জনসভায় ঐক্যের নেতারা কে কী বললেন?

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

জনসভায় ঐক্যের নেতারা কে কী বললেন?

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ১০:০০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৬, ২০১৮

জনসভায় ঐক্যের নেতারা কে কী বললেন?

দাবি আদায়ে প্রথম রাজধানীতে জনসভা করল প্রবীণ আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন নবগঠিত রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মঙ্গলবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই জনসভায় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়াও ২০ দলীয় জোটের নেতারা বক্তব্য দেন।

জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ড. কামাল হোসেন।

জনসভায় সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ ৭ দফা দাবি আদায়ে হুঁশিয়ারি দেন জাতীয় ঐক্যেফ্রন্টের নেতারা। দাবি আদায় না হলে তারা রোডমার্চ, পথসভাসহ কঠোর কর্মসূচিরও হুমকি দেন।

জনসভার শেষ দিকে সভাপতির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আগামীকালের (মঙ্গলবার) সংলাপে দাবি না মানা হলে ৮ মার্চ রাজশাহী অভিমুখে রোডমার্চ করা হবে। সেখানে পরের দিন ৯ নভেম্বর সমাবেশ করা হবে। এরপর ধারাবাহিকভাবে খুলনা ও ময়মনসিংহেও রোডমার্চ এবং সমাবেশ করা হবে। আর তফসিল না পেছালে নির্বাচন কমিশন অভিমুখেও পদযাত্রা করা হবে।’

বিরোধী নেত্রীকে জেলে রেখে গণতন্ত্র থাকে না

জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘এদেশ কোনো মহারাজা, মহারানীর নয়, এদেশের মালিক জনগণ। দেশে যা হচ্ছে, তা মেনে নেয়া যায় না।’

খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তি দাবি করে তিনি বলেন, ‘আইন সবার জন্য সমান। সরকারি দলের জন্য এক আর বিরোধী দলের জন্য অন্য আইন, হতে পারে না। স্বাধীন বাংলাদেশে এটা চলতে পারে না।’

গণফোরাম সভাপতি বলেন, ‘যাকে-তাকে যেভাবে ইচ্ছে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খালেদা জিয়াকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। বিরোধী দলের নেতাকে বন্দি রেখে দেশে গণতন্ত্র থাকে না। আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি, ঐক্যবদ্ধ থাকব। সুষ্ঠু নির্বাচন হতে হবে, সেটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।’

ভাওতাবাজিতে লাভ হবে না

জনসভায় নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে বসে আমাদের দাবি জানিয়েছি। বলেছি, রাজনৈতিক মামলায় হয়রানি করা চলবে না। আমরা আবার সংলাপে বসব। এবার খালি মুখে মুখে কথা বললে চলবে না। লেখালেখি শুরু করতে হবে, যেন পরবর্তীতে অস্বীকার করতে না পারে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের একমাত্র দাবি, শেখ হাসিনা ও এই কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। একসঙ্গে দুই সংসদ চলবে না। একসঙ্গে দুই সংসদ মানে একজন একদিকে ভোট চাইবেন, অন্যদিকে বড় বড় প্রকল্প অনুমোদন করবেন। ভাওতাবাজি করে কোনো লাভ হবে না।’

জনসভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘৬৪ বছর আগে মুসলিম লীগের আমলে সব রাজনৈতিক দল এক হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে মুসলিম লীগ ৮টির বেশি আসন পাবে না, পরে সেটাই হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘এত বছর পরে আবার সকল রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়েছে। এবার আমাদের দাবি মানতে হবে। তাহলে এদেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাবে।’

প্যারোলে কবরে যাওয়ার সময় আসছে

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আজকের এই সমাবেশে সব মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নিয়েছেন। কোনো প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা এখানে নেই। এই সমাবেশ থেকে বলতে চাই— বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মাইনাস করে বাংলাদেশে এমন কোনো বাপের ব্যাটা নাই। আজ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে আলোচনা হতে পারে। খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি দিতে হবে? সময় আসছে, আপনাদের প্যারোলে কবরে যেতে হবে, প্রস্তুতি নিন।’

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘ইভিএমের মাধ্যমে কম্পিউটারের বোতাম টিপাটিপি করে কারসাজির কোনো নির্বাচন করতে দেয়া হবে না। সরকার যদি মনে করে, ডিসি-এসপি দিয়ে আবার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি মার্কা নির্বাচন করবেন, তাহলে তাদের জেনে রাখতে হবে, এটা আর বাংলার মাটিতে হবে না।’

সরকারের চোখে ছানি, উচ্চ রক্তচাপ

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, ‘আমি একজন চিকিৎসক ও মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু, প্রশ্ন উঠেছে আমি এই রাজনীতিতে কেন? এখানে আসার কারণ সরকারের চোখে ছানি পড়েছে। তাদের উচ্চ রক্তচাপ শুরু হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এই সরকার মাদকের নাম করে সাড়ে ৪শ’ মানুষ হত্যা করেছে। এমন একটা অবস্থায় কিছুদিন আগে ১৬/১৮ বছরের কিশোর-কিশোরীরা রাস্তায় নেমে এসে বলেছে— রাষ্ট্রের মেরামত প্রয়োজন। এটার ছবি তোলার জন্য আলোকচিত্রী শহিদুল আলম কারাগারে।’

জাফরুল্লাহ বলেন, ‘আজ আপনাদের করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। আজ এখানে যেমন উপস্থিত হয়েছেন, সেভাবে ভোট কেন্দ্রে সকল বাধা উপেক্ষা করে উপস্থিত হতে হবে।’

বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, স্বৈরাচার সরকার প্রতিপক্ষের উপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মাধ্যমে আমাদের বুঝতে হবে, আমরা জয়ের মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছি।

ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ বলেন, ‘এই সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, যেখানে বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ভাষণ দিয়েছিলেন। এই সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যেখানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল। এই উদ্যান থেকে দেয়া বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য শুনে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, সুনামগঞ্জ থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে জেগে উঠেছিল, আজ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের ঐক্য ফিরিয়ে এনে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠাতা করা হবে।

সমাবেশে গায়েবি জনগণ

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেছেন, ‘সরকার আমাদের নামে গায়েবি মামলা দেয়। কিন্তু, আমরা যদি কোনো সমাবেশ ডাকি, সেই সমাবেশে গায়েবি জনগণ এসে উপস্থিত হয়।’

তিনি বলেন, ‘আজ সমাবেশে আসার সকল পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তারপরও জনসভা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে।’

পার্থ বলেন, ‘এই জনসমুদ্র প্রমাণ করে শেখ হাসিনার কোনো ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। ঐক্যফ্রন্ট যে ৭ দফা দাবি দিয়েছে, ইনশাআল্লাহ আমি আশা করি, এই দাবি পূরণ হবেই, হবে।’

বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আমাদের সংলাপ ও আন্দোলন একসঙ্গে চলবে। দ্বিতীয় দফা সংলাপে ব্যর্থ হলে সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।’

বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরীর এ্যানি ও সাংগঠনিক সহ-সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদের সঞ্চালনায় জনসভায় আরও বক্তব্য দেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, চেয়াপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, ঐক্যফ্রন্ট নেতা অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক, এলডিপি মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহম্মেদ, জেএসডির সহ-সভাপতি তানিয়া রব, বিকল্পধারার (একাংশ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন ব্যাপারী প্রমুখ।

জনসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আলতাব হোসেন, বেগম সেলিমা রহমান, মো. শাজাহান, শামসুজ্জামান দুদু, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুক, হাবিবুর রহমান হাবিব, ড. সুকোমল বড়ুয়া, আব্দুস সালাম, আতাউর রহমান ঢালী, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, এমরান সালেহ প্রিন্স, শামা ওবায়েদ, সহ-প্রচার সম্পাদক কৃষিবিদ শামিমুর রহমান, নির্বাহী কমিটির সদস্য নাজিম উদ্দীন আলম, তকদির হোসেন মো. জসিম, আবু নাসের মোহাম্মাদ রহমাতুল্লাহ, কামরুদ্দিন এহিয়া খান মজলিস, যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নিরব, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, সিনিয়র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, ছাত্রদলের সভাপতি রাজিব আহসান প্রমুখ।

এমএইচ-টিএটি/আইএম

আরও পড়ুন...
‘দাবি না মানলে আন্দোলনের বিকল্প নেই’
তফসিল না পেছালে ইসি অভিমুখে পদযাত্রা
সংলাপ ব্যর্থ হলে ৮ নভেম্বর ঐক্যের রোডমার্চ
নির্বাচনের হার-জিত ঐক্যফ্রন্টের হাতেই: কাদের সিদ্দিকী
সরকারের কথার কোনো দাম নেই: কামাল