নামায পড়ার নিয়ম সংক্ষেপে জেনে নিন

ঢাকা, ১৪ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

নামায পড়ার নিয়ম সংক্ষেপে জেনে নিন

পরিবর্তন ডেস্ক ৪:২৯ অপরাহ্ণ, জুন ২২, ২০১৯

নামায পড়ার নিয়ম সংক্ষেপে জেনে নিন

নামায ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আমল। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে নামাযের অবস্থান দ্বিতীয়। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বারবার তাগিদ দিয়ে নামাযের আদেশ করেছেন। নবীজি (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাযের হিসাব গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি তিনি নামাযকে জান্নাতের চাবি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এছাড়া নামায হল আল্লাহর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরির মাধ্যম।

তাই মুসলমান হিসেবে নিজে নামায আদায় করা ও অধীনস্তদের নামায আদায় করানো আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এমন অনেক মানুষ রয়ে গেছেন, নানা কারণে যাদের নামায শেখা হয়নি। জীবনের এ বেলায় এসে দ্বীনের বুঝ এসেছে। নামায পড়তে ইচ্ছা হয়, কিন্তু জানা নেই কীভাবে পড়বো। অতএব চলুন, আমরা সহজে শিখে নেই নামায আদায়ের নিয়ম—

নামায আদায়ের নিয়ম

প্রথমে অযু সহকারে দাঁড়িয়ে যান। নামাযের নিয়ত করে উভয় হাত কান পর্যন্ত ওঠান। তাকবিরে তাহরিমা বলার পর বাঁ হাতের ওপর ডান হাত রেখে নাভির নিচে রাখুন। এরপর অনুচ্চস্বরে বলুন,

سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ. تَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلاَ إِلهَ غَيْرُكَ

উচ্চারণ: ‘সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়াবি হামদিকা ওয়া তাবারা কাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।’

অর্থ: হে আল্লাহ! আমরা তোমারই পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করছি, তোমার নামই বরকতপূর্ণ এবং তোমার গৌরবই সর্বোচ্চ, তুমি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। (নাসায়ি, হাদীস : ৮৮৯)

এরপর অনুচ্চস্বরে আঊযু বিল্লাহ (আঊযু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম)। এরপর বিসমিল্লাহ (বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম) পড়ুন। (তাহাবী : ১/৩৪৭)

এবার সূরা ফাতিহা পড়ুন। শেষ হলে অনুচ্চস্বরে আমীন বলুন। হানাফী মাযহাব মতে আমীন আস্তে পড়া উত্তম। তবে জোরে আমীন বলার ব্যাপারে ইমামদের মতামত পাওয়া যায়। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক কাম্য নয়।

সূরা ফাতিহা শেষ হলে একটি সূরা অথবা তিনটি ছোট আয়াত, যা কমপক্ষে লম্বা একটি আয়াতের সমতুল্য হয় পড়ুন। (আবু দাউদ, হাদীস : ৬৯৫)

এই পরিমাণ তিলাওয়াত নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্য আবশ্যক। তবে নামাযে কুরআন তিলাওয়াতের সুন্নত পরিমাণের বিবরণও ফিকহের কিতাবে উল্লেখ রয়েছে।

অতঃপর ‘আল্লাহু আকবার’ বলে রুকুতে যান। রুকুতে মাথা নিতম্বের বরাবর সমান করুন। (আবু দাউদ, হাদীস : ৭২৯)

রুকুতে আঙ্গুলগুলো ছড়িয়ে দিয়ে হাঁটু আঁকড়ে ধরুন। (জামে সাগির ২/৪৯৭)

রুকুতে কমপক্ষে তিনবার ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম’ পড়ুন। (তিরমিজি, হাদীস : ২৪২)

এবার রুকু থেকে ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলে মাথা ওঠান। মুক্তাদি হলে অনুচ্চস্বরে শুধু ‘রাব্বানা লাকাল হামদ’ বলুন। এরপর তাকবির তথা আল্লাহু আকবার বলে সিজদায় যান। (সহীহ বুখারী, হাদীস : ৭৪৭)

সিজদায় যাওয়ার সময় প্রথমে হাঁটু, তারপর হাত, তারপর উভয় হাতের মাঝে কপাল মাটিতে রাখুন। নিজের পেটকে রান থেকে এবং বাহুকে পার্শ্বদেশ থেকে পৃথক করে রাখুন। হাত ও পায়ের আঙ্গুলকে কিবলামুখী করে রাখুন। (সহীহ বুখারী, হাদীস : ৭৮৫)

সিজদায় কমপক্ষে তিনবার ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা’ পড়ুন। (তিরমিজি, হাদীস : ২৪২)

এরপর সিজদা থেকে ওঠার সময় সর্বপ্রথম মাথা উঠিয়ে উভয় হাতকে রানের ওপর রেখে স্থিরতার সঙ্গে বসে পড়ুন। এরপর তাকবির বলে দ্বিতীয় সিজদা করুন। দ্বিতীয় সিজদায়ও কমপক্ষে তিনবার তাসবিহ পড়ুন। অতঃপর জমিতে হাত দ্বারা ঠেক না দিয়ে এবং না বসে সরাসরি তাকবীর বলে দাঁড়িয়ে যান। এ পর্যন্ত প্রথম রাকাত সম্পন্ন হলো।

এখন দ্বিতীয় রাকাত শুরু হলো। এতে হাত উঠাবেন না, ছানাও পড়বেন না, আঊযু বিল্লাহও পড়বেন না। তবে আগের মতো সূরা ফাতিহা ও সঙ্গে অন্য একটি সূরা পড়ে রুকু-সিজদা করবেন। দ্বিতীয় সিজদা শেষ করে ডান পা খাড়া করে বাঁ পা বিছিয়ে দিয়ে তার ওপর বসে যাবেন। তখন আপনার হাত থাকবে রানের ওপর এবং ডান পায়ের আঙ্গুলগুলো থাকবে কিবলামুখী। (মুসলিম, হাদীস : ৯১২)

অতঃপর নিম্নের তাশাহহুদ পড়বেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস : ৬২৬৫; মুসলিম, হাদীস : ৪০২)

التَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ

উচ্চারণ : ‘আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত তায়্যিবাত। আসসালামু আলাইকা, আইয়্যুহান্নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহীন। আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহ।’

তাশাহুদ পড়ার সময় ‘আশহাদু আল-লা ইলাহা’ পড়ার সময় শাহাদাত আঙ্গুল উঁচু করে ইশারা করবেন। আর ‘ইল্লাল্লাহু’ বলার সময় আঙ্গুল নামিয়ে ফেলবেন।

তবে তাশাহুদের বাক্য ও আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করার বিষয়ে অন্য নিয়মেরও হাদীস পাওয়া যায়। তাই বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি কাম্য নয়।

যদি দুই রাকাতবিশিষ্ট নামায হয়, যেমন—ফজরের নামায ইত্যাদি, তাহলে তাশাহুদের পর নিম্নের দরূদ শরীফ পাঠ করবেন। (মুসলিম, হাদীস : ৬১৩)

اللّهمّ صلّ على محمّد وعلى آل محمّد كما صلّيت على إبراهيم وعلى آل إبراهيم إنّك حميد مجيد ، اللّهمّ وبارك على محمّد وعلى آل محمّد كما باركت على إبراهيم وعلى آل إبراهيم إنّك حميد مجيد

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ  ওয়ালা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আলি ইবরাহিম। ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদ, ওয়ালা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইবরাহিম, ওয়া আলা আলি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।’

এরপর দুআয়ে মাসূরা তথা পবিত্র কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত যেকোনো দুআ পাঠ করবেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা,  ১/২৯৮)

যেমন—এই দুআ পড়তে পারেন। বিশেষভাবে এটাকে দুআয়ে মাসূরা বলা হয় (সহীহ বুখারী, হাদীস : ৭৯)

اللَّهمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كثِيرًا، وَلا يَغْفِر الذُّنوبَ إِلاَّ أَنْتَ، فَاغْفِر لي مغْفِرَةً مِن عِنْدِكَ، وَارحَمْني، إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفور الرَّحِيم

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি যালামতু নাফসি যুলমান কাসিরাও ওয়ালা ইয়াগফিরুয যুনূবা ইল্লা আনতা, ফাগফিরলী মাগফিরাতাম-মিন ইনদিকা, ওয়ার হামনী ইন্নাকা আনতাল গাফুরুর রাহীম।’

অথবা এই দুআ পড়বেন—

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ : ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনইয়া হাসানাহ, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়া কিনা আজাবান-নার।’

এরপর ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বলতে বলতে ডানে এবং বাঁয়ে সালাম ফেরাবেন। সালাম ফেরানোর সময় আপনার পাশের নামাযি ব্যক্তি এবং ফেরেশতাদের কথা স্মরণ করবেন।

যদি নামায তিন রাকাতবিশিষ্ট হয়, যেমন—মাগরিবের নামায, তখন প্রথম বৈঠকে তাশাহুদের পর আর কিছু পড়বেন না। বরং ‘আল্লাহু আকবার’ বলে সোজা দাঁড়িয়ে যাবেন। (তিরমিজি, হাদীস : ২২৪)

তবে তৃতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহা পড়বেন।

আর নামায যদি চার রাকাতবিশিষ্ট হয়, যেমন—যোহর, আসর ও এশার নামায, তখন চতুর্থ রাকাতেও শুধু সূরা ফাতিহা পড়বেন। এরপর প্রথম দুই রাকাতের মতো রুকু-সিজদা করে দুই রাকাত সম্পন্ন করে শেষ বৈঠকে বসবেন। সেখানে উল্লিখিত পদ্ধতিতে তাশাহুদের পর দরুদ এবং এরপর দুআয়ে মাসূরা পড়ে সালাম ফেরাবেন।

উল্লেখ্য যে, তিন রাকাত বা চার রাকাত বিশিষ্ট ফরয নামাযে তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে শুধু সূরা ফাতিহা পড়বেন, অন্য কোন সূরা মেলাবেন না। আর সুন্নত ও নফল নামাযে তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে সূরা ফাতিহার পর প্রথম দুই রাকাতের মতই সূরা পড়বেন।

রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামাআতের সঙ্গে আদায় করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

এমএফ/

 

আমল / জীবন পাথেয়: আরও পড়ুন

আরও