সপরিবারে আত্মহত্যার হুমকির ভিডিও ভাইরাল

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

সপরিবারে আত্মহত্যার হুমকির ভিডিও ভাইরাল

জহির শান্ত, কুমিল্লা ৮:৫৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০১৮

সপরিবারে আত্মহত্যার হুমকির ভিডিও ভাইরাল

কুমিল্লায় পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ পাঁয়তারার প্রতিবাদে এবং দখলদারদের হাত থেকে ৩০৬ শতক ভূমি রক্ষার্থে ফেইসবুকে ভিডিও আপলোড করে সপরিবারে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছেন রাজা কামাল নামে এক ব্যক্তি। ‘হেল্পলেস’ শিরোনামে ৬ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটি ফেসবুকে আপলোড হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। রাজা কামাল কুমিল্লা মহানগরীর দক্ষিণ চর্থা থিরাপুকুর পাড় এলাকার প্রয়াত ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পুত্র।

ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘…আমি যে জায়গায় বসে আছি এটা আমার বাপ-দাদার সম্পদ। সিএস/আরস খতিয়ান ও খাজনা রশিদ আমার নামে থাকা সত্ত্বেও বিএস খতিয়ানে কিছুটা ঝামেলা রয়েছে। এ সংক্রান্তে আদালতে মামলা চলছে। তা সত্ত্বেও কিছুদিন পূর্বে আর্মির সার্জেন্ট পরিচয় দিয়ে আমাকে বাড়ি ছাড়ার হুমকি দিয়ে গালমন্দ করে। তিনি বলেন, এখান থেকে আমাকে উঠে যেতে হবে, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ জায়গা ক্রয় করেছেন। আমার নামে তিনটি মামলা আছে, আমাকে এ বাড়ি থেকে যেকোনো মুহূর্তে চলে যেতে হবে। পরে আমি ক্যান্টনমেন্টে গিয়েছি, সেখান থেকে আমাকে বলেছে এটা ভূয়া তথ্য...।

র‌্যাব অফিসে গিয়েছি, সেখান থেকে জিডি করতে বলা হয়েছে, করেছি। কিছুদিন পূর্বে সদর দক্ষিণ থানা ও ইপিজেড ফাড়ির পুলিশ আমার বাসায় এসে বলে আমার নামে মামলা আছে, বাসা ছেড়ে দিতে হবে। না হয় আরো কয়েকটি মামলা দিয়ে আমাকে নিয়ে যেতে হবে।

জবাবে আমি বললাম, আমার বাপ-দাদার সম্পদ কেনো ছেড়ে যেতে হবে? যদি যেতেই হয়, আমি সুইসাইড করবো। পরে তারা আমার জিডির কপিটা নিয়ে চলে যান।

গতকাল (বুধবার) সকালে ইপিজেড ফাঁড়ির ইনচার্জ আমাকে কাগজপত্র নিয়ে সেখানে যেতে বলেন। আমি সকল কাগজপত্র এবং আমার উকিল সাহেবকে নিয়ে যাই। কিন্তু আমার কাগজপত্র না দেখে একদিনের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে দিতে বলে। সেখানে দেখি অন্তত ২শ’ লোক জড়ো করা হয়েছে আমাকে মারার এবং হত্যার উদ্দেশ্যে। আমি ভয়ে কিছু বলিনি, উকিল সাহেবকে নিয়ে কোনো রকমে ওইখান থেকে বের হয়ে চলে আসি। আমাকে বলা হচ্ছে কিছু টাকার বিনিময়ে বাড়ি ছেড়ে দেন, না হয় আপনাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবো।

তিনি ফেসবুকে মানুষের সহযোগিতা চেয়ে ওই ভিডিওতে আরো বলেন, ‘পরবর্তীতে অনেকের দ্বারস্থ হয়েছ, কিন্তু কারো কাছ থেকেই সহযোগিতা পাইনি। তাই আমি আপনাদেরকে জানাতে চাই, যদি আমাকে বাড়ি ছাড়তেই হয়, আমি আজকে দেখেন এই এনডিনের শিশিটা (বিষের বোতল দেখিয়ে) নিয়ে এসেছি। যদি যেতেই হয়- আমি আমার গর্ভবতী স্ত্রী ও আমার দুই সন্তানকে নিয়ে আত্মহত্যা করবো। তবুও এ বাড়ি ছেড়ে আমি যাবো না। আপামর জনতা, যারা আমার ভিডিও দেখছেন- যদি আমাকে আইনি সহায়তা না দেন তাহলে আমি আমার পরিবার নিয়ে আত্মহত্যা করবো...।’

ভিডিওটি ফেসবুকে আপলোড হওয়ার পর শুক্রবার বিকেলে নগরীর চর্থা এলাকায় গিয়ে কথা হয় রাজা কামালের ছোটভাই ঠিকাদার মোহনের সাথে।

তিনি বলেন, টমসনব্রিজ এলাকায় আমার বড়-বাবা (পিতামহ) হাজী জৈনুদ্দিন সাহেবের ৩০৬ শতক ভূসম্পত্তি ছিলো। সেখান থেকে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের হোস্টেলের (ছাত্রাবাস) জন্য ১৫০ শতক ভূমি তিনি বিনামূল্যে একোয়ার (অধিগ্রহণ) করে দেন।

কিন্তু পরবর্তীতে কলেজটির স্থান পরিবর্তন করে শহরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সরকার অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি মূল মালিককে ফিরিয়ে দেয়। তবে কলেজটির তৎকালীন অধ্যক্ষ ড. আখতার হামিদ খান উক্ত সম্পত্তি মূল মালিককে ফিরিয়ে না দিয়ে তা কেটিসিসিএ লি. সমবায় সমিতির সদস্যদের বিলিয়ে দেন। এছাড়া বাকি ১৫৬ শতক ভূমিও অন্যরা দখল করতে থাকে।

শুধু তাই নয়, আমাদের অসচেতনতার সুযোগে সমবায় সমিতির সদস্যরাসহ অন্য দখলদাররা বিএস খতিয়ানে নিজেদের নাম ‘এন্ট্রি’ করে ফেলে। তারা এখন এ জায়গা দলিল ছাড়া শুধু স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিভিন্নজনের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন।

এ অবস্থা দেখে আমার ভাই রাজা কামাল কয়েক বছর যাবৎ সেখানে ৯ শতক ভূমির উপর ঘর নির্মাণ করে বসবাস করতে থাকে। আর বাকি জায়গার দখল ফিরে পেতে আমরা মামলা করি। কিন্তু উল্টো এখন দখলদাররাই তাকে উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজা কামাল বলেন, ‘জায়গা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। কিন্তু এর সুরাহার আগেই আমাকে উচ্ছেদের জন্য হুমকি-ধামকি দেয়া হচ্ছে। আমি এখন পুরোপুরি অসহায়। আমি আমার পৈত্রিক সম্পত্তি ফেরত চাই। পরিবার নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে চাই।’

রাজা কামাল আরো বলেন, আমার বসবাসরত ওই ৯ শতক ভূমি রেইনা নূর নামে এক নারী রেনেসা গ্রুপের চেয়ারম্যান শামীম কবীর নামক জনৈক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন। তিনিই এখন আমাকে উচ্ছেদের পাঁয়তারা করছেন। অথচ রেইনা নূর কে? তাও আমি জানি না। স্ট্যাম্পে তার স্বামীর নাম দেয়া হয়েছে আবদুল কুদ্দুস, ঠিকানা- উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা।’

এ ব্যাপারে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানার অফিসার ইনচার্জ মামুনুর রশিদ জানান, ঐ জায়গায় ১৪৫ ধারা জারি করে আদালত পুলিশকে রিসিভার নিয়োগ করেছেন। এখন এ জায়গা পুলিশের আওতায় থাকবে। কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হলে আদালতে যাবে।

১৪৫ ধারা জারি হলে ও পুলিশ রিসিভার হলে একদিনের মধ্যে জায়গার মালিকানায় বসবাসকরা লোকদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া যায় কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি মামুনুর রশিদ বলেন, পুলিশ এখন রিসিভার। আপনি আইনজীবীদের সাথে কথা বলেন।

এ ব্যাপারে কুমিল্লার বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোখলেছুর রহমান চৌধুরী বলেন, পুলিশ যদি ওই জায়গায় বসবাসকারীদের একদিনের মধ্যে তুলে দেয়ার হুমকি দিয়ে থাকে তাহলে তারা জঘন্য অপরাধ করেছে। পুলিশের এ ব্যাপারে কোন ক্ষমতা নেই। দেওয়ানী আদালতে ডিক্রি ছাড়া কাউকে উচ্ছেদ করা যায় না। উচ্ছেদ করতে হলে অনেক নিয়মকানুন আছে।

ভিডিওটি দেখতে ক্লিক করুন...

জেডএস/এফএম