কবিতার বিবর্তন এবং বিজ্ঞান যুগের কাব্যচিন্তা

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫

কবিতার বিবর্তন এবং বিজ্ঞান যুগের কাব্যচিন্তা

হাসনাইন সাজ্জাদী ১২:৩০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩০, ২০১৮

কবিতার বিবর্তন এবং বিজ্ঞান যুগের কাব্যচিন্তা

বাংলা কবিতার সূতিগার যে দেবালয় একথায় কোন বিতর্ক নেই। যেমন বিশ্বকাব্যের সূতিকার হিসেবে দেবালয়ের অস্তিত্ব অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। তাই এক কথায় বলা যায়, বিশ্বকাব্যের মত বাংলা কাব্য সাহিত্যের প্রাচীণ ইতিহাস মানে ধর্মের ইতিহাস। দেবদেবী নির্ভর ইলিয়াড ও অডিসি লিখে মহাকবি হোমার গ্রীক সাহিত্যের জন্ম দিয়েছিলেন। তেমনি বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন পদ্ধতি নিয়ে রচিত হয়েছে বাংলা প্রাচীণ কাব্য চর্যাপদ। তখন অবশ্য সাহিত্য মানেই ছিল কাব্যভাষা। মধ্যযুগ পর্যন্ত এ কাব্যধারা চলে আসছিল।

বাংলাকাব্যের পর্যাবৃত্তি নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে আর যাই হোক দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচীণ বাংলা সাহিত্যের কাল এটাতে সবাই একমত পোষণ করেছেন। দ্বাদশ থেকে মধ্য ত্রয়োদশ অন্ধকারযুগ, মধ্য ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ পর্যন্ত মধ্য যুগ, অস্টাদশ থেকে ঊনবিংশ পর্যন্ত নবকাব্য ধারার যুগ এবং উনবিংশ থেকে বিশ শতক পর্যন্ত আধুনিক যুগ। তারপর এসেছে বিজ্ঞান কাব্যযুগ।

৬ দফার আলোকে বিজ্ঞান কাব্যতত্ত্ব আমি উপস্থাপন করেছি।

১। সাবলীল ছন্দে রিপোর্টিং স্টাইলে কবিতা রচনা।

২। মানুষের জন্য মানুষের লেখা কবিতা। লিঙ্গ বৈষম্য বিরোধী কবিতা রচনা।

৩। ধর্ম নিরপেক্ষ কবিতা রচনা।

৪। ছোট ক্যানভাসে বড় উপমার কবিতা রচনা।

৫। কবিতার উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্পে বিজ্ঞানের উপমা।

৬। বিজ্ঞান যুগকে কবিতায় ধারন করা।

একাধিক কবির লেখা চর্যাপদ ১৯০৭ সালে ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ দরবার থেকে উদ্ধার করেন। সহজিয়া বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা সিদ্ধাচার্যগণ এর রচয়িতা। বিভিন্ন তান্ত্রিক আচার নিষ্ঠা সাজনভজন তত্ত্বের কথাকে রূপকের মাধ্যমে সন্ধ্যা (দেবনাগরী) ভাষায় উচস্থাপন করা হয়েছে চর্যাপদে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, খ্রিষ্টিয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত চর্যাপদ রচিত হয়েছে। তার মতে, চর্যাপদের অন্যতম পদকর্তা লুই পাদ আভির্ভুত হন খ্রিষ্টিয় সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে।

দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়টা ছিল অন্ধকার যুগ। এসময় তুর্কি মুসলমানদের দ্বারা বাংলা আক্রান্ত হয়।  তখন অবশ্য বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে উচুনিচু সংঘাত প্রবল আকার ধারণ করে। ফলে ঐক্য, সহমর্মিতা এবং সৌর্যবীর্য বাঙালি প্রায় হারিয়ে ফেলেছিল। এ সুযোগে যখন তুর্কি মুসলমানদের হাতে বাংলার পতন ঘটে তখন নিচু জাতের বাঙালি সম্প্রদায় মুসলমানদের হাতে রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্মান লাভ করার সুযোগ গ্রহণ করে দলে দলে মুসলমান হতে থাকে। তখনই এর বিপরীতে উঁচু জাতের দাবিদার বাঙালিরা একটি হতোদ্যম জাতিতে পরিণত হতে থাকে। ফলে প্রায় একশ’ বছর বাংলাকাব্য রচিত হয়নি। তেরশতকের মাঝামাঝি এসে সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য নানা দেবদেবির জন্ম দিয়ে তাদের নিয়ে কাব্য রচনা শুরু হয়। ততদিনে মধ্যযুগ দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেছে। দেবদেবী নিয়ে রচিত সে সময়ের কাব্যই মঙ্গলকাব্য। এই মঙ্গলকাব্যকে যদি মধ্যযুগের কাব্যের তালিকাভূক্তি না করা হয় তবে মধ্য চতুর্দশ শতাব্দীতে বড়– চণ্ডীদাসের হাতে রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে প্রথম মধ্য যুগের কাব্য সাহিত্য ধরতে হয়। অপরদিকে মঙ্গলকাব্যকে ধরতে হয় অন্ধকার যুগের কাব্যসাহিত্য হিসেবে। কারণ বাংলা সাহিত্যের কোন কোন গবেষক প্রাচীণ যুগের পরেই মধ্য যুগের শুরু বলে কাল ধরে আলোচনা করেছেন। আবার যারা মধ্য-চতুর্দশ শতাব্দীকে মধ্যযুগের কাল ধরে এগিয়েছেন তারাও মধ্য-দ্বাদশ শতাব্দীর পর অন্ধকার যুগের অবতারণা করেছেন। ফলে মধ্য-দ্বাদশ থেকে মধ্য ত্রয়োদশ পর্যন্ত এ সময়টুকুকে অন্ধকার যুগ বলেই অভিহিত করা হয়েছে। এখানে মঙ্গকাব্যের যুগ বলে নতুন কোন যুগ তারা সন্নিবেশ করেননি। তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি তথা মঙ্গলকাব্যের যুগ থেকে মধ্যযুগ শুরু করা যায়। মধ্যখানে একশ বছর অন্ধকার যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। আর না হলে মধ্য-ত্রয়োদশ থেকে মধ্যযুগ ধরে এগোলেও ক্ষতি নেই। আমার মতে, মধ্য ত্রয়োদশেই মধ্যযুগের সূচনা ঘটে। কারণ কবি কংকন, মুকুন্দদাস চক্রবর্তী ও ভারতচন্দ্র মঙ্গলকাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি এবং ভারতচন্দ্রের কাব্যকাল অষ্টাদশ শতক (১৭১২-১৭৬০)। তিনি যুগ সন্ধিক্ষণেরও কবি। এযুগ মধ্যযুগ থেকে নব কাব্য ধারার যুগ। অনেকের মতে, কবি ঈশ্বর গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯)ই যুগ সন্ধিক্ষণের কবি। ১৮০১ থেকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে নব কাব্য ধারার যুগের শুরু। এ সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা চালু হয়। এসময় পাশ্চাত্য ধারায় বাংলা কাব্যে নবযুগের সুচনা করেন কবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত। তার অনুকরণে কবি হেমচন্দ্র কবি নবীন চন্দ্র ও কবি বিহারী লাল পরবর্তীকালে বাংলা কাব্যে অগ্রগতি সাধন করেন। কবি বিহারী লালের অনুকরণে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা কাব্যে গীতিকাব্য ধারায় সাফল্য অর্জন ও গীতাঞ্জলিতে নোবেল  পুরস্কার লাভ করেন।

চর্যাপদের পর বাংলা সাহিত্যের দ্বিতীয় প্রধান কাব্যগ্রন্থ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এ গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণকে অবতার হিসেবে স্বীকার করে অত্যাচারী রাজা কংশকে বধের জন্য পৃথিবীতে তার আগমন ধরা হয়। কারো কারো মতে, স্বর্গে কোন পাপের প্রায়শ্চিত্য হিসেবে হয়তো মর্তে তার আগমন ঘটতে পারে। একই সাথে কংশকে বধ করাও দেবতাদের উদ্দেশ্য থাকতে পারে। অতঃপর বাংলা কাব্যে বৈষ্ণন পদাবলীর প্রবর্তন করেন সিলেটের বিশ্বম্ভর ওরফে নিমাই সন্নাসী ওরফে শ্রীচৈতন্যদেব। তার পিতা ছিলেন সিলেটের খ্যাতিমান পণ্ডিত জগন্নাথ মিশ্র। তিনি নবদ্বীপে পাণ্ডিত্য করাকালিন সময়ে ১৪৮৬ সালে নিমাই-এর জন্ম। রাধা কৃষ্ণের প্রেম, মিলন ও বিরহ চিন্তায় তিনি আত্মনিয়োগ করেন এবং নাম সংকীর্তন গোপীনাম জপ থেকে ঈশ্বর প্রেমের অমিয় ধারায় স্নাত হতে হতে বাণী দিতে থাকেন। তার বাণীকে কেন্দ্র করেই বৈষ্ণব পদাবলী রচিত হতে থাকে। যদিও তিনি এক লাইনও কবিতা লেখেননি। কিন্তু তার থেকে বাংলাকাব্যে ধর্ম ও শ্রীকৃষ্ণের গুণকীর্তনের যে নতুন ধারা তৈরি হয় তা আমাদেরকে মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কাব্যরস আস্বাদন করতে উদ্বুদ্ধ ও সমৃদ্ধ করে। ত্রিশের দশকে রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কালকে ধারণ ও ফ্রান্সের কবি চার্লস বোদলেয়রের অনুকরণে বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাস, অমীয় চক্রবর্তী, সুধীন দত্ত ও বিষ্ণু দে’রা  আধুনিকতাবাদী কবিতা আন্দোলন করে সাফল্য অর্জন করেন। তারা এ আন্দোলনের সাফল্য পঞ্চাশ দশক পর্যন্ত ধরে রাখলেও পরবর্তীকালে কবি সুকান্ত এসে আকাশের চাঁদকে ঝলসানো রুটির সাথে তুলনা করে উত্তরাধুনিক চিন্তার জন্ম দেন। যাকে আমরা বিজ্ঞান মনষ্ক কবিতার যুগে বিবর্তন দেখতে চাই।

যদিও একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা রবীন্দ্র প্রতিভা ও তাঁর সৃষ্টি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের আধুনিক কবিতার আবহ থেকে মুক্ত হতে পারছি না। যদিও দু’টি কালই এখন অতীত এবং একবিংশ শতাব্দীতে এসে উত্তর আধুনিক সময়ের বিজ্ঞান কবিতা আন্দোলন ছাড়া আমাদের সামনে বিকল্প কোন পথ নেই। কবিতাতো সময়কে ধারণ করে সংবাদ প্রদানের নাম।

সময়ের ভাবকে ধারণ করে যেহেতু অগ্রসরমান ভাষায় কবিতাকে লিপিবদ্ধ করতে হয় এবং কবিকে আগাম দেখতে হয়, আগাম সংবাদ প্রদান করতে হয়, সত্য বলতে হয়, তবেই তা কবিতা হয়। তাহলে বিজ্ঞান যুগে বিজ্ঞান মনষ্ক কবিতার বিকল্প আমাদের সামনে থাকে কি?

বাংলা কাব্যের পর্যাবৃত্তি পরিবর্তনের সাথে সাথে ভাব ও ভাষায়ও পরিবর্তন এসেছে। চর্যাপদের সাথে নাথ সাহিত্যে ভাব ও ভাষার পার্থক্য, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের সাথে বৈষ্ণব পদাবলীর ভাব ও ভাষার পার্থক্য, রবীন্দ্রকাব্য (রাবিন্দ্রিক কাব্য)’র সাথে আধুনিক কাব্যের ভাব ও ভাষার পার্থক্য ছিল লক্ষ্যণীয়। রবীন্দ্র গীতিকাব্য ও অধ্যাত্মবাদী ধারা থেকে পাপ, তুচ্ছ বিষয় ও অন্ধকারময় আধুনিক কাব্য ধারার পার্থক্য লক্ষ্যণীয়। এখন রাবিন্দ্রিক কাব্য কিংবা আধুনিক কাব্যের ভাব ও ভাষা থেকে একবিংশ শতকের বিজ্ঞান কাব্য বা বিজ্ঞানমনস্ক কাব্যের ভাব ও ভাষার পার্থক্য থাকবেই। উত্তরাধুনিক কালকে আমরা বিজ্ঞান কাব্যযুগ চিহ্নিত করে আন্ত:সম্প্রিতি রক্ষা, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধ ও তাদের অধিকার রক্ষা, পরিবেশ রক্ষা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ রোধ, খাদ্যের রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধ, পরমাণুর যথেচ্ছ ব্যবহার রোধ, ধনী গরীবের ব্যবধান কমিয়ে আনা, মঙ্গলগ্রহ সহ অন্যান্য গ্রহে প্রজন্মের বসবাসকে জনপ্রিয় করা, বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কারকে আভিধানিক, পারিভাষিক ও রূপকের মাধ্যমে ব্যবহার, ধর্মেকর্মে যৌন অধিকার সংরক্ষণ, ভৌতিক বিশ্বাস পরিহার, দেশে দেশে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সমর্থন, কার্বনডাই অক্সাইড নি:স্বরণ রোধ, সূর্যরশ্মি ও বায়োগ গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধির চেষ্টা, কবিতার উপমা উপেক্ষা ও চিত্র কল্পকে বিজ্ঞান মনষ্ক করা এবং বিজ্ঞানের সুফল কুফল নিয়ে জনসচেতনা তৈরীর বিষয়বস্তু বিজ্ঞান যুগের বিজ্ঞান কবিতার উপপাদ্য বিষয় বলে বিবেচিত হবে। তবে কবিতায় আমরা যোগ সমস্যা সমাধান এবং সত্য ভাষণ লাভ করব। কবিতার নান্দনিকতা ও ভেতর এবং বাহিরের সৌন্দর্য্য খর্ব না করেও প্রাগ্রসর চিন্তা ও ভাবনায় আমরা বিজ্ঞান যুগে বিজ্ঞান কবিতা লিখতে চাই।

লেখক পরিচিতি:

কবি, সাংবাদিক ও গবেষক বিজ্ঞান কবিতা আন্দোলনের প্রবর্তক।