রেনুকে হৃদয়-মহিউদ্দিনরা যখন মারছিল, অন্যরা ব্যস্ত ছিলো ছবি তোলায়

ঢাকা, ২১ আগস্ট, ২০১৯ | 2 0 1

রেনুকে হৃদয়-মহিউদ্দিনরা যখন মারছিল, অন্যরা ব্যস্ত ছিলো ছবি তোলায়

প্রীতম সাহা সুদীপ ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০১৯

রেনুকে হৃদয়-মহিউদ্দিনরা যখন মারছিল, অন্যরা ব্যস্ত ছিলো ছবি তোলায়

ছেলেধরা সন্দেহে রাজধানীর উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তাসলিমা বেগম রেনুকে পিটিয়ে হত্যার যেসব ভিডিও ক্লিপ এখন পর্যন্ত প্রকাশ হয়েছে, সেগুলোতে দেখা গেছে, মাত্র তিন/চারজন যুবক নির্মম এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তাদের ঘিরে ছিল শত শত উৎসুক জনতা, যাদের অধিকাংশই মোবাইল ফোনে ওই দৃশ্য ধারণ করতে ব্যস্ত ছিলেন।

উত্তর বাড্ডা কাঁচা বাজারের রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে হাতের বাম দিকে মোড় নিলেই দেখা যায় এই বিদ্যালয়টি। রোববার বিকালে সরেজমিনে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলটি বন্ধ রয়েছে। তবে যাওয়া-আসার পথে প্রায় প্রতিটি মানুষই একটু থেমে উৎসুক দৃষ্টিতে ভেতরে তাকিয়ে দেখছেন। জটলা পাকিয়ে একে অপরকে নির্মম ওই ঘটনার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তাদের সাথে কথা বলতে গিয়ে জানা গেল, তারা কেউই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নন। সবাই কারো না কারো কাছ থেকে এই ঘটনা শুনেছেন।

স্কুলটির উল্টোদিকেই একটি মাদ্রাসা রয়েছে। মাদ্রাসার পাশেই বেশ কয়েকটি পানের দোকান। তাদের মধ্যেই দুইজন প্রত্যক্ষদর্শী ব্যবসায়ীর সাথে আলাপ হয় পরিবর্তন ডটকমের এই প্রতিবেদকের। ঘটনার সময় তারা দোকানেই ছিলেন।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে তাদের একজন বলেন, 'আমি তো দোকান নিয়া ব্যস্ত ছিলাম, ঘটনা যা দেখার বাইরে থেইকাই দেখছি। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে চারদিকে খবর ছড়ায় স্কুলে নাকি ছেলেধরা ধরা পড়ছে। শত শত মানুষ স্কুলের ভেতরে ঢোকে, পরে স্কুলের ভেতরেই ওই মহিলারে পিটাইয়া মাইরা ফালায়।’

যারা মেরেছে তাদের চেনেন কি না এমন প্রশ্নে ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি তো ভেতরে ঢুকি নাই। কিন্তু টেলিভিশনে যে ভিডিও দেখাইছে তাতে দেখলাম তিন/চারজন পিটাইয়া মারতাছে। এর মধ্যে দুইজনরে চিনি, তারা এই বাজারেরই। ওই দুইজনের একজন হৃদয়, সে স্কুলের সামনে শাক বিক্রি করতো। আরেকজনের নাম মহিউদ্দিন, সে একটু সামনে সবজির দোকান নিয়া বসতো। ঘটনার পর থেইকা আর ওগো দেখি নাই।’

অপর ব্যবসায়ী বলেন, ‘সকালে যখন ওই মহিলারে ধরে, তার পর মুহূর্তেই চারিদিকে গুজব ছড়ায় ছেলেধরা ধরছে। তার ব্যাগে নাকি ক্লোরোফর্ম আর ছুরি পাওয়া গেছে, গলা কাটতে আইছে। এমন গুজবে শত শত মানুষ স্কুলের ভেতরে ঢুকে আর পিটাইয়া ওই মহিলারে মাইরা ফালায়। পরে শুনি, ওই মহিলা নাকি বাচ্চারে স্কুলে ভর্তি করার জন্য খোঁজখবর নিতে আইছিল।’

তিনি বলেন, ‘ভিডিওতে চেহারা দেখলাম, দুইজনরে চিনতে পারছি। তারা এইখানেই সবজি বিক্রি করতো। নাম জানা নাই আমার, কিন্তু কালকের পর থেইকা আর ওগো দেখি নাই এলাকায়।’

ছেলেধরা গুজবে রেনুকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় উত্তেজিত জনতা- দাবি প্রধান শিক্ষিকার

রেনুর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, পারিবারিক কলহের জের ধরে প্রায় দুই বছর আগে স্বামীর সঙ্গে রেনুর ডিভোর্স হয়। তাদের সংসারে তাসফিক আল মাহি (১১) ও তাসলিমা তুবা (৪) নামের দুই সন্তান রয়েছে। বিচ্ছেদের পর ছেলে বাবার সঙ্গে থাকে। আর মেয়ে মায়ের কাছে থাকতো। মেয়ে তুবাকে স্কুলে ভর্তি করার জন্য খোঁজখবর নিতেই শনিবার সকালে উত্তর বাড্ডায় ওই স্কুলে গিয়েছিলেন রেনু।

স্কুলের ভেতরে ছোট মাঠের কোণায় সিঁড়ির পাশে যে জায়গাটাতে রেনুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, সেখানে ইট দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সকালে রেনু ওই স্কুলে গিয়ে মেয়েকে ভর্তি করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং এর প্রক্রিয়া জানতে চান। কিন্তু জুলাই মাসে কীভাবে একজন অভিভাবক তার সন্তানকে ভর্তির জন্য স্কুলে আসে এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। রেনুকে নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে হয় এবং সেসব প্রশ্নের সদুত্তর দিতে না পারায় রেনুকে প্রধান শিক্ষিকার কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়।  

স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা শাহনাজ বেগম সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, রেনুকে উত্তেজিত জনতা তালাবদ্ধ কলাপসিবল গেট ভেঙে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে গণপিটুনি দিয়েছে।

তিনি বলেন, ওই নারীর কথাবার্তা সন্দেহজনক বলে অফিসের লোকজন তাকে আমার কক্ষে নিয়ে আসেন। তখন আমার সাথে আরেকজন শিক্ষক ছিলেন। আমরা তথ্য নিচ্ছিলাম যে, আপনার নাম কি, কোথা থেকে আসছেন? এর মধ্যেই বাইরে কে বা কারা ছড়িয়ে দিয়েছে স্কুলে ছেলেধরা এসেছে। অনেক মানুষ জড়ো হয়ে যাওয়ায় আমি আমার কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দিতে বলি। কিন্তু বাইরের উত্তেজিত লোকজন গেট ভেঙে এখান থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

তালা ভেঙে রেনুকে ছিনিয়ে নেয়ার প্রমাণ মেলেনি

স্থানীয় বাসিন্দা ও ওয়ার্ল্ড হিউম্যানিটি নামে একটি মানবাধিকার সংস্থার কর্মী মেহেদী হাসান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ওই নারী সকালে যখন স্কুলে আসেন তখন জুলাই মাসে কেন বাচ্চা ভর্তি করাতে আসবে এমন একটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে প্রধান শিক্ষিকার সাথে তার বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে ওই নারী বলেন, আমার বাড়ি এখানে না লক্ষ্মীপুরে। তখন প্রধান শিক্ষিকা সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং ওই নারীকে তালাবদ্ধ করে রাখতে বলেন।

তিনি আরো বলেন, অনেকেই বলছেন, ক্ষুব্ধ মানুষেরা তালা ভেঙে ওই নারীকে বের করে স্কুলমাঠে এনে গণপিটুনি দেয়। তবে বাস্তবে তালা ভাঙার প্রমাণ আমরা কেউই পাইনি। প্রধান শিক্ষিকা দাবি করেছেন যে, অভিভাবকেরা তাকে বলেছে ওই নারীর চালচলন সন্দেহজনক ছিল। কিন্তু আমি মনে করি, প্রধান শিক্ষিকার উচিত ছিল তাকে আইনের হাতে তুলে দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করা। কিন্তু তিনি তা না করে যখন তাকে তালাবদ্ধ করেছেন, তখন মানুষের মধ্যে সন্দেহটা আরো ঘনীভূত হয়েছে। ওই নারীকে এভাবে বের করে এনে মানুষের হাতে তুলে দেয়া উচিত হয়নি কারণ তালা ভাঙার কোনো প্রমাণ মেলেনি।

ফুটেজ দেখে তদন্ত করছে পুলিশ

রেনু হত্যার ঘটনায় শনিবার রাতে বাড্ডা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন তার ভাগিনা সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু। মামলাটিতে অজ্ঞাত ৪০০-৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ওই মামলায় এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা ও মোবাইলে ধারণকৃত কিছু ফুটেজ সংগ্রহ করে তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে খুনিদের শনাক্তে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের বাড্ডা জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আহমেদ হুমায়ূন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, আমরা ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা ও মোবাইলে ধারণকৃত কিছু ভিডিও ফুটেজ যাচাই-বাছাই করছি। এ ছাড়া স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। ওই ঘটনায় মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই জড়িতদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হবে।

পিএসএস/আরপি

 

রাজধানী: আরও পড়ুন

আরও