আশুরায় নবীজি (সা.) যে কারণে রোযা রাখতেন

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

আশুরায় নবীজি (সা.) যে কারণে রোযা রাখতেন

অ্যালফওয়েন মিশেলার ২:২২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

আশুরায় নবীজি (সা.) যে কারণে রোযা রাখতেন

আশুরা তথা ১০ মুহররমের রোযা সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, এই দিনের রোযার মাধ্যমে রোযাদার ব্যক্তির বিগত এক বছরের গুনাহকে মাফ করে দেওয়া হয়। [মুসলিম, হাদীস নং: ১১৬২]

৬২২ খ্রিস্টাব্দে রাসূল (সা.) যখন হিজরত মদীনায় করে আসেন, তখন তিনি দেখতে পান মদীনার ইহুদীরা এই দিন রোযা পালনের মাধ্যমে উদযাপন করে। রাসূল (সা.) তাদেরকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা উত্তর দেয়, এই দিনে আল্লাহ হযরত মুসা (আ.) ও বনী ইসরাইলকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্ত করেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন। এর কৃতজ্ঞতায় মুসা (আ.) এই দিনে রোযা রাখতেন বলে তারাও তার অনুসরণে এই দিন রোযা রাখে।

রাসূল (সা.) তখন তাদের বলেন, “আমরা তোমাদের তুলনায় মুসার অধিক নিকটতম।”

রাসূল (সা.) তখন এই দিনে রোযা রাখা শুরু করেন এবং অন্য মুসলিমদেরও রোযা রাখার আদেশ দেন। [বুখারী]

এছাড়া হাদীসে এরূপ বিবরণ এসেছে, রাসূল (সা.) মুহররমের ৯ ও ১০ উভয় তারিখেই রোযা রাখার ইচ্ছা করেছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন–

حِيْنَ صَامَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنَّهُ يَوْمٌ تُعَظِّمُهُ الْيَهُوْدُ وَالنَّصَارَى. فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ إِنْ شَاءَ اللهُ صُمْنَا الْيَوْمَ التَّاسِعَ قَالَ فَلَمْ يَأْتِ الْعَامُ الْمُقْبِلُ حَتَّى تُوُفِّىَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم-

“রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন আশুরার রোযা পালন করলেন এবং রোযা পালনের নির্দেশ দিলেন, তখন সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! ইহুদি ও নাসারাগণ এই দিনটিকে (১০ই মুহাররম) সম্মান করে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আগামী বছর বেঁচে থাকলে ইনশাআল্লাহ আমরা ৯ই মুহাররম সহ রোযা রাখব’। রাবী বলেন, কিন্তু পরের বছর মুহাররম আসার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়ে যায়।” [মুসলিম, হাদীস নং: ১১৩৪]

অন্য হাদীসে এসেছে, ইবনে আববাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন–

صُوْمُوْا يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ وَخَالِفُوْا فِيْهِ الْيَهُوْدَ صُوْمُوْا قَبْلَهُ يَوْماً أَوْ بَعْدَهُ يَوْماً-

“তোমরা আশুরার দিন রোযা রাখ এবং ইহুদিদের বিরোধিতা কর। তোমরা আশুরার সাথে তার পূর্বে একদিন বা পরে একদিন রোযা পালন করো”। [বাইহাকী ৪/২৮৭]

অতএব সুন্নাত হল, ৯ ও ১০ই মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ই মুহাররমে রোযা রাখা।

আবু ক্বাতাদাহ (রা.) হতে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন,

وَصِيَامُ يَوْمِ عَاشُوْرَاءَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِى قَبْلَهُ

‘আমি আশা করি আশুরা বা ১০ই মুহাররমের রোযা আল্লাহর নিকটে বান্দার বিগত এক বছরের (সগীরা) গোনাহের কাফফারা হিসাবে গণ্য হবে’। [মুসলিম, হাদীস নং: ১১৬২]

কিন্তু এবিষয়টি শুধু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুনাহের বিষয়ে প্রযোজ্য। আপনি যদি ক্রমাগতভাবে কোন বড় গুনাহ করতে থাকেন যেমন দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায ত্যাগ বা রমযানের রোযা না রাখা ইত্যাদির মত গুনাহে আপনার আন্তরিক তওবা ছাড়া অন্যকোন মাধ্যমে তা মাফ হবে না।

পাশাপাশি শুধু একদিনের রোযার উপর নিজের গুনাহ মাফের বিষয়ে নিশ্চিত থাকা উচিত নয়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়া (রহ.) বলেন,

 “পথভ্রষ্ট ব্যক্তিরা জানে না রমযানের রোযা এবং দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায আরাফাত ও আশুরার দিনের রোযার থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং তা এক রমযান থেকে পরবর্তী রমযান বা এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত বান্দার গুনাহকে মাফ করাতে পারে, যতক্ষণ তারা বড় বড় গুনাহ থেকে বিরত থাকবে।

কিন্তু কেউ বড় গুনাহ ত্যাগ না করলে কোন ক্ষুদ্র গুনাহও তারা ক্ষমা করিয়ে নিতে পারবে না। যখন দুইটি বস্তুকেই একসাথে রাখা হয় (বড় বড় গুনাহ ত্যাগ ও অন্যান্য ইবাদত), তখন তাদের একত্রে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুনাহকে মুছে নেওয়ার শক্তি তৈরি হয়।

অনেক আত্মপ্রতারিত ব্যক্তিই আছে যারা নিজেদের উত্তম কাজকে তাদের গুনাহের থেকে অধিক বিবেচনা করে। কেননা তারা তাদের মন্দ কাজ বা গুনাহের বিষয়ে সতর্ক থাকে না কিন্তু যদি তারা কোন উত্তম কাজ করে তারা তা স্মরণ রাখে এবং এর উপর নির্ভর করে।

এটি যেন ঐ ব্যক্তির মত যে তার জিহ্বা দিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং দৈনিক একশত বার ‘সুবহানাল্লাহ’ পাঠ করে আল্লাহর প্রশংসা করে। পরক্ষণেই সে মুসলমানদের বিষয়ে গীবত করে এবং তাদের সম্মানে আঘাত করে এবং সারাদিনে এমন কথা বলতে থাকে যা আল্লাহর কাছে প্রিয় নয়।

এই ব্যক্তি সবসময়তার ‘সুবহানাল্লাহ’ ও ‘লা ইলাহা ইল্লালাহ’ পাঠ করার সওয়াব সম্পর্কে চিন্তা করে কিন্তু তার গীবত করা, মিথ্যা বলা এবং অপরের সম্মান নষ্ট করা বা জিহ্বার দ্বারা অন্যান্য গুনাহের বিষয়ে কোন প্রকার চিন্তা করে না। তারা পুরোপুরিভাবে ছলনার মধ্যে পড়ে আছে।” [আল-মাওসুয়াহ আল-ফিকাহিয়া]

আশুরা উপলক্ষে অনেক স্থানেই বিভিন্ন প্রথা যেমন বিশেষ খাবার তৈরি ও মেহেদি পরার প্রচলন রয়েছে। আবার অনেকে আশুরা উপলক্ষে রাসূল (সা.) এর নাতি হযরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের কারণে শোক মিছিলের আয়োজন করেন।

কিন্তু এই সকল কাজই শরয়ী মানদণ্ডে বিদআত হিসেবে পরিগণিত হয়। তাই এসকল বিদআত হতে বিরত থেকে আশুরার দিনে রোযা পালন ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগকে আমাদের গ্রহণ করা উচিত। আল্লাহ তাওফিক দান করুন।

এমএফ/

 

আমল / জীবন পাথেয়: আরও পড়ুন

আরও