রমযানের শেষ ১০ রাতে নবীজি যেভাবে আমল করতেন

ঢাকা, ২৪ আগস্ট, ২০১৯ | 2 0 1

রমযানের শেষ ১০ রাতে নবীজি যেভাবে আমল করতেন

সালমান আল-আওদাহ ৪:২৩ অপরাহ্ণ, মে ২৯, ২০১৯

রমযানের শেষ ১০ রাতে নবীজি যেভাবে আমল করতেন

রমযানের শেষ দশ রাত খুবই মূল্যবান। এই রাতগুলো রাসূল (সা.) বেশি বেশি ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করতেন। এই রাতগুলোর মধ্যেই মহিমান্বিত কদরের রাত লুকিয়ে আছে, যে রাতের ইবাদতের মর্যাদা হাজার মাসের থেকে উত্তম।

শুধু ইবাদতের জন্যই রাসূল (সা.) এই রাতগুলোকে বাছাই করে নিতেন। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এই রাতগুলোতে তিনি বেশি বেশি ইবাদতের মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করতেন।

হযতর আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, “রমযানের শেষ দশ রাতগুলোতে রাসূল (সা.) কোমর বেঁধে ইবাদত করতেন। পরিবারের সদস্যদেরও তিনি ইবাদতের জন্য জাগিয়ে দিতেন।” (বুখারী)

হযরত আয়েশা (রা.) আরও বলেন, “রমযান ছাড়া আমি আল্লাহর রাসূলকে অন্য কোনসময়ে এক রাতে সম্পূর্ণ কুরআন পড়তে, সকাল পর্যন্ত সারা রাত নামায আদায় করতে অথবা সম্পূর্ণ মাস রোযা রাখতে দেখিনি।” (ইবনে মাজাহ)

সুতরাং হাদীসের বর্ণনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, রাসূল (সা.) রমযানের রাতগুলো কত গুরুত্বের সাথে অতিবাহিত করতেন।

পরিবারকে জাগিয়ে দেওয়া
রমযানের শেষ রাতগুলো রাসূল (সা.) তার পরিবারের সদস্যদের রাতের একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ইবাদতের জন্য ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতেন।

হযরত আয়েশা (রা.) এর হাদীস থেকে আমরা এই বিষয়টি জেনেছি। অন্য সময়ও রাসূল (সা.) তার পরিবারের লোকদের রাতে ইবাদতের জন্য জাগাতেন, তবে তা অল্প সময় ইবাদতের জন্য।

উম্মুল মুমিনিন হযরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এক রাতে তাকে জাগিয়ে দিতে গিয়ে বলেন, “সুবহানাল্লাহ। চেষ্টার সাথে কিইনা পাঠানো হয়েছে এই রাতে। এত বরকত নাযিলের রাতে ঘুমকাতুরেরা কি জাগবে না? হে রব! দুনিয়ায় যা আচ্ছন্ন, আখেরাতে তা প্রকাশিত হয়ে পড়বে।” (বুখারী)

নিজেকে ইবাদতে মগ্ন রাখা
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, “রাসূল (সা.) রছরের অন্য সময়ের তুলনায় রমযানের শেষ দশ রাতে নিজেকে অধিক ইবাদতে মশগুল রাখতেন”। (মুসলিম)

ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেছেন, “রমযানের শেষ দশ রাতে নিজেকে ইবাদতের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা সুন্নত।”

লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান
রমযানের শেষ দশ রাতের গুরুত্বের অন্যতম কারণ, এ রাতগুলোতে লুকিয়ে থাকা কদরের রাত।

এটি এমন এক রাত, যে রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের থেকেও উত্তম। অর্থাৎ, একজন মুসলিম এই রাতের ইবাদতের মধ্য দিয়ে প্রায় চুরাশি বছরের অধিক ইবাদতের চেয়েও বেশি পুরস্কারের অধিকারী হতে পারে। মুসলিম উম্মাহর কাছে এটি আল্লাহর প্রদত্ত এক বিশাল সুযোগ।

ইমাম ইবরাহীম আল-নাখায়ী বলেছেন, “এই রাতের উত্তম কাজ হাজার মাসের করা কাজের থেকেও উত্তম।”

হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, “আল্লাহকে বিশ্বাসকারী ও তার কাছে পুরস্কারের প্রত্যাশী যে কেউ লাইলাতুল কদর নামাযের মাধ্যমে অতিবাহিত করে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)

হাদীসের আল্লাহকে বিশ্বাসের অর্থ শুধু তাকেই বিশ্বাস করা নয় বরং এই রাতে তার পক্ষ থেকে আমাদের যে পুরস্কারের ওয়াদা করা হয়েছে, তাতেও বিশ্বাস করাকে বোঝায়।

কদরের রাত বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে একটি। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, “রমযানের শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতে কদরের রাতকে খুঁজে নাও।” (বুখারী ও মুসলিম)

শেষ সাত রাতের বেজোড় রাতগুলোতেও কদরের রাতকে খুঁজতে বলা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, “শেষ দশ রাতে একে (কদরের রাত) খুঁজে নাও। যদি দুর্বলতা বা অক্ষমতার কারণে তা না পারো, তবে কমপক্ষে বাকী থাকা শেষ সাত রাতে তার সন্ধান কর।” (মুসলিম)

২৭শে রমযানকে সাধারণভাবে সম্ভাব্য কদরের রাত হিসেবে গণ্য করা হয়। হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.) এর বর্ণনায় বিষয়টি এসেছে, “আমি শপথ করছি, এই রাত কোনটি তা আমার জানা। এই রাতে আল্লাহর নবী আমাদের নামাযের আদেশ করতেন। এটি ২৭শে রমযানের রাত। এর চিহ্ন হচ্ছে, সেদিনের সকালে সূর্য উঠে সকলকিছু আলোকিত করবে কিন্তু কোন প্রকার রশ্মির বিকিরণ হবে না।” (মুসলিম)

রমযানের শেষ দশ দিনে মহিমান্বিত এই রাত অনুসন্ধানে একজন মুসলিম বিভিন্ন ইবাদত তথা নফল নামায, যিকির, কুরআন তেলওয়াত এবং আল্লাহর কাছে তওবার মাধ্যমে অতিবাহিত করতে পারে।

শেষ দশকের রাতগুলোতে আমাদের সবার উচিত কঠোর পরিশ্রম করা। কেননা রাসূল বলেছেন, “আমাদের কদরের রাতের অনুসন্ধানের উপায় হল অতিরিক্ত ইবাদতে মশগুল থাকা।”

রাসূল (সা.) এর অনুসন্ধানের অর্থ কোন প্রকার চিহ্ন ও লক্ষনের অনুসন্ধান নয়, যা কদরের রাতকে অন্য রাত থেকে পৃথক করে দেবে। এসকল পার্থক্য সৃষ্টিকারী বিষয় আমাদের নিকট অদৃশ্য।

কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, “আমি একে নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।” (সূরা দুখান, আয়াত: ৩-৪)

আল্লাহ আরো বলেন, “কদরের রাত হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। এটা নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।” (সূরা কদর, আয়াত: ৩-৫)

এই সকল দিক থেকে কদরের রাত বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কিন্তু এরূপ কিছুই আমরা আমাদের চোখে দেখতে পারি না বা রাসূলের পরবর্তীতে অন্যকেই দেখতে পারেনা।

ইতিকাফে বসা
রমযানের শেষ দশদিনের জন্য ইতিকাফে বসা ছিল রাসূল (সা.) এর মৃত্যু পর্যন্ত নিয়মিত অনুশীলন। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রমযানের শেষ দশদিন রাসূল (সা.) তার মৃত্যু পর্যন্ত মসজিদে ইতিকাফ করতেন। তার ইন্তেকালের পর তার স্ত্রীরা এই অনুশীলন অব্যাহত রাখেন। (বুখারী, মুসলিম)

ইসলামে ইতিকাফকে প্রচন্ড গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মূলত ইতিকাফ বলতে শুধু আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট কিছু দিন মসজিদ বা অন্য কোন স্থানে অবস্থানকেই বোঝায়।

ইতিকাফের উদ্দেশ্য মূলত ব্যক্তির আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির প্রচেষ্টা। ইতিকাফে অবস্থানকারী ব্যক্তির মনে সর্বদা এই চিন্তা থাকে এবং তার কাজে আল্লাহর রহমত কামনা করে। তার কখনোই ভুলে যাওয়া উচিত হবেনা কেন সে ইতিকাফে আছে।

জরুরী প্রয়োজন ছাড়া কোন ব্যক্তিই তার নির্ধারিত ইতিকাফের স্থান ত্যাগ করতে পারে না।

ইতিকাফে থাকা অবস্থায়, ইতিকাফকারীর উচিত নিজেকে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন রাখা। সকাল-সন্ধ্যায় যিকির এবং পাঁচ ওয়াক্তের নামাযের মাধ্যমে সে আল্লাহকে স্মরণ করতে পারে। এছাড়া সে সুন্নত ও নফল নামায এবং কুরআন তেলওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করতে পারে।

খাবার ও ঘুমে তার উচিত যতটুকু কম সম্ভব সময় ব্যয় করা। অযথা কথাবার্তা ও খোশগল্পকে তার এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। কিন্তু, ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানমূলক আলোচনায় সে অংশগ্রহণ করতে পারে।

দান-সদকা
রমযানের শেষ দশ রাতে কোন প্রকার অপচয় বা লোকদেখানোর জন্য ছাড়া দান-সদকা বাড়ানোর জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) সৎকাজের দিক থেকে সবার চেয়ে অগ্রগণ্য এবং রমযানে তিনি তার দয়া-দাক্ষিণ্যের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিতেন। জিবরাইল (আ.) প্রতিবছর রমযানে তার সাথে সাক্ষাত করতেন এবং রাসূল (সা.) তাকে সম্পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। জিবরাইল (আ.) এর সাথে সাক্ষাতের পর তিনি যেনো কল্যাণকর বাতাসের মত উদার হয়ে যেতেন। (বুখারী ও মুসলিম)

ইমাম নববী বলেন, “দয়া ও হাত খুলে দান করাকে রমযানে বিপুলভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে, বিশেষ করে শেষ দশ রাতে। এর মাধ্যমে আমরা রাসূল (সা.) এর উদাহরণের পাশাপাশি আমাদের পূণ্যবান পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করতে পারি। এই মাস মহিমান্বিত এবং যেকোন সময়ের চেয়ে এই মাসে করা পূণ্যকাজ অধিক বরকতপূর্ণ।”

এমএফ/

আরও পড়ুন...
লাইলাতুল কদর কবে হবে?
শবে কদরের বিশেষ দুআটি শিখে নিন
ইতিকাফের তাৎপর্য ও জরুরী মাসায়েল
রমযানের শেষ দশক এবং হাজার মাসেরও শ্রেষ্ঠ একটি রাত
রমযানের গুরুত্বপূর্ণ চার শিক্ষা
অনন্য ফযীলতের রমাদান মাস
রমযান যাদের আল্লাহর সাথে মিলিয়ে দেয়
রোযা ও রমযান : ফাযায়েল ও জরুরি মাসায়েল
হাদিস থেকে রমযানুল মোবারকের বিশটি স্পেশাল আমল
ইতিকাফ সৌভাগ্যের সোপান
রমযানের রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের হাদিসটি শুদ্ধ নয়

 

আমল / জীবন পাথেয়: আরও পড়ুন

আরও