কুমিল্লায় মাঠ চষে বেড়াচ্ছে আ’লীগ, নীরব বিএনপি (ভিডিও)

ঢাকা, সোমবার, ২১ জানুয়ারি ২০১৯ | ৮ মাঘ ১৪২৫

কুমিল্লায় মাঠ চষে বেড়াচ্ছে আ’লীগ, নীরব বিএনপি (ভিডিও)

জহির শান্ত, কুমিল্লা ১:৩৭ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৮

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণার সুযোগ আছে আর কেবল দুই সপ্তাহ। বহুল প্রতীক্ষিত এ নির্বাচন ঘিরে কুমিল্লায় আগে থেকেই তোড়জোড় শুরু হলেও নির্বাচনী মাঠে এখনো নিজেদের শক্ত অবস্থান পুরোপুরি জানান দিতে পারেনি বিএনপি।

জেলার অন্তত ৫টি সংসদীয় আসনের অনেক এলাকাতেই চোখে পড়ে না ধানের শীষের পোস্টার; কানে আসে না মাইকিংয়ের শব্দও।

পক্ষান্তরে প্রতিটি আসনেই সরব ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সরকারের বিগত দিনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে নৌকা প্রতীকের প্রচারণা-মাইকিংয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে শহর থেকে গ্রামীণ জনপদ। প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে-দ্বারে। উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে সরকারের ধারাবাহিকতায় আবারো আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার আহবান জানাচ্ছেন তারা।

গত দুই দিনে কুমিল্লার ১১টি সংসদীয় আসনের অন্তত ৬টি নির্বাচনী এলাকার ৩০টির বেশি গ্রাম ঘুরে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রচারণা ও গণসংযোগের এ বিপরীত চিত্র চোখে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বোদ্ধা মহলেও।

তবে বাকি ৫টি আসনের সর্বত্রই দুই দলের প্রচারণা চলছে সমান তালে। বিশেষ করে, কুমিল্লা-৬ (সদর-মহানগর), কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা), কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনে জমজমাট প্রচারণা চলছে বিএনপির। সদরে বিএনপির প্রার্থী দলের দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন। আর কুমিল্লা- ১ ও ২ আসনে প্রার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

প্রচারণা শুরুর দিন থেকে প্রায় প্রতিদিনই অসংখ্য নেতাকর্মী নিয়ে বিশাল বিশাল শোডাউন করছেন মোশাররফ হোসেন। হাজী ইয়াছিনও প্রতিদিন চষে বেড়াচ্ছেন সদর নির্বাচনী এলাকা। চালাচ্ছেন গণসংযোগ-উঠান বৈঠক।

এ ছাড়া কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর), কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনেও প্রচারণায় পিছিয়ে নেই বিএনপি। আওয়ামী লীগের প্রার্থীর মতোই দু’টি সংসদীয় আসনের এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন দলের কর্মী-সমর্থকরা।

জেলার অর্ধেকেরও বেশি আসনে প্রচারণায় নীরবতা প্রসঙ্গে বিএনপি নেতারা বলছেন, নির্বাচনে এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হওয়ায় পুরোপুরিভাবে মাঠে নামতে পারছে না দলের নেতা-কর্মীরা। প্রশাসন এখনও সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করছে। যদিও বিএনপির এ দাবির সাথে পুরোপুরি দ্বিমত পোষণ করেছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তাদের দাবি, জ্বালা-পোড়াওয়ের রাজনীতি করে, মানুষ হত্যা করে বিএনপি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে ভোটারদের কাছে ঘেঁষতে পারছে না তারা।

শুক্রবার দিনভর কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাণপাড়া) কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের অন্তত ২০টি গ্রাম ঘুরে কোথাও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের কোনো পোস্টার বা ফেস্টুন দেখা যায়নি। কুমিল্লা-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক অধ্যক্ষ মো. ইউনুস।

কুমিল্লা-৪ আসনে ঐক্যফ্রন্ট থেকে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী করা হয়েছে জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতনকে। আর এ দুইজনের প্রার্থিতা নিয়েই তৈরি হয়েছে দলীয় ও জোটগত দ্বন্দ্ব-কোন্দল।

দীর্ঘ ৯ বছর ধরে বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া বিএনপির সাংগঠনিক সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকা দলের ভাইস-চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদকে বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেয়া হয় অধ্যক্ষ ইউনুসকে। এতে করে রাগে-ক্ষোভে নির্বাচন থেকে অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে শওকত সমর্থক বিএনপি নেতা-কর্মীরা। ফলে দীর্ঘদিন রাজনীতির বাইরে থাকা ইউনুসকে পড়তে হচ্ছে বিপাকে। মাঠ গোছাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি ও তার কর্মী-সমর্থকরা। নির্বাচনী এলাকা ঘুরেও লক্ষ করা গেছে এর প্রভাব। ভোটের ভরা মৌসুমেও কেমন যেন নীরবতা!

পক্ষান্তরে এ নির্বাচনী আসনের সর্বত্রই চোখে পড়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল মতিন খসরুর পোস্টারে ছেয়ে গেছে চারপাশ। দুপুরের পর থেকেই শুরু হয় মাইকিং। গানে-গানে, স্লোগানে চাওয়া হচ্ছে ভোট।

একই চিত্র চোখে পড়েছে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনেও। আসনটিতে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন। আর এতে করে কপাল পুড়েছে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর। কিন্তু বিষয়টি মানতে পারছে না স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা। ফলে নির্বাচনী সরগরমের মাঝেও পুরোপুরি নীরবতা বিরাজ করছে ধানের শীষের শিবিরে।

বিএনপির নীরবতা কাটেনি কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনেও। ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে দলটি এখনও মাঠেই নামেনি। গণসংযোগ-সভা সমাবেশ দূরে থাক, এ পর্যন্ত আসনটির কোথাও পোস্টারই টাঙানো হয়নি। যার ফলে দৃশ্যত দলটি নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। আগামী নির্বাচনে এ আসনে সাতজন প্রার্থী নির্বাচনে লড়ছেন। তবে মূল লড়াইয়ে আছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও বর্তমান এমপি মো. তাজুল ইসলাম এবং বিএনপির

প্রার্থী দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সম্পাদক কর্নেল (অব.) আনোয়ার উল আজিম।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আনোয়ারুল আজিম বলেন, ‘গেল ক’দিন যাবত দলীয় ও নির্বাচনী কাজে ঢাকায় ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। এলাকায় মাঠ গোছানোর জন্য দলীয় নেতাকর্মীদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা সেভাবেই কাজ করছেন। আমিও আজ-কালের মধ্যে এলাকায় এসে নেতাকর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় নামব।’

অন্যদিকে, কুমিল্লা-১০ (সদর দক্ষিণ-নাঙ্গলকোট-লালমাই) আসনে বিএনপির প্রার্থী মনিরুল হক চৌধূরী কারাগারে থাকায় এখানেও কিছুটা নীরবতা রয়েছে। প্রচারণায় সরব না থাকলেও তার সমর্থক নেতাকর্মীরা মাঠ গোছাচ্ছেন কৌশলে। শিডিউল বেঁধে চলছে উঠান বৈঠক। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে যাচ্ছেন ভোটারদের বাড়ি বাড়ি।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট প্রচারণায় পিছিয়ে আছে কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) এবং কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনেও। দু’টি আসনেই ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী দেয়া হয়েছে জোটগতভাবে। চান্দিনায় প্রার্থী হয়েছেন এলডিপি মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ। চৌদ্দগ্রামে প্রার্থী জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক এমপি সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। ফলে দু’টি আসনেই বিএনপির মূল ধারার নেতাকর্মীরা নিজেদের কিছুটা গুটিয়ে রেখেছেন। এতে মাঠের রাজনীতিতে সাড়া ফেলতে পারছে না ধানের শীষ।

তবে জোটগত দ্বন্দ্ব-দূরত্বের বিষয়টি মানতে নারাজ ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী ও এলডিপি মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ। তার অভিযোগ, ‘চান্দিনাসহ জেলার বেশ কয়েকটি আসনেই নির্বাচনের কোনো পরিবেশ নেই। সরকারদলীয় লোকদের হামলা ও ধাওয়ায় ধানের শীষের নেতাকর্মীরা মাঠে নামতে পারছে না।’

রেদোয়ান আহমেদ বলেন, ‘আমরা আগেই বলেছিলাম, সংসদ রেখে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করব না। তাতে নির্বাচনের কোনো পরিবেশ থাকবে না। তারপরও দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের স্বার্থে আমরা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেছি। কিন্তু এখন নির্বাচনের মাঠের যে অবস্থা, তাতে প্রশাসনও চাচ্ছে না আমরা নির্বাচনী মাঠে থাকি। প্রতিনিয়ত আমাদের লোকজনের ওপর হামলা করা হচ্ছে। নেতাকর্মীদের ধাওয়া করা হচ্ছে।’

বিএনপি-জামায়াত জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন

‘জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি ও মানুষ হত্যা করে বিএনপি-জামায়াত জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন কুমিল্লা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চৌদ্দগ্রাম আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক মুজিব।

শুক্রবার রাতে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের বাতিসায় নিবার্চনী প্রচারণার ফাঁকে বিএনপির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে এ কথা বলেন তিনি ।

পরিবর্তন ডটকমকে মুজিবুল হক বলেন, ‘এতোকাল ধরে বিএনপি-জামায়াত মানুষকে ধোকা দিয়ে রাজনীতি করে এসেছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রতারণা করেছে। জনগণের সাথে তাদের কোনো প্রকার সম্পর্ক নেই। তাই তারা জনগণের কাছে যেতে ভয় পায়। তারা স্বাধীনতাবিরোধী, মানুষ হত্যাকারী। তাদের প্রকৃত চেহারা এদেশের মানুষ চিনে ফেলেছে।’

জেডএস/আরপি