নবীন বাংলাদেশের জন্য প্রবীণ বাজেট: সিপিডি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

নবীন বাংলাদেশের জন্য প্রবীণ বাজেট: সিপিডি

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৪:০৭ অপরাহ্ণ, জুন ০৮, ২০১৮

নবীন বাংলাদেশের জন্য প্রবীণ বাজেট: সিপিডি

২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘নবীন বাংলাদেশের জন্য প্রবীণ বাজেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। শুক্রবার দুপুরে গুলশানে হোটেল লেকশোর লা বিটা হলে আয়োজিত বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য একথা বলেন।

বাজেটের উপর সিপিডির পর্যালোচনায় দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এই বাজেট একটি নির্বাচনী বছরের বাজেট এবং একটি সপ্তম পঞ্চম বার্ষিকীর শেষ বছরের বাজেট। আমাদের বৈশিক উন্নয়ন কর্মসূচির যে হাজার দিন যাচ্ছে সে সময়কার বাজেট।

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে দ্বৈত্য উত্তরণ ঘটেছে, স্বল্প উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার যে স্বকৃীতি রূপান্তরিত হয়েছে, একই সময় স্বল্প আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হওয়ার যে সুযোগ হয়েছে, এ নিয়ে যখন আমরা বাজেট করছি তখন ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আমাদের দেশে অবস্থান করছে।

সুখের কথা হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি কিছুটা হলেও চাঙ্গা হয়ে উঠছে। একই সময় আমাদের বিভিন্ন পণ্যের দাম বিশ্ব বাজারে বেড়ে চলছে। চীন ও ভারতের মতো বড় বড় ভূখণ্ডে মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া পশ্চিমা দুনিয়া একটি বাণিজ্য সংঘাতের মধ্যে এগিয়ে চলছে। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক যে কাঠামো রয়েছে তা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, ২টি মাপকাঠির উপর ভিত্তি করে ২০১৮-১৯ সালের বাজেট পর্যালোচনা করেছে সিপিডি। প্রথমটি হলো- অর্থনীতিতে যে নতুন চাপ সৃষ্টি হচ্ছে সেই চাপ মোকাবেলা করে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা করার ক্ষেত্রে এ বাজেট কতখানি কার্যকর হবে। দ্বিতীয়টি হলো-বাংলাদেশে একটি সাম্য ভিত্তিক, ন্যায় ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে যে প্রবৃদ্ধির কথা আমরা বলছি, সেই প্রবৃদ্ধি কতখানি অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, গরিব ও সাধারণ মানুষের পক্ষে যাবে সেটাও যাচাই করব।

অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা ও সাধারণ মানুষের পক্ষে যাবে কি না এ দুইটি মাপকাঠির হিসাবে বাজেট পর্যালোচনা করা হয়েছে।

অর্থনীতির শক্তিশালী নিয়ামকগুলোর বিষয়ে দেবপ্রিয় বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের অর্থনীতির যেসব শক্তির জায়গা রয়েছে সেটা হলো— প্রবৃদ্ধি ভালো চলছে, সরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় ভালো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে, আমাদের সামাজিক সুরক্ষার জায়গাটি শক্তিশালী হচ্ছে এবং সাম্প্রতিক কালে আমাদের বৈদেশিক সাহায্যের প্রবাহ বাড়ছে।

কিন্তু এর পাশাপাশি আমরা কিছু স্বল্প মেয়াদি সমস্যা দেখতে পাচ্ছি— আমাদের রাজস্ব আয় আদায় দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, আমাদের কিছু কিছু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, আমাদের কৃষকরা যে প্রণোদনামূলক দাম পাওয়ার কথা তারা তা পাচ্ছে না এবং আমাদের বৈদেশিক আয়-ব্যয় খাতে একটা বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

এটার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের প্রতি ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ক্রমান্বয়ে খাদ্য পণ্যের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারের অবস্থা খুব বেশি শক্তিশালী অবস্থানে নেই। এরকম একটি মধ্য মেয়াদি শক্তি ও চাপের মধ্যে বাজেটটি তৈরি হয়েছে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ ধরা হয়েছে। এ বিনিয়োগের যে লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখ্য করা হয়েছে সেই লক্ষ্যমাত্রা কার্যকর করতে হলে ব্যক্তি খাতে ১১৭ হাজার কোটি টাকা বাড়তি বিনিয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ গত বছর যা বিনিয়োগ হয়েছে তার চেয়ে ১১৭  হাজার কোটি টাকা ব্যক্তি খাতকে আরো বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি গত বারের তুলনায় সরকারকে আরো ৩০ হাজার কোটি টাকা বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।

এসময় ব্যক্তি খাতে প্রায় ১৫০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি বিনিয়োগ প্রত্যাশা করা হয়েছে। এতে করে আমাদের পুঁজির উৎপাদনশীলতা কমে যাবে। পাশাপাশি প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৫.৬ শতাংশের ঘরে থাকবে বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। আমরা এটার ব্যাপারে গভীর সংশয় প্রকাশ করছি।

প্রবৃদ্ধির হার উঁচু কিংবা নিচু হতে পারে কিন্তু এর মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন হতে হবে। তাদের পেতে হবে বেশি। কিন্তু আমরা দেখছি বাংলাদেশে একটি পূর্ব-পশ্চিম ভাগ তৈরি হয়েছে। এক দিকে, সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা অপরদিকে বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী। একদিকে উন্নততর বাংলাদেশ, আরেক দিকে দরিদ্রতর বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, আমদানির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তার সাথে বাস্তবতার কোনো সমন্বয় হয়নি। কারণ, গত অর্থবছরেই (এবার) ২৪ শতাংশ আমদানি বেড়েছে। সেখানে আগামী অর্থবছরে আমদানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ শতাংশ। আমরা মনে করি আমাদের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং যেসব বড় প্রকল্প চলছে তার সাথে এর কোনো সামঞ্জস্যতা নেই।

বর্তমান বাজেটে যে হিসাবে ডলার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে তা হচ্ছে ডলার প্রতি ৮২ টাকা। কিন্তু আপনারা জানেন ইতোমধ্যে ডলারের দর ৮৩ টাকার উপর অবস্থান করছে। সেহেতু আমরা মনে করছি এ বাজেটে বৈদেশিক মুদ্রা হার গনণার ক্ষেত্রে তারা অনেক সংরক্ষণশীলতা প্রদর্শন করেছে। এটা বাজেট শৃঙ্খলা নষ্ট করবে এবং ব্যত্যয় নিয়ে আসবে।

বাজেটে কালো টাকা সাদা করার বিষয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আপনারা জানেন যে, গত বছর থেকে চলছিল। বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করলে এবং একইসাথে সরকারি ব্র্যান্ডে বিনিয়োগ করলে বা ১০ শতাংশ হারে শাস্তিমূলক ট্যাক্স দিয়ে কালো টাকা সাদা করতে পারবে। আমরা সর্বদা বলেছি, অঘোষিত আয়কে সুবিধা দিয়ে বৈধ করাকে নীতিগতভাবে আমরা বিরোধী। আর এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেও খুব বেশি লাভ হয়নি। অর্থমন্ত্রী নিজেও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এটার জন্য অন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন— প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান, ড. ফাহমিদা খাতুন, ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমসহ আরো অনেকেই।

জেডএস/টিএটি/এএল/