নুসরাত হত্যার শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা দিলেন শামীম-নূর

ঢাকা, শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৯ | ১৩ বৈশাখ ১৪২৬

নুসরাত হত্যার শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা দিলেন শামীম-নূর

ফেনী প্রতিনিধি ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৬, ২০১৯

নুসরাত হত্যার শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা দিলেন শামীম-নূর

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ছাদে ডেকে নেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি।

এরপর মামলা তুলে নিতে রাজি না হওয়ায় তিনজন মিলে তাকে ছাদে শুইয়ে ফেলেন। পরনের ওড়না দু’ভাগ করে হাত-পা বাঁধা হয়।

এক পর্যায়ে নুসরাতের গলা থেকে পা পর্যন্ত এক লিটার কেরোসিন ঢেলে ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আগুন পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ার পরই পাঁচজন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসেন।

গত রোববার ফেনীর আদালতে হত্যা মামলা আসামি মাদ্রাসা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম ও নূর উদ্দিন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তাদের জবানিতে নুসরাত হত্যার শ্বাসরুদ্ধকর তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনোজ কুমার মজুমদার।

তিনি জানান, পাঁচজন মিলে কীভাবে নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়েছিল, তার সবই আদালতের কাছে বর্ণনা করেছেন আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম।

জবানবন্দিতে পাওয়া সব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলেও জানান বনোজ কুমার।

প্রসঙ্গত, নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিমের পরীক্ষার্থী ছিলেন। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে এর আগেও ওই ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে।

নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেয়া হচ্ছিল।

এরই মধ্যে গত ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এ সময় তাকে কৌশলে একটি বহুতল ভবনে ডেকে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। সেখানে তার গায়ে দাহ্য পদার্থ দিয়ে আগুন দেয়া হয়।

গত ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন নুসরাত মারা যান। নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার ঘটনার পর গত ৮ এপ্রিল তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে সোনাগাজী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নম্বর ১০)।

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে আগুন লাগানোর বর্ণনা দিতে গিয়ে শাহাদাত বলেছেন— সকাল পৌনে ৯টার দিকে বান্ধবী নিশাতকে মারধরের কথা বলে নুসরাতকে ডাকতে যান পপি। তখন তারা নিচতলার শ্রেণিকক্ষ থেকে তৃতীয় তলার একটি কক্ষে এসে অবস্থান নেন। কিছুক্ষণ পর পপি ও নুসরাত ছাদে ওঠেন। তাদের পেছন পেছন ওঠেন শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে কামরুন্নাহার মনি (১৮)। এরপর তৃতীয় তলা থেকে তারা তিনজন ছাদে যান।

ছাদে ওঠার পর পপি প্রথমে নুসরাতকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে বলেন। তিনি তখন নিশাতকে ছাদে খুঁজে না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর মনিও তাকে মামলা তুলে নিতে বলেন।

নুসরাত জবাবে বলেছিলেন, ‘আমার গায়ে কেন হাত দিল। আমি মামলা তুলে নেব না। আমি এর শেষ দেখব।’

নুসরাতের এই জবাবে ক্ষুব্ধ শাহাদাত পেছন থেকে এক হাত দিয়ে তার মুখ এবং অন্য হাতে তার হাত চেপে ধরেন। পপি তখন নুসরাতের পা চেপে ধরেন। আর মনি তার শরীর চেপে ধরেন। তিনজন মিলে নুসরাতকে ছাদের মেঝেতে ফেলে দেন। এ সময় পপিকে তারা কৌশলে ‘শম্পা’ বলে ডাক দেন।

জবানবন্দিতে শাহাদাত বলেছেন, নুসরাতকে শুইয়ে ফেলার পর ওড়না দুই টুকরো করে তার হাত ও পা বেঁধে ফেলেন জোবায়ের। জাবেদ তখন তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে দেন। এরপর শাহাদাতের চোখের ইশারায় জোবায়ের পকেট থেকে দিয়াশলাই বের করে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন।

এরপর পাঁচজনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসেন। নামতে নামতেই তিনজন বোরকা খুলে কাপড়ের নিচে ঢুকিয়ে ফেলেন। ছাত্রী দু’জন মাদ্রাসাতেই তাদের পরীক্ষার কক্ষে চলে যান। বাকি তিনজন পালিয়ে যান।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, নুসরাত হত্যার ঘটনায় শাহাদাত ও নূর উদ্দিন গত রোববার ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইনের আদালতে ১১ ঘণ্টা ধরে ৫৭ পৃষ্ঠার জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেছেন।

অধ্যক্ষের মুক্তি দাবির আন্দোলন ও বোরকা কেনার জন্য সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম তাদের ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন বলেও শাহাদাত হোসেন শামীম জবানবন্দিতে দাবি করেছেন।

তিনি জানান, ঘটনার দিন সকাল ৮টার দিকে তিনি সোনাগাজী বাজারে যান। তখন তার চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে মনি তাকে একটি পুরনো ও দুটি নতুন বোরকা দেন। তিনি তাকে পপির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সঠিকভাবে কাজ করতে বলে বাজারে কেরোসিন কিনতে যান।

এক লিটার কেরোসিন কিনে শাহাদাত ‘ডাবল পলিথিনে’ করে নিয়ে আসেন। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি, মাদ্রাসাছাত্র জোবায়ের আহম্মেদ (২০) ও জাবেদ হোসেন (১৯) সাইক্লোন শেল্টারের (মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবন) নিচতলার শ্রেণিকক্ষে বসেন।

ফেনী জেলা পিবিআই’র অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান বলেন, ‘পপিকে আগেই গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এরপর ‘শম্পা’ বা ‘চম্পা’ নাম প্রকাশ হওয়ার পর তাকে গ্রেফতারে পুলিশ, র‌্যাব, সিআইডি ও পিবিআই হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। কিন্তু, কোনো সংস্থার পক্ষে ওই নামে কাউকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এরপর নূর ও শামীম গ্রেফতার হওয়ার পর এ ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হয়। আদালতের জবানবন্দিতে ‘শম্পা’ নাম নিয়ে বিভ্রান্তির অবসান ঘটে। আসলে পপিই শম্পা।’

এএএম/আইএম
আরও পড়ুন...
নুসরাত হত্যায় ২ সন্দেহভাজন আটক
নুসরাত হত্যার কথা স্বীকার করলো শামিম ও নুর উদ্দিন
নুসরাত হত্যাকাণ্ড: নূর-শামীম আদালতে

নুসরাতের স্মরণে বর্ষবরণ উৎসব আয়োজন স্থগিত: ইউএনও
নুসরাতের বাড়িতে মওদুদরা

নুসরাতের কবর জিয়ারতে যাচ্ছেন বিএনপি নেতারা
নুসরাত হত্যায় ছাত্রলীগ নেতা শামীম গ্রেফতার
বোরখা পরে ছাদে ছিল শাহাদাতসহ চারজন, পাহারায় নূর উদ্দিনরা (ভিডিও)
নুসরাতের কবর জিয়ারতে যাচ্ছেন বিএনপি নেতারা
বোরখা পরে ছাদে ছিল শাহাদাতসহ চারজন, পাহারায় নূর উদ্দিনরা
নুসরাতের শোকে অসুস্থ রাশেদ হাসপাতালে ভর্তি
নুসরাত হত্যাকাণ্ড: জাবেদ ৭ দিনের রিমান্ডে