লোকজন তাকে পিটিয়ে হত্যা করে।

আহত নুরল ইসলাম, ফাহিমা , রাবেয়া বেগম, মাজেদা বেগম ও জাহানারা বেগমকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এ ঘটনার পর পুলিশ মোখলেছের স্ত্রী রাবেয়া বেগম ও তার ভাইয়ের স্ত্রী (ভাবী) মরিয়ম আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসে।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মোখলেছের স্ত্রী জানান, তার স্বামী মাদকাসক্ত নয়, তবে মাঝে মধ্যে মাথাব্যথার ট্যাবলেট খেত।

রাবেয়ার ভাষ্য, ‘সে (মোখলেছ) খুব শান্ত স্বভাবের ছিল, কেন যে এমন করলো! আমি কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘর থেকে ধারালো ছেনি নিয়ে বাইরে গিয়ে যাকে সামনে পেয়েছে তাকেই কুপিয়েছে। আমি বাধা দিতে চাইলে আমার দিকেও তেড়ে আসে, দৌড়ে পালিয়ে রক্ষা পাই।’

এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) সাখাওয়াৎ হোসেনসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ ঘটনায় এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। খবর পেয়ে এলাকার হাজার হাজার লোক ঘটনাস্থলে ভিড় করে।

জানতে চাইলে দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল আনোয়ার বলেন, মোখলেছ তার ধারালো ছেনি দিয়ে ৮/৯ জনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়েছিলো। এদের মধ্যে ৪ জন মারা যায়। পরে এলাকার লোকজন তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে।

ওসি বলেন, হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনো অসম্পষ্ট, তাই বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় পৃথক দুটি হত্যা মামলার প্রক্রিয়া চলছে।

এইচআর

আরও পড়ুন...
কুমিল্লায় ৪ জনকে কুপিয়ে হত্যার পর গণপিটুনিতে ‘ঘাতক’ নিহত

 

চট্টগ্রাম: আরও পড়ুন

আরও