কৌশিকী চক্রবর্তী-সুরের আকাশে নতুন ধ্রুবতারা!

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

কৌশিকী চক্রবর্তী-সুরের আকাশে নতুন ধ্রুবতারা!

চিররঞ্জন সরকার ২:৫৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০১৭

কৌশিকী চক্রবর্তী-সুরের আকাশে নতুন ধ্রুবতারা!

প্রথম দেখেছিলাম টেলিভিশনের একটা লাইভ অনুষ্ঠানে। মানুষ এত সুন্দর হয়, এত সুন্দর করে কথা বলতে পারে, আবার এত সুন্দর গান গাইতে পারে, কৌশিকীকে না দেখলে বুঝতাম না। প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ বলতে যা বোঝায়, কৌশিকীর ক্ষেত্রে তাই ঘটেছিল। এরপর কেবলই কৌশিকীকে খুঁজে ফেরা, ইউটিউব তন্ন তন্ন করে কৌশিকী দর্শন, কৌশিকীতে মেতে থাকা। এ যেন সুরপ্রেমীদের জন্য বিধাতার নিজ হাতে পাঠানো এক অনন্য উপহার, অনন্ত সুধারসের ঝর্ণাধারা!

এখানে কবুল করা ভালো যে, জীবনে অনেক রূপসী দেখেছি; গুণীও কিছু কম দেখিনি। কিন্তু রূপ-গুণের এমন বিরল সমন্বয় চোখে পড়েছে কমই। স্রষ্টা যেন নিজ হাতে এই গানের কোকিলাকে ধরায় পাঠিয়েছেন। কোথাও কোনো কমতি রাখেননি। মানুষ এত মায়াবি, এত জাদুকরি, এত মোহময়ী হতে পারে? হ্যাঁ, কৌশিকী যখন মঞ্চে গান গায়, তখন তাঁর দিকে যেন অনন্তকাল নিষ্পলক তাকিয়ে থাকা যায়! আর তাঁর কণ্ঠ থেকে সুর তো নয়, যেন স্বর্গীয় কোনো দেবীর সুললিত মূর্চ্ছনায় অলৌকিক মায়াজাল সৃষ্টি হয়। সে মায়াজাল ভেদ করে বাস্তবে ফিরে আসাটা যে কোনো সুরপিয়াসীর জন্যই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়!

‘ইয়াদ পিয়া কি আয়া’, ‘সায়ান নিকাশ গি’, ‘লগি লগি’, ‘কাহে মান করো’, ‘শাম বাঁশুরিয়া বাজায়ে’, ‘প্রেম মদিত মন সে কহো’, ‘ইয়াদ পিয়া কি আয়ে’ ‘নাইবা পেলাম দরশন’ ‘আমি গানের পাখি’ কিংবা রাগ ভৈরবীর ভজন, রাগ বাগেশ্রী, মিশ্র চারুকেশী ঠুমরি, খামাজ ঠুমরি, মুলতানি, মীরার ভজন, রাগ নাট-ভৈরব, রাগ পুরিয়া কল্যাণ, রাংগি সারিসহ কৌশিকী চক্রবর্তীর কণ্ঠে গজ়ল, ভজন, খেয়াল, ঠুমরি ধ্রুপদ সংগীতের মোহনীয় সুর ও আশ্চর্য কণ্ঠের মাদকতায় কতনা দিন, কতনা রাত আচ্ছন্ন থেকেছি (এখনও থাকছি)! এই সুর সুধারস পানের যেন কোনো শেষ নেই, যবনিকা নেই।

ধ্রুপদি সংগীতের বিরল প্রতিভা কৌশিকী চক্রবর্তীর জন্ম ১৯৮০ সালের ২৪ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়। প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিবারে জন্ম নেওয়া কৌশিকী বাবা অজয় চক্রবর্তীর দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন।

খুব অল্প বয়স থেকেই তাঁর সঙ্গীত প্রতিভার বিকাশ, প্রকাশ লাভ করেছে। মাত্র দু’বছর বয়েসেই শিশু কৌশিকী সঙ্গীতের তালে তালে নাচতে শেখেন। তার আনুষ্ঠানিক তালিম শুরু হয় সাত বছর বয়সে প্রবাদ প্রতিম পণ্ডিত জ্ঞান প্রকাশ ঘোষের শিষ্যত্ব গ্রহণের মাধ্যমে। সেখানেই ভারতীয় ধ্রুপদি সঙ্গীতে তালিম নেন। অবশ্য ধ্রুপদি সংগীতের হাড়েখড়ি তার আগেই বাবা-মার কাছে হয়েছে।

কৌশিকীর সৌভাগ্য তিনি বড় হয়েছেন এমন একটি পরিবারে, যেখান থেকে তাঁর সেরা হোমওয়ার্ক ও গ্রুমিং হওয়া সম্ভব ছিল এবং তেমনটাই হয়েছে। বাবা অজয় চক্রবর্তীর শিক্ষা তো বটেই, কৌশিকী প্রশিক্ষণের জন্য পেয়েছেন তাঁর মা চন্দনা চক্রবর্তীকে, যাকে ভারতবর্ষের অন্যতম সেরা সংগীত শিক্ষক মনে করা হয়। খুব ছোট থেকেই কৌশিকী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন দিকপাল শিল্পীর সামনে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন এবং সেই সব কঠিন পরীক্ষাসম উপস্থাপনা তাঁর আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দিয়েছে ধীরে-ধীরে। সবচেয়ে বড় কথা, তরুণ বয়সে কৌশিকীর জনপ্রিয়তা ভারতীয় রাগ-সঙ্গীতেরও একটি অন্য দিগন্ত খুলে দিয়েছে। কারণ কাঠিন্য বা দুর্বোধ্যতার কারণে যে প্রজন্মের একটি বড় অংশ সঙ্গীতের এই বিশেষ ধারাটি সম্পর্কে নিস্পৃহ ছিল, তাঁদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে কৌশিকীর বিশুদ্ধ সংগীত। অল্প বয়সেই তিনি পৃথিবীর অধিকাংশ বিখ্যাত অনুষ্ঠান ও সঙ্গীত-উৎসবে পারফর্ম করেছেন। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ তো বটেই, নিজের যোগ্যতাতেই এখন কৌশিকী এই সুনাম অর্জন করেছেন।

১৯৯২ সালের নভেম্বর থেকে তিনি আইসিটি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমিতে যোগ দেন। এরপর এসআরএ স্কলার হিসেবে ২০০৪ সালে ওই একাডেমি থেকে সর্বোচ্চ ‘এ’ নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তার আগে আর কেউ এত ‘এ’ লাভ করেননি। একাডেমির এই সনদ অবশ্য কৌশিকীর শ্রোতাদের কাছে মোটেও বিস্ময়ের কিছু ছিল না। কারণ শ্রোতারা ইতিমধ্যেই জানতো এমন সঙ্গীত প্রতিভা একাডেমিতে আগে আসেনি।

১৬ বছর বয়সে মা চন্দনা চক্রবর্তী এবং বাবা অজয় চক্রবর্তীর হাত ধরে প্রথম একটি বড় কনসার্টে অংশগ্রহণ করেন। কনসার্টটি অনুষ্ঠিত হয় দিল্লীর হাবিতাত সেন্টারে। এই কনসার্টে দর্শক হিসেবে ছিলেন জাকির হোসেন, আল্লা রাখা খাঁ, সুলতান খান, আমজাদ আলী খানসহ ভারতীয় সঙ্গীতের বেশ কিছু শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। সেই সঙ্গীত-সন্ধ্যার সর্বসম্মত অভিমত ছিল : ভারতীয় সঙ্গীতের পরবর্তী উজ্জ্বল জোতিষ্কটির মহা আবির্ভাবের ঘটনাটি ঘটল এই জলসায়। এরপর কৌশিকীকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে গেছেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের পসরা সাজিয়ে। যেখানেই গেছেন সংগীতপিপাসুকে মুগ্ধ করেছেন, অপরূপ কণ্ঠ ও মোহনীয় সুরের কারূকাজ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন নতুন রূপকথা।

কৌশিকীকে ঘিরে উচ্ছ্বাসের আরও একটি বড় কারণ সে আমাদের ঘরের মেয়ে, আদরের মেয়ে। বাঙালি ঘরের ‘রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী’র অভিধা স্বার্থক করেছেন তিনি। তাঁর বাবা অজয় চক্রবর্তী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বিরাট পণ্ডিত ব্যক্তি। অজয় চক্রবর্তীর পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি এই বাংলাদেশই ছিল। বাঙালি হিসেবে অজয় চক্রবর্তী ও কৌশিকীকে নিয়ে একটা আলাদা অনুভূতি ও গর্ব কাজ করে। উল্লেখ্য, বাংলার সুদীর্ঘ সঙ্গীত ইতিহাসে হাতে গোনা কয়েকটি নাম বাদ দিলে অজয় চক্রবর্তী উঠে এসেছেন একজন পূর্ণমাত্রিক শিল্পী হিসেবে। প্রশিক্ষণ, সাংগীতিক গভীরতা, নিজস্বতা ও শৃঙ্খলা সব দিক থেকেই সমগ্র ভারতবর্ষে তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একজন আদর্শ বাঙালি প্রতিভূ। তাঁর সাফল্যকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন কন্যা ও শিষ্য কৌশিকী চক্রবর্তী। একজন প্রথিতযশা শিল্পীর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে অনেকখানি দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা ও সাহস প্রয়োজন। কৌশিকীর সেটা আছে বলেই ভারতীয় মার্গ সংগীতের কঠিন ধারায় এই প্রজন্মের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম, তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেও সর্বভারতীয় নিরীখে কণ্ঠসংগীতে নিজের স্থান দখল করে নিতে পেরেছেন তিনি।

কৌশিকী চক্রবর্তী, শাস্ত্রীয় সংগীতে তাঁর কী অসাধারণ দখল, শ্রোতার আসরে বসে না শুনলে বোঝা বিষম দায়। তিনি ছোটবেলা থেকেই সুন্দর তালিমপ্রাপ্ত এবং এই প্রশিক্ষণের ছাপ তাঁর কণ্ঠ ও গায়কিতে সুস্পষ্ট। কৌশিকী সম্পর্কে বলা হয়, সে পাতিয়ালা ঘরানার। ‘ঘরানা’ বলতে কি বোঝায়-তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। ঘর অর্থ পরিবার, বংশ প্রভৃতি। আর ‘ঘরানা’ অর্থে রীতি, ঢঙ, ফ্যাশন প্রভৃতি বোঝায়। বাদ্য, নৃত্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হলেও ‘ঘরানা’ শব্দটি খেয়াল রীতির সংগীতের জন্যই অধিক প্রযোজ্য। বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গীত পরিবারে যে সমস্ত অসাধারণ প্রতিভাবান ও সৃজনশীল সঙ্গীত শিল্পী জন্মগ্রহণ করেছেন তাদের গায়নশৈলী যখন বংশধর অথবা শিষ্য পরম্পরায় অনুসৃত হয়, তাখন তা ‘ঘরানা’ পদবাচ্য হয়ে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে যে, তেমন অনুসৃতি অন্তত তিন পুরুষ পর্যন্ত প্রচলিত থাকা চাই। তবেই তা ঘরানার মর্যাদা লাভ করবে।

খেয়াল গানের প্রচার ও প্রসার হয় ঘরানার মাধ্যমে। সৃজনশীল তথা শক্তিশালী শিল্পী নানাভাবে বিভিন্ন ঘরানার পুষ্টি সাধন করেছেন। আদিতে খেয়াল ছিল ধ্রুপদ ভাবাপন্ন। ক্রমে তান, বোলতান, আলাপ, সারগাম তান প্রভৃতিসহ বহু বিচিত্র অলঙ্কার সমন্বিত হয়ে সে একটি বিশিষ্ট আসন লাভ করেছে। এর গায়নরীতি অত্যন্ত সাবলীল। কখনো গভীর ও গম্ভীর আবার কখনো চটুলতাপূর্ণ। তালিম ও প্রতিভা অনুসারে রাগরূপ প্রকাশকালে তাৎক্ষণিক বিচিত্র ভাব প্রকাশে স্বরসমূহের সংগে স্পর্শস্বর, তান-অলঙ্কারাদি প্রয়োগ করে বিচিত্র রসসৃষ্টি শিল্পীর গুণপনা প্রকাশ করে। এই গায়নশৈলী আয়ত্ত করা যথেষ্ট সাধনা সাপেক্ষ।

ঘরানা বিশেষের অনুবর্তীরা মূল বংশোদ্ভব নাও হতে পারেন, কিন্তু তার পরিচিতি মূল কলাকারের নামেই প্রচলিত থাকে। যেমন- প্রাচীনতম গোয়ালিয়র ঘরানা বর্তমান শিষ্য পরম্পরায় প্রচলিত। কারণ- মূল বংশের ধারা লুপ্তপ্রায়। অথচ আগ্রা ঘরানার ক্ষেত্রে তা বিপরীত। কেননা এই বংশধারা ক্রমবিকশিত হয়ে চলেছে।

পাঞ্জাব ঘরানাকেই পাতিয়ালা ঘরানা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মূলত তন্ত্রবাদক ঘরানা হলেও এই ঘরানায় অনেক দিকপাল গায়ক জন্মগ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে আলী বক্স খাঁ, ফতেহ আলী খাঁ, কালে খাঁ, বড়ে গোলাম আলী খাঁ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তাঁদের গায়নশৈলীতে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা বিদ্যমান। স্বাস্থ্যকর জলবায়ুর জন্য পাঞ্জাববাসীরা সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারী, যা তাদের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর এবং উচ্ছ্বল গায়নশৈলীতে প্রতিফলিত হয়। কণ্ঠস্বর সুবিস্তৃত স্বরস্থানে বিচরণক্ষম হওয়ায় তারা অপেক্ষাকৃত উচ্চস্থানে তান, সরগম প্রভৃতি যথেচ্ছা প্রয়োগ করে থাকেন। স্বরমাধুর্য এবং লয়কারীর প্রতি সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রাধান্য দেওয়া হয়। বন্দিশগুলি ঠুমরি অঙ্গের হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে অন্তরা গাওয়াই হয় না। ঠুমরি গানে তাদের দক্ষতা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।

পাতিয়ালা ঘরানার ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খান সাহেবের গায়নশৈলী মূলত প্রাচীনতম ঘরানা তথা গোয়ালিয়র গায়কীর আরও পরিশীলিত ও শ্রূতিমধুর রূপ। বড়ে গুলাম আলী খান ছিলেন সঙ্গীতের মানবিক প্রতিমূর্তি। জেগে থাকা পুরো সময়টাই উনি রেওয়াজ করতেন এবং প্রকৃতির সব কিছুর মধ্যেই সঙ্গীত খুঁজে পেতেন শিশুর মত সরল এই মানুষটি। প্রকৃতির সঙ্গে এত নিবিড় যোগ আর কোনো সঙ্গীত শিল্পীর ছিল বলে মনে হয় না। ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খানকে কণ্ঠস্বর বা ভয়েস কালচারের শেষ কথা বলে ধরা হয় এবং এমন বিজ্ঞানসম্মত কণ্ঠপ্রক্ষেপণ তাঁর আগে ও পরে শোনা গেছে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে।

কৌশিকী চক্রবর্তী পাতিয়ালা ঘরানার গায়কি স্টাইল এবং পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর কন্যা হিসেবে পিতার কাছ থেকে অর্জন করেছেন নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। দেশে বিদেশে প্রচুর সংখ্যক মিউজিক্যাল প্ল্যাটফর্মে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে ঠুমরি, খেয়াল এর মত নিখাদ ‘হিন্দুস্তানি মিউজিকের’ সম্ভারে নিজের কৃতিত্ব প্রদর্শন করে চলেছেন। কৌশিকী হৃদ মাঝারে, গয়নার বাক্স, শুন্য অংক, তিন কন্যা, পাঁচ অধ্যায়, চ্যাপলিনসহ বহু বাংলা সিনেমায় প্লে-ব্যাকও করেছেন।

ভারতীয় মার্গ সংগীতের পাতিয়ালা ঘরানায় এই প্রজন্মের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম তিনি। নিজেকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন বৃহত্তর সাংগীতিক পরিসরে। নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলতে পেরেছেন কৌশিকী চক্রবর্তী। ভারতীয় মার্গ সংগীতের পাশে এত দিন কৌশিকীর অনায়াস যাতায়াত দেখা গিয়েছে হিন্দি, বাংলা এমনকী তামিল ছবির গানে। বিভিন্ন প্রদেশের ভাষা ছাড়াও বলিউডের প্রথমসারির সুরকার এ আর রহমান, শান্তনু মৈত্রের সুরে গান করেছেন। কোক স্টুডিওতে ফিউশন মিউজিকের পাশে রবীন্দ্রসঙ্গীতও গেয়েছেন।

সর্বশেষ তিনি গড়ে তুলেছেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ব্যান্ড! এই ব্যান্ডের মাধ্যমে বিশুদ্ধ মার্গ সংগীতের যে ধারার শিল্পী তিনি, সেই শৈলী অক্ষুন্ন রেখে তাকে অন্য মোড়কে প্রস্তুতের দুঃসাহস দেখিয়েছেন। বৈদিক মন্ত্র থেকে ধ্রুপদ, তার পর খেয়াল পরে ঠুমরি দাদরা যেমন যুগের প্রয়োজনে এসেছে, তেমনই এখন নতুন ভাবে নিজেকে উপস্থাপনেরও দরকার হচ্ছে। এই পজিটিভ চেঞ্জকে কাজে লাগাতে চাইছেন কৌশিকী। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত মূলত পুরুষ শাসিত হলেও কৌশিকীর ব্যান্ড 'সখী'-র সব সদস্যই মেয়ে। সখী ব্যান্ডে রয়েছে রাগসঙ্গীত এবং রাগাশ্রয়ী গান। ঠুমরি, দাদরা, খেয়ালের কোনও অংশ, পাখওয়াজ-তবলা যুগলবন্দি, বেহালা-বাঁশি-র দ্বৈরথ এবং তার সঙ্গে নাচ যুক্ত করে ইতিমধ্যেই এই ব্যান্ড স্বকীয়তা অর্জন করেছে। ভারতবর্ষে এটাই প্রথম উচ্চাঙ্গ সংগীতের মেয়েদের ব্যান্ড। সঙ্গীতের তিন ধারা অর্থাৎ নৃত্য, গীত ও বাদ্য সখীতে মিশেছে।

কৌশিকী চক্রবর্তী কেবল বড় গাইয়ে নন, ২০০২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন বিষয়ে প্রথম শ্রেনিতে স্নাতক হয়েছেন। কৌশিকীর উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশনা, গায়কীর ধরন, স্বচ্ছ ধারণা তার বয়সের চেয়ে বেশি পরিপক্ব এবং স্বতঃস্ফূর্ত। অসাধারণ সঙ্গীত পরিবেশন করে অনেক পুরস্কার জিতেছেন কৌশিকী। নিজের প্রথম অ্যালবাম পিওর-এর মাধ্যমে সেই ২০০৬ সালেই পেয়েছেন বিবিসি অ্যাওয়ার্ড। এ ছাড়া তিনি জাদুভট্ট পুরস্কার, ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান যুব পুরষ্কার (সঙ্গীত নাটক একাডেমী পুরস্কার)– ২০১২, জিআইএমএ–২০১২, আদিত্য বিড়লা কালাকিরোণ পুরস্কার– ২০১৩, মির্চি মিউজিক অ্যাওয়ার্ড-২০১২ "শ্রেষ্ঠ নারী গায়ক" এবং "অ্যালবাম অফ দ্য ইয়ার"- উভয় অ্যালবাম যাত্রা-র জন্য পুরস্কার পেয়েছেন।

কৌশিকী এক আশ্চর্য প্রতিভা। তার গায়কিতে এক অসাধারণ ঔন্দ্রজালিক আবহ সৃষ্টি হয়। তার সঙ্গীত প্রতিভা উপলব্ধি করা যায়, পরিমাপ করা যায় না, সে শক্তি কখনো অলৌকিক বলে মনে হয়। শ্রোতাদের সে মন্ত্রমুগ্ধ করতে পারে। তাদের অন্তরে সে অবিশ্বাস্য প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তাঁর গায়নশৈলীতে যে তন্ময়তা আছে, গাইবার ঢঙে যে স্বাতন্ত্র আছে তা সত্যিই তুলনাহীন।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার গায়কি সম্পর্কে বলেছেন, ‘‘একটা গান গাইতে গেলে মাইন্ড সেটটা পালটে ফেলতে হয়। গানটাকে যে গাইছে তার গান হয়ে উঠতে হয়। মানে গানটা যতক্ষণ অন্যের গান, ততোক্ষণ আমার সঙ্গে গানটার যোগাযোগ তৈরি হয় না। সেটা তৈরি করতে গেলে আই হ্যাভ টু বিলং টু দ্য সং, অথবা দ্য সং হ্যাজ টু বিলং টু মি। এভাবেই তিনি গানের ভেতরে, সুরের ভেতরে প্রবেশ করেন। সেই সুর তৈরি এক এক আশ্চর্য মায়াজাল।

তার প্রজন্মের মধ্যে পতিয়ালা ঘরানার কোনো নারী শিল্পী ছিলেন না। তিনি সেই শুন্যতা পূরণ করেছেন। কৌশিকী একই সঙ্গে বাবার যন্ত্রাণুষঙ্গের ঐতিহ্যের সঙ্গে পাতিয়ালা গায়ন ভঙ্গির সমন্বয় করেছেন। তিনি নিজস্ব গায়কী এবং মেজাজ বজায় রেখে পাতিয়ালা ঘরানার নীতিমালা মেনে চলেন। তার নারীবাদী সংবেদনশীলতা শক্তি এবং রিদমের অসাধারণ ভারসাম্য তৈরি করে। তার গায়কী এই ভারসাম্যকে পর্যাপ্তভাবে প্রকাশ করে, কারণ এটি খেয়াল ও আধা-শাস্ত্রীয় শৈলীর ইন্দ্রজালকেও অতিক্রম করে।

কৌশিকী সংগীতপিপাসুদের সামনে কিছুটা দেরি করে এসেছেন। কিন্তু তিনি যেন তৈরি হবার জন্যই বাড়তি সময় নিয়েছেন। কারণ তিনি হারিয়ে যাবার জন্য আসেননি। এসেছেন জয় করতে, সঙ্গীতসুধায় ভক্তদের মাতোয়ারা করতে। ভারতবর্ষের সংগীত জগতে এই মুহূর্তে একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞীর আসন কিন্তু শূন্য। কৌশিকী তাঁর পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা দিয়ে সেই স্থান দখল করে নিতে পারেন অনায়াসেই। সেই যোগ্যতা তাঁর রয়েছে।

একজন বাঙালি হিসেবে, একজন ভক্ত-অনুরাগী হিসেবে কৌশিকীর কাছে এই প্রত্যাশাটুকু কী বাড়াবাড়ি হিসেবে বিবেচিত হবে?

 

তথ্যসহায়িকা 

  1. আনন্দবাজার, ১৭ এপ্রিল ২০১৭,
  2. Kaushiki Chakraborty::Official Website: kaushikichakraborty.com
  3. The Times of India, January 19, 2015
  4. http://indianexpress.com/article/cities/delhi/like-father-like-daughter
  5. http://archive.tehelka.com/story_main46.asp?filename=hub250910The_Gril.asp
 

প্রবন্ধ: আরও পড়ুন

আরও