বাবার মৃত্যুর পর থেকেই ‘বিপর্যস্ত’ ছিল মুহিবরা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯ | ২ কার্তিক ১৪২৬

বাবার মৃত্যুর পর থেকেই ‘বিপর্যস্ত’ ছিল মুহিবরা

প্রীতম সাহা সুদীপ ১০:৪৬ অপরাহ্ণ, মে ১৪, ২০১৯

বাবার মৃত্যুর পর থেকেই ‘বিপর্যস্ত’ ছিল মুহিবরা

জীবন নিয়ে অনেক উচ্চাশা ছিল মুহিব হাসানের। সহজ-সরল গোছের মুহিবের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল বাবার অবর্তমানে পরিবারের হাল ধরে মা ও একমাত্র প্রতিবন্ধী বোনকে সুখে রাখা। আর সেই স্বপ্ন পূরণ করতেই ভাল একটি চাকরির সন্ধান করছিলেন এই যুবক। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না।

মা-বোনকে সাথে নিয়ে পরপারে পাড়ি জমালেন মুহিব। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি অর্থনীতি বিভাগে ২০১৫ সালের জুন-জুলাইয়ের দিকে অনার্স শেষ করেন মুহিব। এরপর ঢাকায় এসে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিউপি) এমবিএ করেন।

২০১৬ সালে বাবা বিআরডিবির ব্যবস্থাপক ইকবাল হোসেনের মৃত্যুর পরই বদলে যায় মুহিবের জীবন। সহজ-সরল সদা হাস্যজ্জল মুহিব একেবারেই চুপচাপ হয়ে যায়।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মুহিবের সহপাঠী ছিলেন সৌমিক সাহা। তিনি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, মুহিব খুবই সহজ সরল ছিল। একটু বোকাসোকাও ছিল, যে কারণে বন্ধুমহলের সবাই তার সাথে প্রায়ই হাসিঠাট্টা করতো। কিন্তু সেসব হাসিঠাট্টায় কখনো রাগ করতো না মুহিব। বন্ধুমহলের প্রাণ ছিল এই ছেলেটি। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পরই অনেক বদলে গিয়েছিল সে।

মুহিবের খুব কাছের বন্ধু তরিকুল ইসলাম আদর বলেন, মুহিব জীবনকে সব সময় গুছিয়ে রাখতে চাইত। সব সময় পরিপাটি থাকত। জীবন নিয়ে ওর অনেক উচ্চাশা ছিল। কিন্তু অকালেই সে এভাবে থেমে গেল, বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছে।

মা-সন্তানদের মৃত্যু হত্যা না আত্মহত্যা!

রোববার রাতে উত্তরখানের চাপানেরটেক এলাকার ৩৪/ডি নম্বর বাড়ি থেকে মুহিব হাসানের (২৮), তার মা জাহানারা খাতুন মুক্তা (৪৭) ও ছোটবোন তাসফিয়া সুলতানা মিমের (২০) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের মরদেহের পাশ থেকে দুইটি চিরকুটও উদ্ধার করা হয়। তবে তাদের মৃত্যু কি আত্মহত্যা না পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সেটা নিয়ে রহস্য দেখা দিয়েছে।

নিহতদের ময়নাতদন্তের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ডা. সোহেল মাহমুদ পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ছেলে মুহিব হাসানের গলায় যে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, সেটি দেখে মনে হয়েছে তাকে গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে। আর মা জাহানারার গলায় ও পেটে ছুরিকাঘাতের হালকা দাগ রয়েছে। তবে তার মৃত্যু হয়েছে শ্বাসরোধে। মেয়ে তাসফিয়া সুলতানা মিমের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।

অন্যদিকে মরদেহের পাশে পুলিশ যে দুইটি চিরকুট পেয়েছে, তাতে নিহত মা ও সন্তানেরা নিজেদের মৃত্যুর জন্য আত্মীয়-স্বজন ও নিজেদের ভাগ্যকে দায়ী করেছেন। সেই সঙ্গে তাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করে দেওয়ার জন্যও অনুরোধ করেছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশ উত্তরা জোনের উপ-কমিশনার নাবিদ কামাল শৈবাল পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, এটা হত্যাকাণ্ড না আত্মহত্যা সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট করে কিছুই বলতে পারছি না। নিহতদের মরদেহের পাশে দুটি সুইসাইডাল নোট পাওয়া গেছে, এগুলো তাদের হাতের লেখা কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, নিহতদের জমিজমা সংক্রান্ত ও পারিবারিক কোন বিরোধ ছিল কিনা এবং সেই বিরোধ থেকেই তাদের হত্যা করা হয়েছে কিনা সেগুলোও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তের পরই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।

বাবার মৃত্যুর পর নানা বিপর্যয়ে ছিল মুহিবের পরিবার:

বাবা ইকবাল হোসেনের মৃত্যুর পর নানা বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল মুহিব ও তার পরিবার। বাবার পেনশনের ৪০ লাখ টাকা তুলতে পারছিল না তারা। এছাড়া মুহিবের বোন মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় সমাজে বারবার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছিল এই পরিবারকে। এমন অবস্থায় মৌলভীবাজার থেকে ভৈরব এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে ঢাকায় আসতে বাধ্য হয় মুহিবরা। চলতি মাসের শুরুতে উত্তরখানের ওই বাসায় ভাড়া উঠে পরিবারটি। ভাড়া বাড়িটির পাশেই মুহিবের বাবা ইকবাল হোসেন চার কাঠা জমি কিনে রেখেছিলেন। টিনসেড ঘর তৈরি করার পর পৈতৃক জমিতেই থাকার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

জাহানারার বড় ভাই মনিরুল ইসলাম বলেন, জাহানারার স্বামী ইকবাল উত্তরখানে চার কাঠা জমি কিনেছিল। তারা ভৈরবে থাকতে না পেরে চলতি মাসের শুরুতে উত্তরখানে চলে আসে। স্বামীর কেনা জমিতে আপাতত টিনশেড বাড়ি করে স্বজনদের কাছ থেকে দূরে থাকার চিন্তা ছিল তার। এ কারণে জাহানারা ওই জমির কাছেই বাসা ভাড়া নিয়েছিল। কিন্তু এভাবে তাদের মৃত্যু হবে বুঝতে পারিনি।

জমি নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব: 

মুহিবের বাবা ইকবাল হোসেনের গ্রামের বাড়ি ভৈরবের জগন্নাথপুরের প্রতিবেশীরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইকবাল হোসেনের বাড়িটি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে করার সময় সরকার অধিগ্রহণ করেছিল। পরে ইকবাল হোসেন তার ভাইদের সঙ্গে জগন্নাথপুরে একটি বাড়ি কিনেছিলেন।

ওই বাড়ির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে তার ভাইদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। বিরোধের কারণে তাদের বাড়িতে থাকতেও দেয়া হতো না। সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে আগামী ঈদের পর ভৈরবে সালিশ হওয়ার কথা ছিল।

প্রতিবেশী ওয়াহিদ মিয়া জানান, ইকবালের পরিবারের সঙ্গে তার ভাইদের বাড়ি নিয়ে বিরোধ ছিল। তারা ভৈরবে ওই বাড়ির পাশে বাসা ভাড়া নিয়েও থেকেছিল কিছুদিন। কিন্তু আত্মীয়দের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে ইকবালের মৃত্যুর পর তারা আর এখানে থাকতে পারেনি।

যেভাবে মা-সন্তানের মরদেহ উদ্ধার:

উত্তরখানের বাড়িটির কেয়ারটেকার মাহবুব আলম বলেন, পরিবারটি রোজা শুরুর আগের দিন বাসায় উঠেছিলেন। গত বৃহস্পতিবার ওই নারী (জাহানারা) যখন তার মেয়েকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছিলেন সে সময় দেখা হয়েছিল। এরপর থেকে আর তাদের দেখিনি।

রোববার বিকালে তাদের এক আত্মীয় আসলেন। অনেক নক করার পরও ভেতর থেকে কেউ দরজা খুলছিল না। পরে ঘরের একটি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি লাইট-ফ্যান সব চলছে। আরেক ঘরের জানালায় ধাক্কা দিয়ে দেখলাম ছেলেটা মেঝেতে পড়ে আছে, আর মা-মেয়ে খাটে। পরে পুলিশে খবর দিলাম।

মুহিবদের বাসাটি ভাড়া নিয়ে দিয়েছিলেন স্থানীয় নান্টু মিয়া। তিনি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, বৃহস্পতিবার তাদের সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম, শুনলাম তারা নাকি ডাক্তারের কাছে গেছে। শুক্রবার ফোন দিলাম কেউ ফোন ধরে না। পরে রোববার মুহিবের খালু ফোন করে কয়, ওরা তো ফোন ধরছে না। গিয়া দেখেন তো কিছু হইল নাকি আবার? এরপরেই আমি ওই বাসায় গিয়া দেখি তারা মইরা পইরা আছে। পরে পুলিশে খবর দিয়া মরদেহ বাইর করছি।

তিনি জানান, উত্তরখানে মুহিবদের চার কাঠা জমি রয়েছে। সেই জমিতে চলতি বছর নতুন বাড়ি করার কথা ছিল তাদের। সে জন্য সাত থেকে আট লাখ টাকার একটি বাজেটের কথাও জানিয়েছিল মুহিব। চলতি রমজানে জাহানারার ভাইবোনেরা মিলে এ ব্যাপারে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল।

পিএসএস/এসবি

 

রাজধানী: আরও পড়ুন

আরও