মাঠের ধানে সোনালি আভা, কৃষকের মুখে হাসি (ভিডিও)

ঢাকা, সোমবার, ২০ মে ২০১৯ | ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

মাঠের ধানে সোনালি আভা, কৃষকের মুখে হাসি (ভিডিও)

জহির শান্ত, কুমিল্লা ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ, মে ০২, ২০১৯

কুমিল্লায় সবুজের খোলস ছাড়িয়ে পাকতে শুরু করেছে মাঠের বোরো ধান। দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত ফসলের জমিতে তাকালেই চোখে পড়ে বাদামি-সবুজ চিরল পাতার ফাঁক গলে মাথা উঁচিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে সোনালি রঙের আভা। বৈশাখের তপ্ত রোদ গায়ে মেখে বাতাসে দোল খেতে থাকা বোরো ধানের স্বর্ণরঙ্গ সে আভায় অধিক রঙিন হয়ে উঠেছে কৃষকের মুখের হাসি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমিল্লার অনেক স্থানে ইতিমধ্যে ধান কাটা শুরু হয়ে গেলেও কাস্তে হাতে পুরোদমে মাঠে নামার সময় আসেনি এখনো। কষ্টের সৃজিত সোনালি ধান গোলায় তুলতে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ব্যস্ত হয়ে পড়বেন কুমিল্লার কিষান-কিষানিরা। কৃষক পরিবারগুলোতে চলছে সে মুহূর্তেরই প্রস্তুতি।

কুমিল্লার বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া, দেবীদ্বার, মুরাদনগর, আদর্শ সদর উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে বোরোর বাম্পার ফলনের চিত্র। বসন্তের শিলাবৃষ্টিতে ফসলের কিছুটা ক্ষতি হলেও প্রকৃতি এ বছর দু হাত ভরে দিয়েছে কৃষকদের। বোরোর ফলন হয়েছে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো।

যদিও ইতোমধ্যেই বাজারে ধানের দরের কিছুটা মন্দাভাব কৃষকদের মাঝে চিন্তার ছাপ ফেলেছে। তার পরও কষ্টে সৃজিত ফলন আনন্দচিত্তেই ঘরে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। মাঝের কালবৈশাখীর ছোবলের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত শিলার আঘাত না আসলে কৃষকের মানে আনন্দের মাত্রা বেড়ে যেত বহুগুণ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কুমিল্লায় এ বছর বোরোর আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার ৪৫৭ হেক্টর জমিতে। যা ছিল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ হাজর হেক্টর বেশি। তেমনিভাবে ফলনও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে বলে আশা কৃষি কর্মকর্তাদের। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর হেক্টরপ্রতি বোরো ধান উৎপাদন হবে প্রায় ৪.৭ টন।

জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি কৃষক পরিবারেই নতুন ধান ঘরে তোলার প্রস্তুতি চলছে। এরই মধ্যে অনেকে আবার ধান কাটা শুরুও করে দিয়েছেন। তাদের উঠানজুড়ে নতুন ধানের মৌ-মৌ গন্ধ। মাঠে চলছে ধান কাটার উৎসব; বাড়িতে মাড়াইয়ের কাজ। আর এসব কাজে কৃষকদের পাশাপাশি ব্যস্ত কিষানিরাও।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই কুমিল্লায় পুরোদমে শুরু হবে নতুন ধান গোলায় তোলার উৎসব। এ আয়োজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়বে জেলার ১৭টি উপজেলার প্রতিটি কৃষকের ঘরে।

তবে আছে কিছুটা শঙ্কাও। যদি আবারো হানা দেয় কালবৈশাখী কিংবা শুরু হয় টানা ভারী বর্ষণ। ভোগান্তির সঙ্গে বাড়বে উৎপাদন খরচও। কৃষকদের চাওয়া, বৈশাখের দাবানাল কমে গিয়ে আবহাওয়া যেন অনুকূলেই থাকে।

কুমিল্লার মাঠজুড়ে সোনালি রঙের আভা ছড়াতে থাকা কৃষিজমির আলপথ মাড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে কথা হয় ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বড় ভাঙ্গাইন্না (জিরুইন) এলাকার কৃষক ওয়ালী খান রাজুর সঙ্গে। কলেজপড়ুয়া ছেলে ফয়সাল খানকে সঙ্গে নিয়ে ধানক্ষেতের আল থেকে ঘাস কাটছিলেন তিনি।

বিকেলের নরম আলোয় ধানের ছড়ায় হাত বোলাতে বোলাতে কৃষক রাজু বলেন, কালবৈশাখীর ছোবলের সঙ্গে শিলাবৃষ্টির আঘাতে ফসলের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। নাহলে এবার গতবারের চেয়েও ভালো ফলন পাওয়া যেত।

তিনি বলেন, তারপরও বোরো ধানের ফলন এ বছর ভালোই হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী ৭-৮ দিনের মধ্যেই পুরোদমে ধানকাটা শুরু হয়ে যাবে।

 ইতোমধ্যেই যারা ধানকাটা শুরু করেছেন—এমন কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মৌসুমের শুরুতেই শ্রমিক সংকটে পড়েছেন তারা। একদিকে বাজারে ধানের দাম কম; অপরদিকে শ্রমিকের দাম বেশি। প্রচণ্ড গরম ও অধিক পরিশ্রমের কারণে শ্রমিকরা এখন আর ধানকাটার কাজে আসতে চান না। তারপরও অল্প সংখ্যক শ্রমিক মিললেও পারিশ্রমিক গুনতে হয় দ্বিগুণ।

বুড়িচং উপজেলার ভরাসার এলাকার কৃষক আবদুল হালিমের মতে, একে তো পারিশ্রমিক বেশি, তার ওপর শ্রমিক খুঁজে পাওয়াটাই এখন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে ৩০০-৩৫০ টাকায় একজন শ্রমিক পাওয়া যেত, সেখানে এখন ৫০০ টাকায় মিলছে না।

এ বছর কুমিল্লায় বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপ-পরিচালক দিলীপ কুমার অধিকারী।

তিনি বলেন, কুমিল্লায় কৃষকদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে গিয়ে কৃষকদের পরামর্শ প্রদান করেছেন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা। সর্বোপরি সকরারি সকল প্রকার সহযোগিতা আর কৃষকদের পরিশ্রমের ফলেই এ বছর বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে কুমিল্লায়।

জেডএস/এমএ