রমযানের শেষ দশক, ইতিকাফ এবং লাইলাতুল কদর

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯ | ৪ আষাঢ় ১৪২৬

বিষয় :

রমযানের শেষ দশক

ইতিকাফ

লাইলাতুল কদর

শবে কদর

রমযানের শেষ দশক, ইতিকাফ এবং লাইলাতুল কদর

পরিবর্তন ডেস্ক ৬:৩৫ অপরাহ্ণ, মে ২৫, ২০১৯

রমযানের শেষ দশক, ইতিকাফ এবং লাইলাতুল কদর

পবিত্র কুরআনের সূরা কদরে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা ইরশাদ করেন-

إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ (1) وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ (2) لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ (3) تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ (4) سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ الْفَجْرِ (5)

তরজমা :
১. আমি একে (কুরআন) অবর্তীণ করেছি লাইলাতুল কদরে। ২. আপনি কি জানেন লাইলাতুল কদর কি? ৩. লাইলাতুল কদর হল হাজার মাস অপেক্ষা (শ্রেষ্ঠ একটি রাত)। ৪. এতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতাগণ এবং রূহ (জিবরঈল) অবর্তীণ হন তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। ৫. এটা নিরাপত্তা যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যহত থাকে। (সূরা ক্বদর)

দেখতে দেখতে মহিমান্বিত মাহে রমযান আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নেয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে। আমরা শেষ দশকে উপনীত হতে যাচ্ছি। সৌভাগ্যবান লোকেরা এ মাসে আঁচল ভরে পাথেয় সংগ্রহ করে নিচ্ছে, আর হতভাগারা এখনো অনাচারের পুঁতিগন্ধময় অন্ধকার গলিতে উদ্ভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কিন্তু এখনও প্রিয় প্রভূর কল্যাণের অবারিত বর্ষণ শেষ হয়ে যায়নি। এখনও বন্ধ হয়ে যায়নি তাওবার দরজা। বরং আরও বেশি অপার কল্যাণের বারিতে অবগাহনের সুযোগ নিয়ে মাহে রমযানের শেষ দশক আমাদের মাঝে সমাগত। ইনশাআল্লাহ, এনিবন্ধে আমরা জেনে নিব আল্লাহ তা’আলা আমাদের জন্য এতে কী উপহার সাজিয়ে রেখেছেন এবং কীভাবে আমরা তা অর্জন করতে পারি। নিম্নে তা পবিত্র কুরআন ও প্রিয়তম রাসুলের সুন্নাহ থেকে ছোট ছোট শিরোনামে বিবৃত করা হল।

রমযানের শেষ দশক
১. রমযানের শেষ দশকে নবী (সা.) স্ত্রী-পরিবারসহ সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন:
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন:

إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ ، وَأَحْيَا لَيْلَهُ ، وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ

“রমযানের শেষ দশক প্রবেশ করলে রাসূল (সা.) কোমর বেঁধে নিতেন, নিজে সারা রাত জাগতেন এবং পরিবারকেও জাগাতেন।” (বুখরী ও মুসলিম)

কোমর বাঁধার অর্থ হল: পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে চেষ্টা-সাধনায় লিপ্ত হওয়া। কোন কোন আলেম এর ব্যাখ্যায় বলেন: স্ত্রী সহবাস থেকে দূরে থাকা।

২. রাসূল (সা.) রমযানে শেষ দশকে যত বেশি পরিশ্রম করতেন অন্য কখনো করতেন না:
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন:

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- يَجْتَهِدُ فِى الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مَا لاَ يَجْتَهِدُ فِى غَيْرِهِ

রাসূল (সা.) রমযানের শেষ দশকে (ইবাদত-বন্দেগীতে) এমনই পরিশ্রম করতেন যেমন পরিশ্রম অন্য কখনো করতেন না।”(মুসলিম)

লাইলাতুল কদর/লাইলাতুল কদর
১. লাইলাতুল কদরে কুরআন অবর্তীণ হয়েছে:
আল্লাহ তা’আলা বলেন:

إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ

“আমি একে (কুরআন) অবর্তীণ করেছি লাইলাতুল কদরে।” (সূরা কাদর: ১)

২. লাইলাতুল কদর এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম:
আল্লাহ বলেন:

لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ

“লাইলাতুল কদর এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।” (সূরা কাদর: ৩)

৩. আল্লাহ তা’আলা লাইলাতুল কদরকে বরকতময় রাত বলে উল্লেখ করেছেন:
আল্লাহ তা’আলা বলেন:

إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ

“নিশ্চয় আমি ইহা (কুরআন)কে অবর্তীণ করেছি একটি বরকতময় রাতে।” (সূরা দুখান: ৩) (আর এ রাত হল লাইলাতুল কদর।)

৪. লাইলাতুল কদরে রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগী করলে পূর্বের সকল সগীরাহ গুনাহ মোচন হয়ে যায়:
রাসূল (সা.) বলেন:

مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ

“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সোয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে রাত জাগরণ করে নফল নামায ও ইবাদত বন্দেগী করবে তার পূর্বের সকল (ছোট) গুনাহ মোচন করে দেয়া হবে।” (বুখারী)

লাইলাতুল কদর কখন হবে?
লাইলাতুল কদর হবে রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে:
ক. আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন:
« تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِى الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ »

“তোমরা রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।” (বুখারী)

খ. আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেন:
أُرِيتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ ثُمَّ أَيْقَظَنِى بَعْضُ أَهْلِى فَنُسِّيتُهَا فَالْتَمِسُوهَا فِى الْعَشْرِ الْغَوَابِرِ

স্বপ্নে আমাকে লাইলাতুল ক্বদ্‌র দেখানো হল। কিন্তু আমার এক স্ত্রী আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়ায় আমি তা ভুলে গিয়েছি। অতএব, তোমরা তা রমযানের শেষ দশকে অনুসন্ধান কর।” (বুখারী)

কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, দু ব্যক্তির বিবাদের কারণে রাসূল (সা.) তা ভুলে গেছেন।

গ. লাইলাতুল কদর কি শুধু রমযানের সাতাইশ রাতের জন্য নির্দিষ্ট?
আমাদের দেশে সাধারণত: মানুষ শুধু রমযানের সাতাইশ তারিখে রাত জেগে ইবাদত বন্দেগী করে এবং ধারণা করে এ রাতেই লাইলাতুল কদর অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এ ধারণা, সুন্নতের সাথে সঙ্গতীপূর্ণ নয়। কারণ, আয়েশা রা. হতে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেন:

تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِى الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ

“তোমরা রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলোতে লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধান কর।” (বুখারী)

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেন:

« أُرِيتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ ثُمَّ أَيْقَظَنِى بَعْضُ أَهْلِى فَنُسِّيتُهَا فَالْتَمِسُوهَا فِى الْعَشْرِ الْغَوَابِرِ »

স্বপ্নে আমাকে লাইলাতুল ক্বদ্‌র দেখানো হল। কিন্তু আমার এক স্ত্রী আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়ায় আমি তা ভুলে গিয়েছি। অতএব, তোমরা তা রমযানের শেষ দশকে অনুসন্ধান কর।” (বুখারী)

ঘ. তবে শেষ সাত দিনের বেজড় রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি:
যেমন, নিম্নোক্ত হাদীসটি:

ابْنِ عُمَرَ – رضى الله عنهما – أَنَّ رِجَالاً مِنْ أَصْحَابِ النَّبِىِّ – صلى الله عليه وسلم – أُرُوا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِى الْمَنَامِ فِى السَّبْعِ الأَوَاخِرِ ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ – صلى الله عليه وسلم – « أَرَى رُؤْيَاكُمْ قَدْ تَوَاطَأَتْ فِى السَّبْعِ الأَوَاخِرِ ، فَمَنْ كَانَ مُتَحَرِّيَهَا فَلْيَتَحَرَّهَا فِى السَّبْعِ الأَوَاخِرِ »

ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত যে, কয়েকজন সাহাবী রামা যানের শেষ সাত রাত্রিতে স্বপ্ন মারফত লাইলাতুল কদর হতে দেখেছেন। সাহাবীদের এ স্বপ্নের কথা জানতে পেরে নবী (সা.) বলেন: “আমি দেখছি তোমাদের স্বপ্নগুলো মিলে যাচ্ছে শেষ সাত রাত্রিতে। অত:এব কেউ চাইলে শেষ সাত রাত্রিতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে পারে।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

এ মর্মে আরও হাদীস রয়েছে।

কোন কোন সালাফে-সালেহীন সাতাশ রাত লাইলাতুল কদর হওয়ার অধিক সম্ভাবনাময় বলে উল্লেখ করেছেন। সাহাবীগণের মধ্যে ইবনে আব্বাস রা., মুআবিয়া, উবাই ইবনে কা’ব রা. এর মতামত থেকে এটাই বুঝা যায়।

কিন্তু নবী (সা.) থেকে এভাবে নির্দিষ্ট করে লাইলাতুল কদর হওয়ার কোন হাদীস নেই। তাই উপরোক্ত সাহবীদের কথার উপর ভিত্তি করে বড় জোর সাতাইশে রাতে লাইলাতুল কদর হওয়াকে অধিক সম্ভাবনাময় বলা যেতে পারে। নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। সঠিক কথা হল, লাইলাতুল কদর কখনো ২১, কখনো ২৩, কখনো ২৫, কখনো ২৭ আবার কখনো ২৯ রাতে হতে পারে।

সুতরাং শুধু সাতাইশ তারিখ নয় বরং কোন ব্যক্তি যদি রমযানের শেষ দশকের উপরোক্ত পাঁচটি রাত জাগ্রত হয়ে ইবাদত-বন্দেগী করে তবে নিশ্চিতভাবে লাইলাতুল কদর পাবে। কিন্তু শুধু সাতাইশ রাত জাগলে লাইলাতুল কদর পাবে তার কোন নিশ্চয়তা নাই। বরং অন্যান্য রাত বাদ দিয়ে শুধু সাতাইশ রাত উদযাপন করা বিদআতের অন্তর্ভূক্ত। বিশেষ করে আমাদের দেশে যেভাবে শুধু সাতাইশ তারিখ নির্দিষ্ট করে নেয়া হয়েছে সেটা বিদআত ছাড়া অন্য কিছু নয়। তাই বিদআত বর্জন করে সুন্নতী পন্থায় আমল করা আমাদের জন্য অপরিহার্য।

ঙ. লাইলাতুল কদরের বিশেষ দুআ:
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি যদি জানতে পারি যে, কোন রাতটি লাইলাতুল কদর তাহলে তখন কোন দুয়াটি পাঠ করব? তিনি বললেন, তুমি বল:

اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّى

“হে আল্লাহ, আপনি মহানুভব ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করা পছন্দ করেন। অত:এব আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।” (তিরমিযী, অনুচ্ছেদ, কোন দুয়াটি শ্রেষ্ঠ। তিনি বলেন: হাদীসটি হাসান, সহীহ)।

ইতিকাফ
ক. রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত:

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত।
আল্লাহ তা’আলা নবী (সা.) কে মৃত্যু দেয়া পর্যন্ত রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। তাঁর ওফাতের পর তাঁর স্ত্রীগণ ইতিকাফ করেছেন।”(সহীহ বুখারী)

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত।
রাসূল (সা.) প্রতি রমযানে দশ দিন ইতিকাফ করতেন। এক বছর সফরে যাওয়ায় ইতিকাফ করতে পারেন নি। তাই যে বছর তিনি ইন্তিকাল করেন সে বছর বিশ দিন ইতিকাফ করেন । (মুসনাদে আহমাদ)

খ. ইতিকাফ সংক্রান্ত ভুল ধারণা:
আমাদের দেশে মনে করা হয় যে সমাজের পক্ষ থেকে এক ব্যক্তিকে অবশ্যই ইতিকাফে বসতে হবে তা না হলে সবাই গুনাহগার হবে। কিন্তু এ ধারণা ঠিক নয়। তবে রমযানের শেষ দশকের ইতিকাফ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফযীলতপূর্ণ ইবাদত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই গুরুত্ব সহকারে ইতিকাফ করতেন। তাই এ ব্যাপারে উদাসীনতা মোটেও ঠিক নয়।

আল্লাহ তা’আলা সকল ক্ষেত্রে তার নবী সা. এর সুন্নতকে যথাযথভাবে পালন করার তাওফীক দান করুন এবং সকল বিদআত ও সুন্নাহ পরিপন্থী কার্যকলাপ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
রমযানের শেষ দশক এবং হাজার মাসেরও শ্রেষ্ঠ একটি রাত
রমযানের গুরুত্বপূর্ণ চার শিক্ষা
অনন্য ফযীলতের রমাদান মাস
রমযান যাদের আল্লাহর সাথে মিলিয়ে দেয়
রোযা ও রমযান : ফাযায়েল ও জরুরি মাসায়েল
হাদিস থেকে রমযানুল মোবারকের বিশটি স্পেশাল আমল
ইতিকাফ সৌভাগ্যের সোপান
রমযানের রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের হাদিসটি শুদ্ধ নয়
ইতিকাফের তাৎপর্য ও জরুরী মাসায়েল