কলকাতা বসেই কলকাঠি, ঢাকায় বেপরোয়া তার ১০ গ্রুপ (ভিডিও)

ঢাকা, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | 2 0 1

কলকাতা বসেই কলকাঠি, ঢাকায় বেপরোয়া তার ১০ গ্রুপ (ভিডিও)

প্রীতম সাহা সুদীপ ৪:২৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০১৯

কলকাতায় অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত হোসেন

শাহাদাত হোসেন। মিষ্টি চেহারা। স্মার্ট। সহজে যে কাউকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু, এই মায়াবী চেহারার আড়ালে তিনি ভয়ঙ্কর এক সন্ত্রাসী।

মিরপুর, পল্লবী, ক্যান্টনমেন্টসহ রাজধানীবাসীর কাছে মূর্তিমান আতঙ্কের আরেক নাম শাহাদাত। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের লাল তালিকাভুক্ত ৪৪ বছর বয়সী এই শীর্ষ সন্ত্রাসী বর্তমানে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতায় রয়েছেন।

কিন্তু, থেমে নেই তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। কলকাতা বসেই কলকাঠি নাড়ছেন। ঢাকায় তার অন্তত ১০টি গ্যাং সক্রিয়। সক্রিয় বললে কম বলা হবে, রীতিমতো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাদের মাধ্যমেই শাহাদাত বীরদর্পে নিয়ন্ত্রণ করছেন ঢাকার অপরাধ জগতের বড় অংশ।

চাঁদা দাবি, অপহরণ, হত্যাসহ দেড় ডজন মামলা রয়েছে পুলিশের খাতায় মোস্ট ওয়ানটেড তালিকাভুক্ত শাহাদাতের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ সরকার যে ক’জন পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেফতারে পুরস্কার ঘোষণা করেছে, তাদের মধ্যে তিনি প্রথম সারির একজন।

বাংলাদেশ ছাড়ার পর শাহাদাতের ভারতে স্থায়ী বসবাসের খবর পাওয়া গেলেও, নিয়মিত দুবাই, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করেন। বিশ্বের একাধিক দেশের পাসপোর্টও রয়েছে তার।

র‍্যাবের হাতে আটক শাহাদাত বাহিনীর সদস্য কিলার সবুজ

ঢাকায় বেপরোয়া শাহাদাতের ১০ গ্যাং

র‌্যাব জানিয়েছে, কলকাতায় অবস্থানরত সন্ত্রাসী শাহাদাতের নির্দেশে এখনও মিরপুর-পল্লবীসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১০টি গ্রুপ কাজ করছে। এসব গ্রুপের একটি বিভিন্ন ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ঠিকাদারদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে শাহাদাতকে সরবরাহ করে।

কলকাতা থেকে ভিওআইপি কলে এসব ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের কাছে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন শাহাদাত। তার নিয়ন্ত্রণে থাকা অন্য আরেকটি গ্রুপ এই চাঁদার টাকা সংগ্রহ করে হুন্ডির মাধ্যমে কলকাতায় পাঠায়। আর যারা চাঁদা দিতে অস্বীকার করেন, তাদের জীবনে নেমে আসে করুণ পরিণতি। প্রাণ পর্যন্তও দিতে হয়।

গত শুক্রবার ধরা পড়েছেন বাহিনীর অন্যতম সমন্বয়ক আবু হানিফ ওরফে ডিশ বাদল

ডিশ বাদলের মুখে কুলুপ

গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন মাটিকাটা এলাকা থেকে শাহাদাত বাহিনীর সক্রিয় সদস্য আবু হানিফ বাদল ওরফে ডিশ বাদলকে (৩৮) আটক করে র‌্যাব-৪। এ সময় তার কাছ থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র ও দুই রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়।

শনিবার র‌্যাব-৪ এর সহকারী পুলিশ সুপার সাজেদুল ইসলাম পরিবর্তন ডটকমকে জানান, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বাদলকে আটক করা হয়। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি কিছু বলেননি। বলা চলে মুখ কুলুপ এটেছেন।

তিনি জানান, অতীতে গ্রেপ্তার কিলার সবুজসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসীর মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি- ডিশ বাদল শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের নাম-ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে শাহাদাতের কাছে পাঠান। পরে শাহাদাত ও তার সহযোগী বাচ্চু সেসব ব্যবসায়ীদের হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায় করেন।

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা আরও জানান, বাদলের মামা ডিশ শাহিন ওরফে রেজু হত্যা মামলার পলাতক আসামি। তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ভারতে রয়েছেন। তাদের দু’জনের নির্দেশনাতেই বাদল ঢাকায় নানা অপরাধ করে আসছেন। তার নামেও একাধিক হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজীসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে।

বেপরোয়া শাহাদাত বাহিনী

মিরপুর ১২ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি মনির উদ্দিন মনু ওরফে মনু হাজি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড এবং চাঁদাবাজী, অপহরণ ও খুনসহ বিভিন্ন মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের। কিন্তু, থেমে নেই তার অপরাধ কার্যক্রম।

শাহাদাত বাহিনীর ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে আছেন মিরপুর-পল্লবী-ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ব্যবসায়ী-ঠিকাদারসহ অসংখ্য মানুষ।

গেল কোরবানির ঈদে গাবতলীসহ বিভিন্ন গরুর হাটে বেপরোয়াভাবে চাঁদাবাজীর অভিযোগ পাওয়া গেছে শাহাদাত বাহিনীর বিরুদ্ধে। গাবতলীর গরু ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে শাহাদাতের লোকজন মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছে বলে পুলিশ সদরদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, শাহাদাত বাহিনীর সদস্যদের চাহিদা মতো মোটা অঙ্কের চাঁদা না পেয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়ির মালিকদের কাছে চিঠিও পাঠানো হচ্ছে।

গাউছুল আজম পাগল মাওলা খানকা শরীফ দরবারের খাদেম আবদুল হালিম ওরফে পাগল সাগর চান গত ২৬ জুলাই দারুস সালাম থানায় শাহাদাত বাহিনীর সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একটি জিডি করেন। তিনি জানান, মিরপুরের গৈদ্ধেরটেক বেড়িবাঁধ সংলগ্ন ওই দরবার শরীফে তিনি দীর্ঘদিন ধরে খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের সহযোগীরা তার কাছে এসে ঈদ উপলক্ষে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ হাজার টাকা দেয়া হয়। পরে তারা আরও ২ লাখ টাকা দাবি করে হুমকি দেয়।

অন্যদিকে, ২০১৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে মিরপুরের নিউ শাহজালাল আবাসিক হোটেলের মালিক রফিকুল ইসলাম জুনায়েতের গুলিবিদ্ধ লাশ পাইকপাড়া সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার জামে মসজিদের সামনে ফুটপাত থেকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি গুলির খোসা ও ইউসিবি ব্যাংকের ৩ লাখ ৬ হাজার টাকার একটি চেক টুকরো টুকরো অবস্থায় পাওয়া যায়। ওই ঘটনায় নিহতের ভাই ডা. সাঈদ হোসেন সোহাগ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

ওই মামলায় চলতি বছরের গত ২৯ জুলাই আনোয়ার হোসেন সবুজ ওরফে শুটার সবুজকে (২২) গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেফতার শুটার সবুজ শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের সেকেন্ড-ইন কমান্ড।

আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সবুজ জানান, শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের নির্দেশে তিনি ও তার সহযোগীরা রফিকুল ইসলাম জুনায়েতের কাছে ১ কোটি টাকা চাঁদা চেয়েছিলেন। কিন্তু, রফিকুল ২০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে সম্মতি প্রকাশ করেছিল। তা মানেননি শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত। ভারত থেকে শাহাদাত অর্ডার দেয় রফিকুলকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে দিতে। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী রফিকুলকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

যেভাবে শীর্ষ সন্ত্রাসী হলেন শাহাদাত

শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত হোসেনের বাড়ি মিরপুরের শাহআলীর শাইন পুকুর রোডে। ১৯৯৭ সাল, শাহাদাত তখনও সন্ত্রাসী হয়ে উঠেননি। শাহাদাতের বোনের সঙ্গে প্রেম করতেন মিরপুরের গুদারাঘাটের টিপু, তিনি ছিলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীরের সহযোগী। প্রেমে বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় একদিন শাহাদাতকে কুপিয়ে আহত করেন টিপু।

মিরপুর-১ নম্বর এলাকার ডিশ রেজার ছোট ভাই শাহীন ছিলেন শাহাদাতের বন্ধু। সে সময় মিরপুরে ডিশ রেজার ছিল একক আধিপত্য। প্রতিশোধ নিতে শাহীন ও ডিশ রেজার সহায়তায় ১৯৯৮ সালে টিপুকে তারই এলাকায় খুন করেন শাহাদাত। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়েই অপরাধ জগতে পা রাখেন তিনি। এরপরই মিরপুর-পল্লবীকে পর্যায়ক্রমে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন শাহাদাত।

২০০১ সালের দিকে মিরপুর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শাহাদাত। শাহাদাতের বন্ধু কলাবাগানের খোরশেদ ছিলেন ভাসমান সন্ত্রাসী। বিভিন্ন অপরাধে শাহাদাত ও খোরশেদ যৌথভাবে নেতৃত্ব দেয়ায় তাদের দলের নাম হয়ে উঠে খোরশেদ-শাহাদাত বাহিনী। ২০০২ সালে বিএনপি সবে ক্ষমতায় আসার পর ১০ মে কমিশনার সাইদুর রহমান নিউটন হত্যাকাণ্ডের পর দেশ ছাড়েন শাহাদাত। এরপর থেকে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে তিনি বিদেশে।

পিএসএস/আইএম

 

রাজধানী: আরও পড়ুন

আরও