লাশ নিয়ে কারবার, লাশের সাথেই বসবাস (ভিডিও)

ঢাকা, ১৬ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

লাশ নিয়ে কারবার, লাশের সাথেই বসবাস (ভিডিও)

প্রীতম সাহা সুদীপ ৩:০৯ অপরাহ্ণ, জুন ২২, ২০১৯

‘এই চা টা জলদি শেষ কর, কই জানি লাশ পইড়া আছে আনতে হইবো।’ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পাশের সঙ্গীকে এভাবেই তাড়া দিচ্ছিল এক তরুণ। জবাবে সঙ্গীটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল- ‘লাশ কেমনে আনবি, ব্যাগ না শেষ হইয়া গেছে?’ তখন লাল কালো চেকে শার্ট পরা ওই তরুণ বললো- ‘না লাশের নতুন আরো ব্যাগ আইছে তো।’

কমলাপুর রেল স্টেশনের ওই চায়ের দোকানে দাঁড়িয়েই চা পান করছিলেন পরিবর্তন ডটকমের ফটো সাংবাদিক ওসমান গণি। দুই তরুণের মুখে লাশের কথা শুনতেই কৌতুহলের চোখে তাদের দিকে তাকালেন। দুজনেরই বয়স আনুমানিক ১৮-২০ বছর।

কথা বলে জানা গেল, লাল-কালো চেক শার্ট পরিহিত ওই তরুণের নাম শাকিল, আর তার সঙ্গী শাওন। ট্রেনে কাটা পড়া লাশ সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে রিকশা-ভ্যানে মর্গে নিয়ে যাওয়াই শাকিলের কাজ। আর তাকে এ কাজে সহযোগিতা করে শাওন।

দুজনের শরীরের ভাষাতেই স্পষ্ট যে তারা এই কাজে বেশ অভ্যস্ত। লাশ টানার কাজ কতদিন ধরে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে শাকিল জানালো- ‘বছর দুয়েক হইবো এই কাজ করতাছি। আমরা ছোট থেইকা এই স্টেশনেই বড় হইছি। ট্রেনে কাটা লাশ পড়লে যারা ওই লাশ তুইলা মর্গে নিয়া যাইতো, হেগো লগে থাকতে থাকতেই এই কাজ শিখছি।’

ভয় পান কিনা এমন প্রশ্নে শাকিল উত্তর দেয়- ‘ভয় কিয়ের, উপরে আল্লাহ আছে। তয় মাঝে মধ্যে স্বপ্ন দেহায়, লাশগুলা রাইতে আমার লগে কথা কয়। কেউ দেহে না শুধু আমিই দেহি। এসবই স্বপ্ন।’

ট্রেনের নিচে মানুষ কাটা পড়ার ঘটনা ঘটলেই ডাক পড়ে এই শাকিলের। আর সেসব লাশ নিয়েই কারবার এই তরুণের। কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলে শাকিলরা রিকশা-ভ্যান বা ট্রেনে করে ছুটে যান দুর্ঘটনাস্থলে। লাশের শরীরের বিভিন্ন অংশ কুড়িয়ে অবলীলায় লাশবাহী ব্যাগে ভরে প্রথমে নিয়ে আসে কমলাপুর রেলওয়ে থানায়। সেখান থেকে তাদের গন্তব্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে।

শুধু মাত্র রাজধানী নয়, শাকিলদের লাশ কুড়ানোর সীমানা অনেক বড়। কমলাপুর থেকে বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতু পর্যন্ত রেলপথে যত ট্রেনে কাটা লাশ পড়ে সবই টেনে আনতে হয় শাকিলদের। এই কাজ করে শাকিল মাসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পায়। কমলাপুর থানা থেকে কিছু টাকা দেয়, আবার নিহত ব্যক্তির স্বজনরা কিছু দেয়।

গ্রামের বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে শাকিল পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘বাড়ি চট্টগ্রামে, মা-বাবা ওই হানেই থাকে।’ বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয় কিনা জানতে চাইলে মাথা নেড়ে ‘না’ বলেন এই তরুণ।

সত্যিই কি এই কাজে আপনার একেবারেই ভয় লাগে না? এই প্রশ্নের জবাবে শাকিল জানান, ‘ভয় পাই মাঝে মধ্যে। একবার টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ার তিন দিন পর আমাগো ডাক দিছে লাশ আনতে। পরে গিয়া দেহি বডি পইরা রইছে রেললাইনের লগে, আর মাথাডা লাইনের ওপরে। মগজ-ঘিলু সব বাইর হইয়া গেছে। ওইদিন খুব ভয় লাগছিল।’

শাকিলের থাকার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নেই। তবে কমলাপুর রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে ঢুকতেই ছোট একটা জায়গা দেখিয়ে তিনি জানালেন, বেশিরভাগ সময় এখানেই থাকেন। শাকিলের কোনো মোবাইল ফোন নেই। তার সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম কমলাপুর রেলওয়ে থানা। গল্প করতে করতেই হঠাৎ ডাক আসে শাকিলের। তাই তাকে চলে যেতে হয়। আর এর অনেক আগেই গল্পে ফাঁকে কখন যে শাকিলের বন্ধু শাওন সেখান থেকে চলে গেছে, খেয়ালই পড়ে নি। হয়তো নতুন কোনো লাশের সন্ধান পেয়ে ছুটে গেছে সেখানে। 

ছবি/ভিডিও- ওসমান গণি

পিএসএস/এএসটি

 

রাজধানী: আরও পড়ুন

আরও