মুক্তিযোদ্ধার দুই সন্তানের চোখ তুলে নেয়ার দায়ে ৮ জনের সাজা

ঢাকা, শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৮ | ৩ ভাদ্র ১৪২৫

মুক্তিযোদ্ধার দুই সন্তানের চোখ তুলে নেয়ার দায়ে ৮ জনের সাজা

চট্টগ্রাম ব্যুরো ২:৪৪ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৭, ২০১৮

print
মুক্তিযোদ্ধার দুই সন্তানের চোখ তুলে নেয়ার দায়ে ৮ জনের সাজা

দীর্ঘ ২৭ বছর আগে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার মুক্তিযোদ্ধা সোবহানের দুই ছেলের চোখে খেজুর কাঁটা দিয়ে খুঁচিয়ে এসিড ঢেলে দেয়ার অপরাধে দুই জনকে ১০ বৎসর ও ৬জনকে ৭ বৎসরে কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন চট্টগ্রামের একটি বিচারিক আদালত। একই সাথে মামলা থেকে ৮ জনকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়। 

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের পঞ্চম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ স্বপন কুমার সরকার এর আদালতে রায় প্রদান করা হয়। আদালতের কর্তব্যরত রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলী (পিপি) এডভোকেট মোহাম্মদ লোকমান হোসেন এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

মামলায় অভিযুক্ত ১৩ আসামির মধ্যে রাঙ্গনিয়ার আইয়ুব বাহিনীর প্রধান আইয়ুব এবং উপজেলার পারুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিমকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়।

এ রায়ে ৭ বছর করে দণ্ডাদেশ দেযা হয়, সোলায়মান, আবদুল হক, ইউসুফ, জাফর, দুলা মিয়া ও গোলাম কাদেরকে। তাদের প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। এ মামলায় অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় চারজনকে খালাস দেয়া হয় আবদুস সালাম, আবুল হাশেম, জাহাঙ্গীর আলম ও আবুল হাশেমকে। এ ছাড়া এ মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিসহ তিনজন দুলা মিয়া, গোলাম কাদের ও রশিদ আহমদ মারা গেছেন।

এদিকে রায় ঘোষণার সময় আদালতে এসিড সন্ত্রাসের শিকার ছবুর আহমেদসহ তার পরিবারের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। রায় শোনার পর ছবুর আহমেদ ও তার স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। মামলার রায়ে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন দাবি করে এসিড সন্ত্রাসের শিকার ছবুর আহমেদ বলেন, ‘আমার দুই চোখ খুঁচিয়ে এসিড ঢেলে দেয়ার ২৭ বছর যন্ত্রণা নিয়ে কাটাচ্ছি। আশা করেছিলাম আদালত আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেবে।’

মামলার বাদী ফরিদুল আলম তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আসামিরা এক সপ্তাহ আগে বলেছিল, আমরা মামলা থেকে খালাস পাচ্ছি। চারটি চোখ ও একটি জীবন হারানোর পর যদি ১০ বছর সাজা দেয়, আমরা কিভাবে সন্তুষ্ট হবো। আমরা তো শুধু সংক্ষুদ্ধই নই, এখন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি। এই মামলার প্রধান আসামি আইয়ুব আদালতে প্রবেশের আগে টিভি ক্যামেরার সামনে ভি চিহ্ন দেখিয়েছে। জানিনা সে এই ভি চিহ্নি দেয়ার ঈঙ্গিত পেল কোথায়!

ফরিদুল আলম জানান, আইয়ুব বাহিনীর হাতে পিতা ও ভাই দুইজনকেই হারিয়েছি। এসিডে ঝলছে দেয়া আরেক ভাইও মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।

জানাগেছে, পার্শ্ববর্তী হাশেমের সাথে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ১৯৯১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গুনিয়ার পশ্চিম নিশিন্তাপুর এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা (হত্যাকাণ্ডের শিকার) আব্দুস সোবহানের দুই ছেলেকে ফিল্মি কায়দায় পাকড়াও করে আইয়ুব বাহিনীর সদস্যরা (আইয়ুবের নেতৃত্বে)। আসামিরা সোবহানের ছেলে কবির আহমেদ ও সবুর আহমেদের হাত–পা বেঁধে ফেলে। এরপর খেজুর কাটা দিয়ে খুঁচিয়ে দুই ভাইয়ের চোখ উপড়ে ফেলে এবং এসিড এনে দুইজনের চোখের মধ্যে ঢেলে দেয়। এসিডে ঝলছে যাওয়া দুই ভাই ওই সময় ছটফট করতে থাকেন। এঘটনায় দুই ভাইয়ের মধ্যে কবির আহমেদ মারা গেছেন বিভৎস্য এসিড যন্ত্রণা নিয়ে। এখনো বেঁচে থাকা সবুর আহমেদের অবস্থাও বেশ খারাপ।

আদালত সূত্রে জানাগেছে, আলোচিত এ মামলাটি তদন্ত শেষে আইয়ুবসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এরপর মধ্যে ৩ জন মারা যাওয়ায় তারা মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পায় আইনগতভাবেই। আর ১০ আসামির মধ্যে আইয়ুব বাহিনীর আইয়ুবসহ ৫ জন বর্তমানে জামিনে আছেন। বাকি ৫ জন আছেন পলাতক।

এদিকে দুই ছেলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের এসিড সহিংসতার বিচার চাইতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সোবহানও টার্গেটে পরিণত হয়। একই বছর ১ নভেম্বর রানীরহাট বাজার থেকে বাড়িতে ফেরার পথে মুক্তিযোদ্ধা সোবহানকেও জিপ থেকে নামিয়ে ফেলে আসামিরা। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় শিশুতল নামক স্থানের পাহাড়ে। এরপর নিজের হাতে কবর খুঁড়িয়ে এবং হাত কেটে সোবহানকেও হত্যা করা হয়। যা দায়ের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ আছে।

ঘটনার এক সপ্তাহ পর সোবহানের হাড়গোড় উদ্ধার করে পুলিশ। এ নিয়ে দেশব্যাপী তুমুল সমালোচনার মধ্যে বাঁশখালী থেকে আইয়ুব বাহিনীর প্রধান আইয়ুব আলীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর এ মামলায় ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার সাথে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আইয়ুব আলী। এ মামলায় আইয়ুব আলীসহ অন্যান্য আসামিদের সাজা হয়েছে আদালতে। আর এসিড সন্ত্রাসের মামলায় উভয়পক্ষে যুক্ততর্ক সম্পন্ন হয় ৯ এপ্রিল সোমবার। এরপর ২৩ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণা হয় ২৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার।

তথ্য অনুযায়ী, এ মামলায় কারাগারে থাকা আসামি মোহাম্মদ সোলায়মান হাইকোর্টে জামিনের জন্য আবেদন করেন। হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ সোলায়মানকে শর্ত সাপেক্ষে জামিন দেন। জামিনের আদেশে তিনমাসের মধ্যে চাঞ্চল্যকর এ মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য সময়সীমা বেধে দেয়। আর উচ্চ আদালতের এ আদেশের ফলে দীর্ঘ ২৭ বছর আগের এ মামলার বিচার নিষ্পত্তিতে গতি পায় বলে জানালেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌসলি অতিরিক্ত জেলা পিপি এডভোকেট মোহাম্মদ লোকমান হোসেন।

এবিষয়ে অতিরিক্ত জেলা পিপি এডভোকেট লোকমান হোসেন জানান, ১৯৯২ সালে মামলার চার্জ গঠনের পর কেটে গেল ২৬ বছর। এরই মধ্যে এসিড নির্মমতার শিকার দুই ভিকটিমও এ মামলায় সাক্ষী দিয়েছেন। সাক্ষী দেয়ার পর একজন মারা গেছেন ইতোমধ্যে।

এডভোকেট লোকমান জানান, ভিকটিম ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীসহ মোট ১২ জন এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন আদালতে। আদালতের কার্যক্রম চলার সময় জামিনে থাকা আসামিদের জামিন বাতিল করার আবেদনও করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌসলি এডভোকেট লোকমান। বিচারক সেই আবেদনে সাড়া দেননি।

জেএইচ/এএস

 
.


আলোচিত সংবাদ