জাতির হৃদয় ভেঙে দেয়া কে এই হৃদয়?

ঢাকা, ২১ আগস্ট, ২০১৯ | 2 0 1

জাতির হৃদয় ভেঙে দেয়া কে এই হৃদয়?

প্রীতম সাহা সুদীপ ৩:৪৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০১৯

জাতির হৃদয় ভেঙে দেয়া কে এই হৃদয়?

গোটা দেশে নতুন আতঙ্কের নাম ‘ছেলেধরা’। বিগত এক সপ্তাহে অন্তত ১০ তাজা প্রাণকে এই আতঙ্কের বলি হতে হয়েছে। কারণ, তাদের প্রায় সবাই গুজবে পড়ে গণপিটুনিতে মারা গেছেন। কোনো কিছুতেই থামছে না।

এর মধ্যে রাজধানীর উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তাসলিমা বেগম রেনুর (৪০) মৃত্যু গোটা জাতির মনে দাগ কেটেছে। স্বামী আরেক নারীকে বিয়ে করার পর একলা চলা এই মা তার ছোট্ট ছেলে-মেয়েকে ভর্তি করার জন্য স্কুলের খোঁজ-খবর নিতে এসেছিলেন। ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে সেই স্কুলেই আটকে রেখে প্রকাশ্যে তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

রেনুকে পিটিয়ে হত্যার যেসব ভিডিও এখন পর্যন্ত প্রকাশ হয়েছে, সেখানে তিন/চার তরুণকে নির্মম এই হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। তাদের ঘিরে ছিল শত শত উৎসুক জনতা, যাদের অধিকাংশই মোবাইল ফোনে ওই দৃশ্য ধারণ করছিলেন।

ভিডিও ফুটেজে যাদের হত্যাকাণ্ড ঘটাতে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে একজন ছিল নীল টি-শার্ট পরিহিত। ওই তরুণই রেনুকে পিটিয়ে হত্যার নেতৃত্ব দিয়েছিল। রেনু যখন বেধড়ক পিটুনি খেয়ে নিস্তেজ হয়ে স্কুল কম্পাউন্ডে পড়ে ছিল, তখনও থামেনি ওই তরুণ।

হাতে থাকা লাঠি দিয়ে রেনুর মুখে, বুকে, পেটে, হাতে ও পায়ে নির্মম ও নৃশংসভাবে পিটিয়ে যাচ্ছিল। আশপাশের লোকজনের অনেকে ‘থামো থামো, আর মের না, মরে গেছে’ এসব বলে ওই তরুণকে থামানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু, পাশবিক রূপ ধারণ করে সে তখনও রেনুকে প্রহার করে যাচ্ছিল।

পরিবর্তন ডটকমের সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, রেনু হত্যায় নেতৃত্ব দেয়া নীল-শার্ট পরিহিত ওই তরুণের নাম হৃদয়। স্কুলের পাশেই তার একটি সবজির দোকান ছিল। তবে পড়াশোনা না জানা হৃদয় উত্তর বাড্ডায় বখাটে হিসেবেই পরিচিত। মাদক সেবন ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে মারামারি-কাটাকাটি করাই ছিল হৃদয়ের কাজ।

স্কুলের উল্টো দিকেই একটি মাদ্রাসা। মাদ্রাসার পাশেই বেশ কয়েকটি পানের দোকান। তাদের মধ্যেই একজন প্রত্যক্ষদর্শী ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপ হয় পরিবর্তন ডটকমের এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করা শর্তে তিনি বলেন, ‘আমি তো দোকান নিয়া ব্যস্ত ছিলাম, ঘটনা যা দেখার বাইরে থেইকাই দেখছি। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে চারদিকে খবর ছড়ায় স্কুলে নাকি ছেলেধরা ধরা পড়ছে। শত শত মানুষ স্কুলের ভেতরে ঢোকে, পরে স্কুলের ভেতরেই ওই মহিলারে পিটাইয়া মাইরা ফালায়।’

যারা মেরেছে তাদের চেনেন কি না এমন প্রশ্নে ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি তো ভেতরে ঢুকি নাই। কিন্তু, টেলিভিশনে যে ভিডিও দেখাইছে তাতে দেখলাম তিন/চারজন পিটাইয়া মারতাছে। এর মধ্যে দু’জনরে চিনি, তারা এই বাজারেরই। ওই দু’জনের একজন হৃদয়, সে স্কুলের সামনে শাক বিক্রি করতো। আরেকজন মহিউদ্দিন, সে একটু সামনে সবজির দোকান নিয়া বসতো। ঘটনার পর থেইকা আর ওগো দেখি নাই।’

স্থানীয় বাসিন্দা ও ওয়ার্ল্ড হিউম্যানিটি নামে একটি মানবাধিকার সংস্থার কর্মী মেহেদী হাসান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘হৃদয় এলাকায় বখাটে হিসেবেই পরিচিত। মাদক সেবন, ইভটিজিং, মারামারি-হানাহানি করে বেড়াতো সে। মাসখানেক আগে উত্তর বাড্ডা এলাকায় কথা কাটাকাটির জের ধরে একজনকে ছুরিকাঘাতও করেছিল সে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হৃদয় তেমন পড়াশোনা করেনি। তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডও ভালো না। স্কুলের পাশে হৃদয় সবজির দোকান নিয়ে বসতো। তার বাবাও এলাকায় মাদকাসক্ত হিসেবেই পরিচিত।’

হৃদয়কে গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন বাড্ডা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম।

সোমবার দুপুরে তিনি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘গণপিটুনিতে তাছলিমা বেগম রেনু হত্যার ঘটনায় সোমবার সকালে বাচ্চু নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর আগে রোববার রাতে বাপ্পী, শাহীন ও জাফর নামে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। দুপুরে তাদের ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’

ওসি রফিকুল বলেন, ‘গণপিটুনির নেতৃত্ব দিয়েছে হৃদয় নামে একটি ছেলে। সেই ছেলেটিকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। উত্তর বাড্ডা কাঁচাবাজারে হৃদয়ের বাবা হানিফ আলীর সবজির দোকান রয়েছে। হৃদয় তেমন পড়াশোনা করেনি, বখে যাওয়ার পর বাবার দোকানেই মাঝেমধ্যে কাজ করতো।’

পিএসএস/আইএম

 

রাজধানী: আরও পড়ুন

আরও