তপননামার খসড়া

ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

তপননামার খসড়া

আবুল আহসান চৌধুরী ২:২৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০১৭

তপননামার খসড়া

নব্বই দশকের মাঝামাঝি বা একটু পরে একদিন আমি বাংলা একাডেমি গ্রন্থ-বিক্রয় কেন্দ্রে ঢুকছি। ঠিক সেই সময়ে একজন দ্রুত বেরিয়ে এসে আমাকে দেখে সালাম জানিয়ে পরিচয় দিল তার নাম তপন বাগচী। তারপর একটু বিনীত কণ্ঠে জানালো যে সে আমার বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘মীর মশাররফ হোসেন : সাহিত্যকর্ম ও সমাজচিন্তা’ বইটির আলোচনা করেছে ‘ভোরের কাগজ’ পত্রিকায়। আমার অন্য আরো কী একটা বইয়ের আলোচনা শিগগিরই করবে বলে জানালো। আমি মৃদু হেসে বললাম, ‘বেশ ভালোই তো, ঠিক আছে দেখা হবে’। এই বলে আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম। আর সেই তরুণ যুবক ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল একাডেমি আঙিনা থেকে হয়তো কোন সাহিত্যসভায় বা জমজমাট কোন আড্ডায়।

 

 

এরপর অনেকদিন কেটে গেছে ওই টগবগে প্রাণবন্ত যুবকটির সঙ্গে আর দেখা হয়নি। এক-দুই বছর পর আবার দেখা হয় ওই বাংলা একাডেমি চত্বরেই। হয়তো একুশের বইমেলায়, নয়তো একাডেমির বার্ষিক সাধারণ সভায়। এইভাবে দু-চারবার দেখা হতে হতে কখন যেন যুবকটির স্মৃতি মনে গেঁথে যায়। এর কিছু পরে একদিন সে ফোন করে জানালো আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে বলি।

তখন আমার অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজে বেশ ব্যস্ত সময় কাটছে। একই সঙ্গে বিভাগের সভাপতি ও অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তপন বাগচী এসে বলল যে, সে আমার  তত্ত্বাবধানে পিএইচডি করতে চায়।

আমি তার লেখাপড়ার খোঁজখবর নিয়ে বলি, ‘তুমি তো গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা নিয়ে পড়েছো, এ বিষয়ে আমার তো তেমন জানাশোনা নেই। তখন সে জানায় যে সে ফোকলোর বিষয়ে আগ্রহী এবং গবেষণা করতে চায় বাংলাদেশের যাত্রা নিয়ে। বুদ্ধিমান তপন আমার গোপন জায়গায় টোকা দেয়। আমি রাজি হই।

রাজি হই আরো একটি কারণে যে সে সুপারিশ নিয়ে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আমার শিক্ষক ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের। তাই তপনকে ফেরানোর উপায় থাকে না। গভীর নিষ্ঠা ও শ্রমে সে তার অভিসন্দর্ভ প্রস্তুত করেছে। নির্দেশনামাফিক তথ্য সংগ্রহে ব্যাপক ক্ষেত্রানুসন্ধান করেছে। ফলে যাত্রা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনেক দুষ্প্রাপ্য বইপত্র ও তথ্যদলিল সে সংগ্রহ করতে পারে বলে মনে হলো।

আগে থেকেই তপনের গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস ছিল। গবেষণার কাজ করতে গিয়ে তার এই পল্লিভ্রমণের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। কখনো মানিকগঞ্জ, কখনো খুলনা, কখনো গোপালগঞ্জ বা উত্তরের বগুড়া এসব জায়গা ঘুরে ফেরে যাত্রার তত্ত্ব-তালাশের উদ্দেশে। যথাসময়ে সে পিএইচডি উপাধি লাভ করে। তার পরীক্ষকেরা এই গবেষণাকাজের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। আমিও আনন্দিত হই।

এ কথা বলতে আজ আর আমার কোনো দ্বিধা নেই আমার কাছে যারা প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার কাজ করেছে তাদের মধ্যে তপনের স্থান অনেক উঁচুতে। তার অভিসন্দর্ভ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশ পায় এবং এই বই দুই বাংলাতেই সমাদর লাভ করে। যাত্রা বিষয়ে এটি আকর গ্রন্থের মর্যাদা পায়। বিরল সৌজন্য ও সম্মান দেখিয়ে সে বইটি আমাকেই উৎসর্গ করে।

তপন বাগচী বহুমাত্রিক নানা পথে সে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে। সে লেখক, সাংবাদিক, সংগঠক, সংস্কৃতি কর্মী এবং প্রগতিশীল যে কোনো আন্দোলনে সামিল এক সক্রিয় যোদ্ধা। তপন মূলত কবি ও প্রাবন্ধিক-গবেষক হলেও সে এর পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, নাটক, জীবনী, ইতিহাস, ছড়া, শিশুতোষ সাহিত্য, গীত রচনা সাহিত্যের এসব পথেও তার নিত্য চলাফেরা।

তার ভাষা, বানান ও সেইসঙ্গে ছন্দজ্ঞান উল্লেখ করার মতো। বিস্ময়কর স্মরণশক্তির কারণে সে পঠিত বা শ্রুত, তথ্য বা ঘটনা তাঁর মস্তিষ্ককোষে বহুকাল সঞ্জীবিত ও সংরক্ষণ করতে পারে। তপন বাগচী তাই তথ্যজিজ্ঞাসুদের খুবই নির্ভরযোগ্য অবলম্বন।

তার কাজের মূল্যায়ন করার সময় এখন নয়। তবে তাঁর সাহিত্য-চর্চার যে দুটি দিক আমাকে আকৃষ্ট ও মুগ্ধ করেছে তা উল্লেখ করা প্রয়োজন : সে হলো ফোকলোর ও ইতিহাস। সৃজনশীল লিখিয়ে হিসেবে সে পরিচিত ও খ্যাতিমান সন্দেহ নেই, কিন্তু আমার বিবেচনায় তার সিদ্ধি ও স্থায়ী অর্জন মননসাহিত্যেই বিশেষ করে অনুসন্ধিৎসু তথ্যসংগ্রাহক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্যবিশ্লেষক হিসেবে। যার দুই প্রান্তে আছে ফোকলোর ও ইতিহাস, যা কখনো কখনো পরস্পরকে কাছে টেনেছে।

তপনের পঞ্চাশ পূর্ণ হলো। লেখক হিসেবে এখন তার আরো স্থিতধী ও পরিণত হওয়ার কাল। আশা করি শিল্পীর সততা, নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতা তাঁকে সাহিত্যচর্চায় আরো বড়ো আসন দেবে। সেই প্রত্যাশায় বলি, খ্যাতির মোহ যেন তাঁকে সত্য-সুন্দর-কল্যাণ-আনন্দের পথ থেকে কখনো সরিয়ে না আনে।

জয় হোক পঞ্চাশের তরুণ তপন বাগচীর।

আবুল আহসান চৌধুরী: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

 

প্রবন্ধ: আরও পড়ুন

আরও