শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না রাজীবের

ঢাকা, সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮ | ৭ শ্রাবণ ১৪২৫

শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না রাজীবের

প্রীতম সাহা সুদীপ ১:৫৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৭, ২০১৮

print
শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না রাজীবের

বিসিএস দিয়ে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন রাজীব হোসেন। ছোট দুই ভাইকে শিক্ষার আলোতে আলোকিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্মম একটি দুর্ঘটনা কেড়ে নিল তার সব স্বপ্ন। হাসাপাতালের বিছানায় শুয়ে টানা ১৩ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে হার মানতে হলো তাকে।

তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় রাজীব মা আকলিমা খানমকে হারান। মা মারা যাওয়ার পর তার বাবা হেলালউদ্দিনও শোকে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারান রাজীব।

পরে রাজীব ও তার ছোট দুই ভাইয়ের ঠাঁই হয় পটুয়াখালীর বাউফলে নানার বাড়িতে। সেখান থেকে ঢাকায় এসে পোস্ট অফিস হাইস্কুলে ভর্তি হন রাজীব। খালার বাড়ি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর যাত্রাবাড়ীর মেসে গিয়ে ওঠেন তিনি।

নিজের পায়ে দাঁড়াতে রাজীব টিউশনির পাশাপাশি কম্পিউটার কম্পোজ, গ্রাফিকস ডিজাইনের কাজ শিখছিলেন। পড়াশোনার বাইরে সারাদিন উপার্জনের পেছনে ছুটতেন। লক্ষ্য ছিল একটাই নিজের পায়ে দাঁড়ানো আর ছোট ভাই দুটির দায়িত্ব নেয়া। ছোট দুই ভাই মেহেদী হাসান আর হৃদয় হোসেন আব্দুল্লাহ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, তারা দুজনেই কোরআনের হাফেজ।

রাজীবের মামা জাহিদুল ইসলাম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, রাজীব মামা, খালা, চাচার কাছে ঘুরে ঘুরে বড় হয়েছে। শত কষ্টের পরও ওরা তিনভাই নিজেদের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল। তারা খুবই ভাল স্টুডেন্ট, খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতো। রাজীব পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করতো, কম্পিউটারে গ্রাফিক্সের কাজ করতো।

তিনি বলেন, তিনটা ভাই কোনো প্রাইভেট শিক্ষক ছাড়াই পড়াশোনা করেছে। মধ্যরাতেও কম্পিউটারে বসে কাজ করতো রাজীব। এত রাতে কাজ কেন করছো জানতে চাইলে বলতো- 'মামা টাকার দরকার আছে। আমার নিজের চলার জন্য, ছোট দুই ভাইয়ের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের জন্য টাকার অনেক দরকার।'

কাঁদতে কাঁদতে রাজীবের মামা বলেন, রাজীবের জীবনটা শুধু কষ্টে কষ্টেই গেছে। ও আজ পর্যন্ত সুখের সন্ধান পায় নাই। হয়তো বিধাতা ওর কপালে সুখ লেখে নাই। ওর কপালে সুখ থাকলে বিধাতা ওকে এইভাবে নিয়ে যেত না। বিসিএস দিয়ে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ছিল রাজীবের। সেই স্বপ্নও পূরণ হলো না। অনেক জায়গায় চাকরির জন্য অ্যাপ্লাই করেছিল সে, হয়তো ভাল একটা চাকরি হয়েও যেত, কিন্তু তার আগেই নির্মম দুর্ঘটনা রাজীবের প্রাণ কেড়ে নিল।

রাজীবের খালা খাদিজা বেগম লিপি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, বড় হয়ে যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, যাতে মানুষের উপর ভরসা করতে না হয় সেইজন্য সব সময় সরকারি চাকরির চিন্তা করত রাজীব। ওর স্বপ্ন ছিল বড়, কিন্তু সেই সব স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।

বাসচালক ও সহযোগীদের শাস্তির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের ছেলে যদি সুস্থ থাকত, তাহলে ড্রাইভার ছাড়া পেলেও কিছু বলতাম না আমরা। কিন্তু আমাদের ছেলেই তো নাই, আমরা চাই ড্রাইভারের যেন কঠিন শাস্তি হয়। আর কোনো পরিবার যাতে ধ্বংস না হয়।

এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে রাজীবের ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস জানান, মস্তিস্কে আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই রাজীবের মৃত্যু হয়েছে।

এরআগে সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজীবের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রাত ১২টা ৪০ মিনিটে রাজীবকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।

গত ৩ এপ্রিল বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন মহাখালী থেকে সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতকের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেন। বাসটি হোটেল সোনারগাঁওয়ের বিপরীতে পান্থকুঞ্জ পার্কের সামনে পৌঁছালে হঠাৎ করে পেছন থেকে স্বজন পরিবহনের একটি বাস ওভারটেক করে।

সে সময় বিআরটিসির দোতলা বাসটির পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে থাকা রাজীবের ডান হাতটি বাইরের দিকে সামান্য বেরিয়েছিল। স্বজন পরিবহনের বাসটি বিআরটিসি বাসের গা ঘেঁষে পেরিয়ে যাওয়ার সময় রাজীবের হাতটি কাটা পড়ে। তাকে দ্রুত পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা চেষ্টা করেও বিচ্ছিন্ন সে হাতটি রাজীবের শরীরে আর জোড়া লাগাতে পারেননি। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

রাজীব হোসেনের চিকিৎসার যাবতীয় খরচ সরকার বহন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। সুস্থ হলে তাকে সরকারি চাকরি দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সুস্থ হয়ে ওঠার আগেই পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিলেন রাজীব।

পিএসএস-এমআর/এসবি
আরো পড়ুন...
বাবা-মার পাশে দাফন করা হবে রাজীবকে
মৃত্যুর কাছে হেরে গেলেন রাজিব
মস্তিষ্কেও আঘাত লেগেছে রাজীবের
রাজীবের চিকিৎসার খরচ বহন করতে বাস মালিকদের নির্দেশ হাইকোর্টের
রাজীবের হাত খোয়ার ঘটনায় দুই বাসচালক গ্রেফতার
‘হাত নেই, খেয়ে আর কি হবে’

 
.



আলোচিত সংবাদ