মা ছাড়া কেমন আছে তুবা?

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

মা ছাড়া কেমন আছে তুবা?

প্রীতম সাহা সুদীপ ৩:৪৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০১৯

মা ছাড়া কেমন আছে তুবা?

প্রতি সকালে হাঁটতে বের হতেন তাসলিমা বেগম রেনু। ঘুম ঘুম চোখেই ছোট্ট তুবা মায়ের ঠোঁটে এঁকে দিতো চুমু। মায়ের কাছে এই চুমুর আলাদা মানে। তাইতো চকলেট-আইসক্রিম কিছু একটা হাতে ফিরতেন।

ব্যতিক্রম ছিল না ২০ জুলাই শনিবার। এদিন একটু বেশি সময় বাইরে থাকার পরিকল্পনা ছিল। তাইতো রেনু চার বছরের কলিজাকে বুকে জড়িয়ে বলেছিলেন, আজ একটু দেরি হবে মা, ড্রেস আনব। দুষ্টুমি করবে না।

মা আসবে, লাল ড্রেস পরে কত আনন্দ হবে! তুবার অপেক্ষা যেন শেষ হয় না। ঘুরেফিরে ভাই মাহিকে জিজ্ঞেস করছে, মা এত দেরি করছে কেন ভাইয়া? কখন আসবে?

কিন্তু, নির্মম বাস্তবতা হলো, রেনুকে আমরা তুবার কাছে ফিরতে দেয়নি। হায়েনার মতো দল বেঁধে হামলা করে শেষ করে দিয়েছি সব।

স্রেফ ‘ছেলেধরা’ গুজবে মেতে প্রকোশ্যে রাজধানীর উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই পিটিয়ে তাসলিমা বেগম রেনুকে (৪০) হত্যা করা হয়েছে। অথচ তুবাকে ভর্তি করার জন্য এই স্কুলেরই খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর ছোট্ট ছেলে-মেয়ে নিয়ে একাকী সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া রেনু।

মায়ের অবর্তমানে তুবার দেখাশোনা করছেন তার তিন খালা। সব আহ্লাদ, আবদার মেটাচ্ছেন তারা। এর মধ্যেও ছোট্ট চোখ দুটি খুঁজে ফিরছে মমতাময়ী মাকে। মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করছে ছোট্ট তুবা। মা ফিরে আসবে- এমন মিথ্যা সান্ত্বনা দেয়া হচ্ছে অবুঝ শিশুটিকে।

তুবাকে নিয়ে রেনুর তিন বোন ও তাদের পরিবার এখন লক্ষ্মীপুরের  রায়পুরের সোনাপুরে গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছেন। তুবাকে একা থাকার সুযোগ দিচ্ছেন না কেউ। কোনো না কোনোভাবে তাকে হাসি-খুশি রাখার চেষ্টা করছেন সবাই।

মঙ্গলবার দুপুরে মুঠোফোনে আলাপ হয় রেনুর ভাগ্নে নাসির উদ্দিন টিটুর সঙ্গে। পরিবর্তন ডটকমকে তিনি বলেন, ‘মায়ের অবর্তমানে এখন তিন খালাই তুবার দেখাশোনা করছেন। তাকে মন খারাপ করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখা হচ্ছে, নিয়মিত তাকে নিয়ে ঘুরতে বের হচ্ছি। পুকুরে গোসল করাচ্ছি, মোটরসাইকেল দিয়ে গ্রাম ঘুরিয়ে দেখাচ্ছি।’

রেনুর ১১ বছর বয়সী ছেলে তাহসিন আল মাহিরের কি অবস্থা জানতে চাইলে টিটু বলেন, ‘মাহির এখন তার বাবা তসলিম হোসাইনের সঙ্গে আছে। প্রচুর কান্না করছে, মা হারানোর কষ্ট, যার গেছে সেই বোঝে। লক্ষ্মীপুরে না এলেও ফোনে প্রতিদিনই মাহিরের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে।’

পরিবারের সদস্যরা জানায়, তাসলিমা বেগম রেনু লেখাপড়া শেষে আড়ং ও ব্র্যাকে চাকরি করেন। স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন কিছুদিন। প্রায় ২ বছর আগে স্বামী তসলিম হোসাইনের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়।

এরপর থেকে মায়ের সঙ্গে মহাখালীর ওয়্যারলেস গেটের একটি ভাড়া বাসায় ১১ বছরের ছেলে তাহসিন আল মাহির ও চার বছরের মেয়ে তাসনিম তুবাকে নিয়ে বসবাস করছিলেন।

তবে ছেলে বাবার কাছেও যেতো। কিছুদিন আগে বাবার গ্রামের বাড়িতেও গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা বড় ভাই মো. আজগার আলীর কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রেনু।

ওইদিনের ঘটনার বিষয়ে টিটু বলেন, ‘অনেক দিন থেকেই খালা (রেনু)  তুবাকে স্কুলে ভর্তি করানোর কথা বলে আসছিলেন। তিনি প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বের হতেন। বাসায় ফেরার সময় মেয়ের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসতেন। কোনো কোনো সময় বাসায় ফিরতে দেরি হতো। কিন্তু, আমরা চিন্তা করতাম না। কারণ, মহাখালীতে আমাদের আরও আত্মীয়-স্বজন ছিল, খালা মাঝেমধ্যেই তাদের বাসায় যেতেন।’

তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন শনিবারও তিনি হাঁটতে বের হন। কিন্তু, তিনি যে তুবাকে স্কুলে ভর্তির জন্য বাড্ডার ওই স্কুলে যাবেন, সেটা আমরা ভাবতেও পারিনি।’

রেনুর হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে টিটু বলেন, ‘যারা নৃশংসভাবে খালাকে হত্যা করল, আমরা তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আমি মামলা করেছি, এখন পর্যন্ত ছয়জনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে বলে শুনেছি। তবে যে মূলহোতা, যাকে ভিডিও ফুটেজগুলোতে খালাকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করতে দেখা গেছে, সেই হৃদয় এখনো গ্রেফতার হয়নি। আমি ঢাকায় ফিরে তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করব এবং যত দ্রুত সম্ভব ওই খুনিকে গ্রেফতারের অনুরোধ জানাব।’

উল্লেখ্য, গত ২০ জুলাই সকালে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার একটি স্কুলে গেলে তাসলিমা বেগম রেনুকে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে প্রধান শিক্ষকের রুম থেকে টেনে বের করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়।

এ ঘটনায় ওইদিন রাতেই বাড্ডা থানায় অজ্ঞাত ৪-৫শ’জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন নিহতের ভাগ্নে নাসির উদ্দিন টিটু। ২১ জুলাই রাতে জাফর, শাহীন ও বাপ্পী নামে তিনজন এবং ২২ জুলাই সকালে বাচ্চু নামে আরেকজনকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতার চারজনকে ২২ জুলাই আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। বিচারক তিনজনের চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আর জাফর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পর কারাগারে পাঠানো হয়।

পিএসএস/আইএম

 

রাজধানী: আরও পড়ুন

আরও