ব্যাংক ঋণের সুদহার ২ থেকে ১ অংকের কোটায় নামানো হয়েছে

ঢাকা, সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

ব্যাংক ঋণের সুদহার ২ থেকে ১ অংকের কোটায় নামানো হয়েছে

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৫:০৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ০২, ২০১৮

ব্যাংক ঋণের সুদহার ২ থেকে ১ অংকের কোটায় নামানো হয়েছে

বর্তমানে ব্যাংক ঋণের গড় সুদের হার চীনে ৪.৩ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৫.৩ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৬.২৫ শতাংশ, পাকিস্তানে ৮.২ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ৭.০ শতাংশ, নেপালে ৭.০ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৪.৫ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৪.৮ শতাংশ। আর বাংলাদেশে এটা এত দিন দুই অংকের কোটায় থাকলেও গতকাল থেকে তা এক অংকে নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সোমবার ব্যাংক ঋণের সুদের হার সম্পর্কিত বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এফবিসিসিআই সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন) এসব কথা বলেন।

লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, গত ৯ জুন ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের উপর এফবিসিসিআই আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে ব্যাংকের সুদের হার একক অংকে নামিয়ে আনার বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য এফবিসিসিআই থেকে মতামত ব্যক্ত করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ ব্যাংকের সুদের হার একক অংকে নামিয়ে আনে, যা গতকাল ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে।

তিনি বলেন,  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস-এর নেতৃবৃন্দ, অর্থনীতিবিদ, বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সাংবাদিক ভাই ও বোন এবং সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক এবং অনলাইন গণমাধ্যমের সহযোগিতা সুদের হার একক অংকে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।

শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, দেশের যে কোনও প্রয়োজনে জাতীয় স্বার্থে সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকা সবসময়ই অত্যন্ত ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ। তবে যেসব ব্যাংক তাদের সুদের হার এখনও একক অংকে নামিয়ে আনতে পারেনি তাদেরকে অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী একক অংকে নামিয়ে আনার জন্য এফবিসিসিআই আহ্বান জানাচ্ছে।

তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে অভিযাত্রার এ গৌরবময় মুহূর্তে দেশে যখন ব্যাপক ও বহুমাত্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে তখন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের অন্যতম পূর্বশর্ত ব্যাংক ঋণের সুদহার হ্রাস বিনিয়োগকারী তথা সমগ্র ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে উৎসাহিত করবে এবং তাদের আস্থা বৃদ্ধি করবে। দেশে ব্যবসা ও শিল্পবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং আমদানি-রফতানি কার্যক্রমকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার হ্রাস বিশ্ব বাণিজ্যের প্রেক্ষাপটে সময়োচিত পদক্ষেপ। তবে এই সুদের হার একক অংকে অব্যাহত রাখা বা টেকসই করার ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়টিতে বিশেষ নজর রাখবে বলে এফবিসিসিআই তথা ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আশা করছে। তবে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত এবং নারী উদ্যোক্তারা যেন অতি সহজে একক অংক সুদ হারে ঋণ গ্রহণ করতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সুদের হার একক অংকে নেমে আসায় ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় যেমন কমে আসবে তেমনি পার্শ্ববর্তী প্রতিযোগী দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এটি সহায়ক হবে।

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের আর্থসামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মহলে দারুণভাবে প্রসংশিত হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বে বাংলাদেশ আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মর্যাদা লাভ করতে সক্ষম হবে। উন্নয়নশীল দেশ ও মধ্যম আয়ের মর্যাদা পাওয়ার ক্ষেত্রে দেশের বেসরকারি খাত সরকারের পাশাপাশি একসাথে কাজ করে যাচ্ছে।  

তিনি বলেন, বর্তমানে জাতিসংঘের মহাসচিব এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেছেন— বিশ্বব্যাংকে ট্রিলিয়নস মার্কিন ডলার বিনিয়োগের অপেক্ষায় পড়ে আছে। এ অর্থ বিনিয়োগের জন্য বিশ্ব ব্যাংক বিভিন্ন দেশে সুযোগ খুঁজছে। আমরা জানি বাংলাদেশ ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে রয়েছে যা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত। স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে দর কষাকষির মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক থেকে অর্থায়ন গ্রহণের ব্যবস্থা নেয়া হলে তা দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যবহার করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বেসরকারি খাতও এ অর্থ ব্যবহার করার সুযোগ পেলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে এফবিসিসিআই মনে করে।        

তিনি আরো বলেন, ব্যাংকিং খাতে নন-পারফর্মিং লোন বা খেলাপি ঋণের বিষয়টি একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন যাবত এ দুর্বিসহ বোঝা সুদের হার এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা (মার্চ ২০১৮-এর তথ্যমতে)। ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ এবং বিনিয়োগবান্ধব করতে খেলাপি ঋণ কমানোর প্রচেষ্টা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরো জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বড় অঙ্কের (বৃহদাঙ্ক) ঋণগুলো কমিয়ে আনার বিষয়ে অধিকতর জোরালো ও কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত জরুরি।

মহিউদ্দিন বলেন, নন-পারফর্মিং লোন সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে আমরা উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব করছি। টাস্কফোর্স নন-পারফর্মিং লোনজনিত সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে তা সমাধানে সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন প্রণয়ন করবে। এ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জাতীয় স্বার্থে এ সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি ‘স্বাধীন ব্যাংক কমিশন’ গঠনের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াধীন। এফবিসিসিআই তথা ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আশা করে মাননীয় অর্থমন্ত্রী অতি দ্রুত একটি স্বাধীন ব্যাংক কমিশন গঠন করবেন।

এফএ/এএল/