খেলাপি কমাতে যত কথা, বেড়েছে তত

ঢাকা, রবিবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২০ | ৬ মাঘ ১৪২৬

খেলাপি কমাতে যত কথা, বেড়েছে তত

জাফর আহমদ ১২:৩৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৮, ২০১৯

খেলাপি কমাতে যত কথা, বেড়েছে তত

খেলাপি ঋণ কমাতে যত বেশি কথা বলা হচ্ছে ততই খেলাপি ঋণ বেড়ে চলেছে। কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সর্বশেষ তিন মাসেও চার হাজার কোটি টাকা ঋণ বেড়েছে। চলতি বছরের ৩০ জুন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ৩০ সেপ্টেম্বর তিন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। বর্তমানে মোট খেলাপি ঋণ এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা এ যাবৎকালের রেকর্ড। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশই খেলাপি। এর আগে জুন মাস শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা ওই সময়ের বিতরণ করা ঋণের ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। বার বার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণ না কমার জন্য দায়ি সরকারের পক্ষ থেকে খারাপ ম্যাসেস যাওয়াকে দায়ি করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে মন্দ গ্রাহকদের যেখানে শক্ত কথা বলার প্রয়োজন, সেখানে খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না-সহ বিভিন্ন ধরনের কথাতে বার বার ভুল ম্যাসেজ যাচ্ছে। এ কারণে খেলাপি ঋণ কমছে না। সর্বশেষ জুন মাসেও অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল খেলাপি ঋণ কমার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ৩০ জুনেও খেলাপি ঋণ বেড়েছিল। এর তিন মাসের ব্যবধানে ৩০ সেপ্টেম্বর আবার খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এদিকে খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণ খুঁজতে গত জুনে মাঠ পর্যায়ে ব্যাংকের শাখা পরিদর্শন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গঠন করা হয়েছিল উচ্চ পর্যায়ের কমিটি। কারণ খুঁজতে ৬ ব্যাংককে চিঠিও দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ঋণ খেলাপির সংখ্যাও বেড়েছে। ২ শতাংশ ডাউন প্রেমেন্ট দিয়ে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের নির্দেশনা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু সে নির্দেশনা কাজে আসেনি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম খেলা কাগজকে বলেন, ২ শতাংশ ডাউন প্রেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, তা এখনো কার্যকর হয়নি। এর প্রভাব আগামী ডিসেম্বরে পাওয়া যাবে। সে সময় খেলাপি অনেক কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি। তবে ব্যাংকাররা বলেন, সাধারণত বছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিক অর্থাৎ মার্চ ও জুনে খেলাপি ঋণ কিছুটা বাড়ে। এবার বাড়ল তৃতীয় প্রান্তিকেও। এর কারণ ডিসেম্বরে বছর শেষের হিসাব হয় বিধায় ব্যাংকগুলো পুনঃতফসিল বাড়িয়ে দেয়। ঋণ আদায়েও বাড়তি চেষ্টা থাকে। এর বাইরে অন্য কারণও রয়েছে। যেমন- এ বছর ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষিত ঋণ পরিশোধের বিশেষ সুবিধা নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। এ কারণে মোট খেলাপি ঋণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। তিন মাসের ব্যবধানে বেসরকারি ৪০ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা বেড়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে বেসরকারি ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণ ৫৪ হাজার ৫৪৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা, যা এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৭ দশমিক শূন্য ৪৩ শতাংশ। গত জুন শেষে বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা, যা ওই সময়ে তাদের বিতরণ করা ঋণের ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯২২ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণ করা ঋণের ৩১ দশমিক ৫২ শতাংশ। এর আগের প্রান্তিকে এসব ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ ছিল ৫৩ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের বিতরণ করা ঋণের ৩১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। সে হিসেবে গত মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা।

সেপ্টেম্বর শেষে বিদেশি ৯ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯১ কোটি ২৪ লাখ টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ৬ দশমিক ১ শতাংশ। গত জুন শেষে এসব ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ৫৭ কোটি ৬২ টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। আর দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের (কৃষি ও রাকাব) খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৭০০ কোটি ৪১ লাখ টাকা, গত জুন শেষে যা ছিল ৪ হাজার ৬৯৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ব্যাংক দুটির বিতরণ করা ঋণের ১৭ দশমিক ৮১ শতাংশ খেলাপি।

খেলাপি ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি অর্থনীতিক অগ্রগতিকে সুসম ও চলমান রাখে সে রকম এসএমই খাতসহ অন্যান্য ছোট্ট ঋণগুলোকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে সরকার যে সব উন্নয়ন লক্ষ্য স্থির করেছে সেগুলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এসবি/

 

ব্যাংক ও বীমা: আরও পড়ুন

আরও