ইজতেমার বয়ান: কী চাইবেন আল্লাহর কাছে?

ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫

ইজতেমার বয়ান: কী চাইবেন আল্লাহর কাছে?

হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ জোবায়ের (কাকরাইল) ৬:৩১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৪, ২০১৮

ইজতেমার বয়ান: কী চাইবেন আল্লাহর কাছে?

দোয়া হলো সব ইবাদতের মগজ। দোয়া অনেক বড় ইবাদত। আল্লাহ বান্দার দোয়া পছন্দ করেন। তাই আমরা আল্লাহর কাছে সব সময় সব কাজে দোয়া করব। বেশি বেশি চাইব তাঁর কাছে। কিন্তু দোয়ায় আমরা কী চাইব? কোন চাওয়াকে অগ্রাধিকার দেব?

আমরা অনেকেই আল্লাহর কাছে শুধু দুনিয়া চাই। ইহকালীন বস্তু কামনা করি। অথচ দোয়াতেও উচিত পরকালকে প্রাধান্য দেয়া। আল্লাহ তায়ালার কাছে যারা শুধু দুনিয়া চায় কুরআনে তাদের নিন্দা করা হয়েছে আর যারা দুনিয়া-আখিরাত উভয়ই চায় তাদের প্রশংসা করা হয়েছে।

সূরা বাকারায় আল্লাহ বলেন, ‘অনেকে দোয়ায় বলে যে পরওয়াদেগার! আমাদিগকে দুনিয়াতে দান কর। অথচ তার জন্যে পরকালে কোনো অংশ নেই। আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে, হে পরওয়ারদেগার! আমাদিগকে দুনয়াতেও কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর এবং আমাদিগকে দোজখের আজাব থেকে রক্ষা কর।’

এজন্য সাহাবায়ে কেরাম দোয়ায় আখিরাত চাইতেন বেশি। দুনিয়াকে তারা কখনো প্রাধান্য দিতেন না। একবার এক মহিলা সাহাবী এসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বললেন, হুজুর, আমার একটি জটিল রোগ আছে। আপনি দোয়া করুন আল্লাহ যেন ভালো করে দেন। নবীজি বললেন, শোন, আমি দোয়া করলে হয়তো আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দেবেন, তবে দোয়া না করলে এর বিনিময়ে দেবেন জান্নাত। তুমি কোনটি চাও রোগমুক্তি নাকি জান্নাত? ওই মহিলা সাহাবী নির্দ্বিধায় বলে দিলেন, আমি তাহলে জান্নাতই চাই!

আরেকবার কয়েকজন আনসারি সাহাবী পরামর্শ করলেন, তারা নবীজির কাছে আবেদন জানাবেন তিনি যেন আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, আল্লাহ মদিনাতে একটি নদী প্রবাহিত করে দেন। তারা যখন নবীজির উদ্দেশে আসছেন, এরমধ্যে আল্লাহ নবীজিকে তাদের কথা আগাম জানিয়ে দিলেন। আল্লাহ নবীজিকে বললেন, আপনার কাছে একদল সাহাবী আসছেন দোয়া চাওয়ার জন্য। আপনি তাদের বলবেন, আজ তারা যা চাইবে, আমি তাদের তাই দিয়ে দেব। কিছুক্ষণ পরে আনসারি সাহাবীরা এলে নবীজি তাদের জানালেন, আজ তোমরা যা চাইবে আল্লাহ তাই দিয়ে দেবেন। তোমরা কী চাও? এ কথা শুনে আনসারিরা একে অপরের দিকে চাইতে লাগলেন। তারা সেখানে দাঁড়িয়ে একে অপরকে বললেন, যেহেতু আমরা আজ যা চাইব আল্লাহ তায়ালা তাই দেবেন, তাহলে তো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী কোনো কিছু চাওয়া বোকামি হবে। এর চেয়ে সবাই মিলে আল্লাহর কাছে নিজেদের জন্য আখিরাতে মাগফিরাত ও ক্ষমা প্রার্থনা করি। নবীজিকে তারা তাই বললেন। নবীজি দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি আনসারিদের ক্ষমা করে দিন।’ সুবহানাল্লাহ।

অথচ দেখুন আমরা এখন দোয়া করলেও আল্লাহর কাছে দুনিয়া চাই। আখেরাত চাই না। গাড়ি চাই বাড়ি চাই, এটা চাই ওটা চাই। আর সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর কাছে দুনিয়া চাইতেন কম, আখেরাত চাইতেন বেশি। এজন্যই সাহাবায়ে কেরাম সবসময় শাহাদাতের তামান্না করতেন। এক বৃদ্ধ সাহাবী একদিন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। তাকে দেখে অন্যরা বললেন, আপনি তো একেবারে বয়োবৃদ্ধ। আপনি কেন যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন? তিনি বললেন, আমি তো দুশমনদের হত্যার জন্য যাচ্ছি না, বরং দুশমনদের হাতে শহীদ হবার জন্য যুদ্ধে যাচ্ছি। ওরা আমার দেহকে ছিন্নভিন্ন করবে আর পরকালে আমি আল্লাহর কাছে এর বিনিময়ে মুক্তি পাব।

হজরত হানজালা (রা.) শহীদ হয়েছেন। তার দেহ এমনভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে যে তাকে দাফনও করা যাচ্ছিল না। আল্লাহর ফেরেশতারা এসে তাকে গোসল করিয়ে দেন। নবীজির চাচা হামজাকে (রা.) কাফেররা শহিদ করে তার বুক চিরে কলিজা চিবিয়ে বিকৃত করে ময়দানে ফেলে যায়। নবীজি ওই লাশ দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলেন না। তিনি দোয়া করলেন, হামজা (রা.) যেন কিয়ামত পর্যন্ত শহিদ হওয়া সবার নেতা হন। আল্লাহ তাকে সেভাবেই কবুল করেন। এজন্যই তাকে বলা হয় সাইয়িদুশ শুহাদা বা শহিদদের নেতা।

এসব অবিশ্বাস্য ইতিহাস তারা তৈরি করতে পেরেছিলেন কারণ তাদের কাছে আখিরাতই ছিল মূখ্য। এজন্য নিয়ত আর দোয়া সবসবয় আখিরাতকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত। যে ব্যক্তি শাহাদাতের তামান্না করবে সে ঘরে মারা গেলেও আল্লাহ তাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করবেন।

হজরত উমর (রা.) দোয়া করতেন, হে আল্লাহ, আমাকে আপনার পথে শহীদ করুন আর আমার মৃত্যৃ দান করবেন আপনার নবীর শহরে। তার মেয়ে উম্মুল মুমিনিন হাফসা (রা.) বলেন, আব্বাজান, এটা কিভাবে সম্ভব- আপনি মদিনাতেই থাকবেন আবার আল্লাহর রাস্তায় শহীদও হবেন?! উমরকে (রা.) আল্লাহ তাই করেছেন নিয়ত আর দোয়ার কারণে। তিনি মদিনার মসজিদে নববিতে ইসলামের দুশমনের ছোরার আঘাতে শাহাদাত লাভ করেন। সুবহানাল্লাহ!

তাই ভাই-দোস্ত-বুজুর্গ, আমাদেরও আল্লাহর কাছে চাইতে গিয়ে আখিরাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দুনিয়াও চাইব, তবে সেটা প্রয়োজন পর্যন্ত। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন।

বিশ্ব ইজতেমা-২০১৮ (প্রথম পর্বের) মোনাজাতের আগে প্রদত্ত বয়ানের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন আলী হাসান তৈয়ব

এএইচটি/এমএসআই