বরগুনায় আটশ স্কুলের মধ্যে ৩৪৮টিই ঝুঁকিপূর্ণ

ঢাকা, ২০ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

বরগুনায় আটশ স্কুলের মধ্যে ৩৪৮টিই ঝুঁকিপূর্ণ

মো: জাহিদ হাওলাদার, বরগুনা ১০:৩০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০১৯

বরগুনায় আটশ স্কুলের মধ্যে ৩৪৮টিই ঝুঁকিপূর্ণ

বরগুনার ৬টি উপজেলায় ৮০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৪৮ টিই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৩৪টিকে ইতোমধ্যে পরিত্যক্তও ঘোষণা করা হয়েছে।

এসব স্কুলের সবগুলোরই পলেস্তারা খসে পড়ছে। ফাটল দেখা দিয়েছে অধিকাংশ বিদ্যালয়ের, বৃষ্টির মৌসুমে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে। নড়বড়ে এসব বিদ্যালয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি বরগুনার তালতলী উপজেলার পিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাদের বিম ধসে এক শিক্ষার্থী নিহত ও ৫ শিক্ষার্থী আহতের ঘটনা ঘটে। এছাড়া আমতলী উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের তক্তাবুনিয়া জগৎচাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বরগুনা সদর উপজেলার পৌর শহরের ১৬ নম্বর মধ্য বরগুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পলেস্তারে খসে পড়ে। তবে এ দুটি বিদ্যালয়ে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা সদর উপজেলায় ২৩০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে ১০৪টি। আমতলী উপজেলায় ১৫৩ টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৮ টি ঝুঁকিপূর্ণ। তালতলী উপজেলায় ৭৯ টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ৪৭টি। পাথরঘাটা উপজেলায় ১৪৯ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭৪টি বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ। বামনা উপজেলায় ৬২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯টি বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ। আর বেতাগী উপজেলায় ১২৭ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

সরেজমিনে বরগুনার তালতলী উপজেলার মেনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বরগুনা সদর উপজেলার পূর্ব ঢলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য বরগুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ক্রোক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘুরে দেখা গেছে, স্কুলগুলোর পলেস্তারা খসে পড়ছে। ফাটল দেখা দিয়েছে বিভিন্ন বিম ও ছাদে, স্যাতসেতে হয়ে গেছে দেয়াল গুলো, দরজা-জানালা ভাঙা। কোন মতে জোড়াতালি দিয়ে এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান করা হচ্ছে। কোন কোন বিদ্যালয়ের অবস্থা এতই নাজুক যে ভেঙে পড়ার ভয়ে পাঠদান বন্ধ করে বিকল্প ব্যবস্থায় পাঠ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

বরগুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামিমা নীপা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল, সম্প্রতি ভবনটির ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। এখন ঝুঁকি নিয়ে আমরা পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি।

পূর্ব গুলিশাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক বলেন, বিদ্যালয়টি ২০০৭ সালে সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর বিদ্যালয় ভবনটিকে কর্তৃপক্ষ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বিকল্প কোন ভবন না থাকায় একরকম বাধ্য হয়েই পরিত্যক্ত ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাঠ কার্যক্রম চালাচ্ছি।

ক্রোক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল আলীম বলেন, বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে এক বছর হলো। কিন্তু এখনো আমরা নতুন ভবন পাইনি। ঝড়ের সময় শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভবনের বাইরে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়। ভবনটি যে কোন সময় ধসে পড়তে পারে।

বরগুনা জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালে ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয় জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ২২ হাজার ৯২১, দ্বিতীয় ধাপে ১৭১৯টি বিদ্যালয় এবং তৃতীয় ধাপে ৫৩৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। সে সময় বরগুনাতে যে বিদ্যালয়গুলো জাতীয় করণ করা হয় সে বিদ্যালয়গুলোর ভবনের অবস্থা তেমন একটা ভাল ছিলো না। সেই বিদ্যালয়গুলোই এখন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

ভবনগুলো কেন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের বরগুনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম কবীর বলেন, বরগুনা জেলা উপকূলবর্তী হওয়ায় লবনাক্ততা ও আবহাওয়ার কারণে ভবনগুলো নির্ধারিত সময়ের আগেই পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। তাছাড়া এ ভবনগুলো নির্মাণের পর শিক্ষা বিভাগ থেকে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে ভবন রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য যে অর্থ দেওয়া হয়, তা দিয়ে সঠিক ভাবে কাজ করতে না পারার কারণেও দ্রুতই ভবনগুলো নষ্ট হয়ে যায়।

যে বিদ্যালয় ভবনগুলোকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে এলজিইডি কি ধরণের পদক্ষেপ নিবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা আমাদের কাছে পাঠালে আমরা সেগুলোকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখবো এখন কি অবস্থায় আছে। পাঠদানের উপযোগী মনে হলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলবো। আর ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে ভবনগুলোকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হবে।

বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এম এম মিজানুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে ভবনের বাহ্যিক দিক বিবেচনা করে বিদ্যালয়গুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে বরগুনার ৬টি উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের তালিকা প্রস্তুত করেছি। তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পরে সেখান থেকে পরবর্তী নিদের্শনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

যেসব ভবনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করা হয়েছে সেখানে কি পাঠদান কার্যক্রম অব্যহত থাকবে, না বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সঠিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে চিহ্নিত করা হবে। যে বিদ্যালয়গুলো পাঠদানের উপযোগী সেখানে পাঠদান কার্যক্রম অব্যহত থাকবে বাকিগুলোতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বরগুনার জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ বলেন, আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষৎ। তাই শিশুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের। আমরা ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলো চিহ্নিত করে শিক্ষার্থীদের বিকল্প পাঠদানের ব্যবস্থা করার জন্য প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিয়েছি।

পিএসএস

 

বরিশাল: আরও পড়ুন

আরও