ভয়াল ১২ নভেম্বরের স্মৃতি আজও কাঁদায় ভোলার মানুষকে

ঢাকা, শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ | ১ পৌষ ১৪২৫

ভয়াল ১২ নভেম্বরের স্মৃতি আজও কাঁদায় ভোলার মানুষকে

অচিন্ত্য মজুমদার ১১:০২ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১২, ২০১৮

ভয়াল ১২ নভেম্বরের স্মৃতি আজও কাঁদায় ভোলার মানুষকে

১৯৭০ এর ভয়াল সেই ১২ নভেম্বরের দুঃসহ স্মৃতি আজও কাঁদায় ভোলার মানুষদের। ৪৮ বছর আগে এই দিনটিতে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল দ্বীপ জেলা ভোলাসহ উপকূলীয় অসংখ্য জনপদ। প্রাণহানি ঘটে ভোলার লক্ষাধিকসহ উপকূলের পাঁচ লাখ মানুষের।

যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় ওই সময় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায় এক সপ্তাহ পর। আর সেই সময়ে বেঁচে যাওয়াদের স্বজন হারানোর স্মৃতি এখনও তাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। সেদিন মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যাওয়া প্রলয়ংনকারী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস উপকূলীয় জনপদগুলোকে মৃত্যু পুরীতে পরিণত করে দেয়।

রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি, মাঠ-ঘাট এমনকি গাছের সাথে ঝুলে থাকতে যায় শত শত মানুষের মৃতদেহ। দুর্যোগের সেদিনে জলোচ্ছ্বাসে গৃহহীন হয় লাখ লাখ মানুষ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় চর কুকুড়ি-মুকুড়ির মানুষের সেখানে প্রায় সকলেই সেদিনের জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ১৯৭০ সালের এই দিনটি ছিল রোজার দিন। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিসহ টানা বাতাস বইছিল সারা দিন। উপকূলের উপর দিয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটার বেগে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। শুধু রেখে যায় ধ্বংসযজ্ঞ। বহু মানুষ তাদের প্রিয়জনের লাশ খুঁজেও পায়নি। জলোচ্ছাসের পর থেকে দেড়মাস পর্যন্ত স্বজন হারানোদের কান্নায় উপকূলের আকাশ পাতাল ভারি ছিল।

গত ৪৮ বছরের যে কয়টি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে তার মধ্যে ৭০’র ঝড়টি সব চাইতে হিংস্র ছিল বলে দাবি করছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

৭০’র এর হ্যারিকেন ঝড়টি উপকূলীয় ভোলা, বরিশাল, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, খুলনাসহ ১৮টি জেলায় আঘাত হানে। তৎকালীন সময় প্রযুক্তি অনেকটা দুর্বল থাকায় উপকূলে অনেক মানুষই ঝড়ের পূর্বভাস পায়নি। জলোচ্ছাসটি ছিল ৮/১০ ফুট উচ্চতায়। কেউ গাছের ডালে, কেউ উচু ছাদে আশ্রয় নিয়ে কোনোভাবে প্রাণে রক্ষা পেলেও ৩/৪ দিন তাদের অভুক্ত কাটারে হয়েছে।

ভোলার লালমোহন উপজেলার মঙ্গল শিকদার গ্রামের বাসিন্দা মেঘনাথ শীল ও নির্মলা মজুমদার সেদিনের ভয়াল স্মৃতির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, সকাল থেকেই আকাশ মেঘে আচ্ছন্ন ছিল। দুপুরের পর থেকে আস্তে অস্তে বাতাস বইতে শুরু করে। বিকেলের দিকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। সন্ধ্যায় বাতাসের বেগ বাড়তে থাকে। এরপর বাতাস ও বৃষ্টির  গতি বেড়ে যায়। রাত ১০টার দিকে জল উঠে কাঠের দোতলার নিচতলা ডুবে যায়। তখন তারা ২য় তলায় আশ্রয় নেন। সেখানেও দোতালার পাটাতনে জল উঠতে শুরু করলে খাটে উঠে উপরের আড়া ধরে কোন রকমে জীবন বাঁচান তারা। জলোচ্ছাসের তোরে ঘরের খুটিগুলো ছাড়া চারপাশের বেড়া ভেসে যায়। পরদিন ভোরে জল নেমে গেলে তারা দেখেন বাড়ির আশপাশে মানুষ আর গরু ছাগলের লাশ। বাগানে লাশ। এমনকি গাছে গাছে ঝুলতে দেখা যায় মানুষ ও পশুর মৃতদেহ। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মৃতদেহ বেশি ছিল বলে জানান তারা।

ঝড়ের বর্ণনা করতে গিয়ে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা মনপুরার মফিজা খাতুন বলেন, সেই ভয়াল সামুদ্রিক জলোচ্ছাস ও ঘূর্ণিঝড়ের সময় অথৈ পানিতে একটি ভাসমান কাঠ ধরে প্রায়মৃত অবস্থায় গভীর সাগরের দিকে তিনি ভেসে যাচ্ছিলেন। কে বা কারা ওইদিন তাকে উদ্ধার করে তা মনে নেই। যখন জ্ঞান ফেরে তখন তিনি নোয়াখালীর একটি হাসপাতালের চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলেন বলে জানান।

লালমোহন উপজেলার আঃ রশিদ মিয়া বলেন, সে দিন বাজারে ১০/১২ ফুট পানি ছিল ঝড়ে পরিবারের সবাইকে হারিয়েছেন তিনি।

চরফ্যাশনের চর কুকরী-মুকরী ইউনিয়নের বাসিন্দা আজম আলী খান বলেন, ওই বন্যায় তিনি ৪ মেয়ে ও ১ ছেলে হারিয়েছেন। ভোরের আলো ফুটতেই দেখা গিয়েছিল বাদুড়ের মতো মানুষকে গাছে ঝুলে থাকতে। কেউ মৃত কেউ অজ্ঞান। স্রোতের টানে বস্ত্র ভেসে যায় সবার। চারিদিকে ছিল শুধু লাশ আর লাশ। এক টুকরো কাপড় পেলে আব্রু ঢাকা চেষ্টা করেছিল জীবিতরা। সেদিন বিনা জানাজায় বহু মৃতদের কবর দেয়া হয় বলেও জানান তিনি।

ভোলার ইতিহাস যতদিন থাকবে ঠিক ততদিনই উপকুলীয় বাসী (১২ নভেম্বর) এই দিনটির কথা কোনদিনই ভুলবে না। পনিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার তথ্য মতে ওই ঝড়ে উপকূলীয় এলাকার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার।

এদিকে, ১২ নভেম্বর দিনটিকে স্মরণ রাখতে ভোলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় আজ শোক পালন ও দোয়া মাহফিলের আয়জন করা হয়েছে।

এআরই