আশুরায় কী পালন করবেন?

ঢাকা, ৬ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

আশুরায় কী পালন করবেন?

পরিবর্তন ডেস্ক ১২:০৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৮

আশুরায় কী পালন করবেন?

পবিত্র মাস মুহাররম আমাদের মাঝে সমাগত। আশুরা এ মাসের বিশেষ একটি দিন, যাকে মানুষ বিভিন্নভাবে উদযাপন করে।

ইসলামের ইতিহাসে এদিন দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। একটি আনন্দের, অপরটি বেদনার। মূলত, এ দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করেই মানুষের মাঝে এ দিবসের আমলে ভিন্নতা এসেছে।

প্রথম ঘটনা: গোত্রসহ মুসা আলাইহিস সালামের পরিত্রাণ ও সদলবলে ফেরাউনের পতন

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত,

لَمَّا قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ المَدِينَةَ وَجَدَ اليَهُودَ يَصُومُونَ عَاشُورَاءَ، فَسُئِلُوا عَنْ ذَلِكَ، فَقَالُوا: هَذَا اليَوْمُ الَّذِي أَظْفَرَ اللَّهُ فِيهِ مُوسَى، وَبَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى فِرْعَوْنَ، وَنَحْنُ نَصُومُهُ تَعْظِيمًا لَهُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نَحْنُ أَوْلَى بِمُوسَى مِنْكُمْ، ثُمَّ أَمَرَ بِصَوْمِهِ»

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করে দেখলেন স্থানীয় ইহুদিরা আশুরা দিবসে রোযা পালন করছে। ফলে তাদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলো। তারা উত্তর দিল এ এমন এক দিবস যাতে আল্লাহ তা’আলা মুসা আলাইহিস সালামকে বিজয়ী করেছিলেন এবং বনী ইসরাঈলকে ফেরাউনের ওপর আধিপত্য দান করেছেন। এ দিনের সম্মানার্থে আমরা সিয়াম পালন করি। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, ‘তাহলে তো এ দিন রোযা রাখার ব্যাপারে আমরাই অধিক হকদার। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিবসে রোযা পালনের নির্দেশ দেন।’ (বুখারি: ৩৯৪৩; মুসলিম: ১১৩০)

দ্বিতীয় ঘটনা: নবী দৌহিত্র হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত বরণ

ইরাকের কারবালা প্রান্তরে মর্মবিদারক এ ঘটনাটি ঘটেছিল ৬১ হিজরির পবিত্র জুমার দিন। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১১/৫৬৯)

এটি ছিল উম্মতের ওপর নেমে আসা সবচে বড় বিপদগুলোর একটি। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের ঘটনাটি মহা বিপদগুলোর একটি। কারণ, হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং তার আগে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর শহীদ হওয়ার ঘটনার মধ্যদিয়েই পরবর্তীতে উম্মতের ওপর নেমে এসেছে অনেক মহাদুর্যোগ। আর তাদের শহীদ করেছে আল্লাহর নিকৃষ্ট বান্দারা।’ (মাজমাউল ফাতাওয়া ৩/৪১১)

 উপরোল্লিখিত ঘটনা দুটি থেকেই বিপরীতমুখী দুই রকম আমলের এই বিভাজন। একদল দ্বিতীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ দিনকে শোক দিবস হিসেবে পালন করে। এদিন তারা গণ্ডাদেশ জখম করে, বুকের কাপড় ছিঁড়ে ফেলে তারা মাতম করেন। এরা এমন অবস্থায়ও উপনীত হয় যে, নিজে নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত করে। কেউ কেউ তরবারি দিয়ে মাথায় আঘাত করে রক্ত বয়ে দেয়।

তাদের দাবি, এভাবে তারা হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হারানোর বেদনা প্রকাশ করেন। এরা নিজেদের তার একান্ত ভক্ত ও অনুসারি বলেও দাবি করেন। এরা শিয়া সম্প্রদায়ের কয়েকটি দল। এরা বলতে চায় যেন তারাই একমাত্র আহলে বাইত বা রাসূল-পরিবারকে ভালবাসেন। যারা তাদের মতো কাজ করেন না আহলে বাইতকে তারা ভালবাসে না।

প্রকৃতপক্ষে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত আহলে বাইতকে সর্বাধিক ভালোবাসে। কিন্তু, তারা ভালোবাসা প্রদর্শনে শরীয়তের সীমা অতিক্রম করে না। ইসলামের বিধান লঙ্ঘন করে ভালোবাসা প্রদর্শনের রুসম তৈরি করা তো ইসলামী শরীয়তকেই বিকৃত করা। এর মাঝে কি কল্যাণ থাকতে পারে? আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَطَمَ الخُدُودَ، وَشَقَّ الجُيُوبَ، وَدَعَا بِدَعْوَى الجَاهِلِيَّةِ

‘সে আমাদের উম্মতভুক্ত নয় যে গালে আঘাত করে, বুকের কাপড় ছেঁড়ে এবং জাহেলি কথাবার্তা বলে।’ (বুখারী: ১২৯৪, মুসলিম: ১০৩)

এদের সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘এমনিতেই এসব কাজের নিন্দায় অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তার সঙ্গে যদি মুসলমানের ওপর যুলুম করা, তাদের অভিশাপ দেওয়া ও গাল-মন্দ করা এবং তাদের মাঝে অনৈক্য ও ধর্মহীনতার বীজ বপনকারীদের সাহায্য করার মতো অপরাধ যোগ, তাহলে তা বড় গুনাহর কাজ বলে গণ্য হবে বলাই বাহুল্য।’

আরেক দল, যারা নাসেবিয়া হিসেবে পরিচিত। এরা আশুরা দিবসে আনন্দ-উৎসব করে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের কিছু লোকও আছে, যারা এ ব্যাপারে ভুলের শিকার। তারা এ দিনে গোসল করা, মেহেদি ও সুরমা লাগানো ইত্যাদি আনন্দ প্রকাশক কাজ করে। এমন করার উদ্দেশ্য, যারা এ দিনটিকে শোক দিবস হিসেবে পালন করে তাদের বিরুদ্ধাচারণ করা। কিন্তু, এটাতো ভ্রান্তির বদলে ভ্রান্তির চর্চা এবং বিদআতকে প্রতিরোধ করা বিদআতের মাধ্যমে। যেমনটি বলেছেন ইবনু তাইমিয়া (রহ.)। (মাজমাউল ফাতাওয়া : ৪/৫১৩)

আশুরা দিবসে আমাদের করণীয়

এ দিবসে আমাদের করণীয় কেবল তাই যা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছেন এবং আমাদের করতে বলেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিন রোযা রাখতে বলেছেন, মুসা আলাইহিস সালামের মুক্তি ও ফেরাউনের ভরাডুবির শুকরিয়া হিসেবে। এ রোযার সঙ্গে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের কোনো সম্পর্ক নেই।

এ দিবস সম্পর্কে শুদ্ধ-অশুদ্ধ অনেক হাদীস বর্ণনা করা হয়। কিন্তু, কার্যক্ষেত্রে এর মাহাত্ম্য রোযা পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর আশুরার ব্যাপারে এটিই মধ্যমপন্থী এবং সঠিকতম দৃষ্টিভঙ্গি। (দেখুন, লাতায়েফে মাআরেফ : ১০২-১১৩)

হুসাইনের (রা.) জন্য যা করবেন

কারবালা প্রান্তরে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের ঘটনা উম্মতের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বড় বেদনাবহ ঘটনাগুলোর একটি। এজন্য মুসলিমরা হৃদয়ে গভীর শোক ও অশেষ বেদনা অনুভব করেন। কিন্তু, এজন্য শুধু এমন কাজই করা উচিত ও উত্তম হবে, শরীয়ত যা শিক্ষা দিয়েছে। আর শরীয়তে শোকের সময় ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রজিঊন’ বলার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

ٱلَّذِينَ إِذَآ أَصَٰبَتۡهُم مُّصِيبَةٞ قَالُوٓاْ إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّآ إِلَيۡهِ رَٰجِعُونَ ١٥٦ أُوْلَٰٓئِكَ عَلَيۡهِمۡ صَلَوَٰتٞ مِّن رَّبِّهِمۡ وَرَحۡمَةٞۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُهۡتَدُونَ ١٥٧ 

‘আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা, তাদের যখন বিপদ আক্রান্ত করে তখন বলে, (‘ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রজিউন’) নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তার দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।’ সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৫৫-১৫৭

হাদিস শরীফে এ ব্যপারে স্বয়ং হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কত উত্তম নির্দেশনা এসেছে– ফাতেমা বিনতে হুসাইন তার পিতা হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

«مَنْ أُصِيبَ بِمُصِيبَةٍ، فَذَكَرَ مُصِيبَتَهُ، فَأَحْدَثَ اسْتِرْجَاعًا، وَإِنْ تَقَادَمَ عَهْدُهَا، كَتَبَ اللَّهُ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلَهُ يَوْمَ أُصِيبَ»

‘যদি কোনো মুসলিম বিপদে আক্রান্ত হয়। তারপর পরবর্তীতে সে বিপদ স্মরণ হলে সে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রজিউন’ পড়ে, তাহলে আল্লাহ তা’আলা তার জন্য সে পরিমাণ পূণ্য লিখেন যে পরিমাণ লিখা হয়েছে বিপদে আক্রান্ত হবার দিন।’ (মুসনাদ আহমাদ: ১৭৩৪; ইবনু মাজা: ১৫৯৮)

রাব্বুল আলামিন আমাদের সত্য অনুধাবন করে সত্যকেই জীবনে চর্চার তাওফিক দান করুন এবং আশুরাকে কেন্দ্র করে যাবতীয় বদদ্বীনি ও বিদ্বেষ চর্চার ফাসাদ থেকে উম্মতে মুসলিমাহকে হিফাজত করুন। আমিন ইয়া রাব্বাল আলামিন।

এমএফ/আইএম

 

 

আমল / জীবন পাথেয়: আরও পড়ুন

আরও