মুহাররম মাস : ফযিলত, আমল ও বিদআত

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫

মুহাররম মাস : ফযিলত, আমল ও বিদআত

পরিবর্তন ডেস্ক ৪:৩৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮

মুহাররম মাস : ফযিলত, আমল ও বিদআত

মুহররম, হিজরি সনের প্রথম মাস। একটি মহান বরকতময় মাস। এমাস ‘আশহুরে হুরুম’ তথা যাবতীয় যুলুম ও রক্তপাত নিষিদ্ধ ও বিশেষভাবে সম্মানিত মাস চতুষ্টয়ের অন্যতম। আশহুরে হুরুম সম্বদ্ধে আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ

“নিশ্চয় মাসসমূহের গণনা আল্লাহর কাছে বারো মাস আল্লাহর কিতাবে, (সেদিন থেকে) যেদিন তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্য থেকে চারটি সম্মানিত, এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন। সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে নিজদের উপর কোন জুলুম করো না। -সূরা তাওবা:৩৬ 

হযরত আবু বাকরাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ: ثَلاثَةٌ مُتَوَالِيَاتٌ ذُو الْقَعْدَةِ وَذُو الْحِجَّةِ وَالْمُحَرَّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ  رواه البخاري

“বছর হলো বারোটি মাসের সমষ্টি, তার মধ্যে চারটি অতি সম্মানিত। তিনটি পর পর লাগোয়া জিলকদ, জিলহজ ও মুহররম আর (চতুর্থটি হলো) জুমাদাস সানি ও শাবানের মধ্যবর্তী রজব।” -বুখারী:২৯৫৮

হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মুহররমকে মুহররম বলে অভিহিত করা হয়েছে কারণ এমাস অতি সম্মানিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, فَلا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ  “তোমরা এতে নিজেদের উপর কোনো যুলুম করো না।” অর্থাৎ, এই সম্মানিত মাস সমূহে তোমরা কোনো অন্যায় করো না। কারণ এ সময়ে সংঘটিত অন্যায় ও অপরাধের পাপ অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি ও মারাত্মক।

মুহাররম মাসের আমল

এ মাসের আমল শুধু তা-ই, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বলে দিয়ে গেছেন। তিনি এ মাসে অধিক পরিমাণে নফল রোযার কথা বলেছেন। হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ

অর্থাৎ, “রমযানের পর সর্বোত্তম রোযা হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহররম (মাসের রোযা)।” -সহিহ মুসলিম,১৯৮২ 

شَهْرُ اللَّهِ বাক্যে شَهْر কে اللَّهِ -এর দিকে যে إضافة করা হয়েছে এটি إضافة تعظيم। অর্থাৎ, সম্মানের ইযাফত। আল্লামা ক্বারী রহ. বলেন, হাদিসের বাহ্যিক শব্দমালা থেকে পূর্ণ মাসের রোযা বুঝে আসে। তবে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান ব্যতীত আর কোনো মাসে পূর্ণ মাস রোযা রাখেননি, এটি প্রমাণিত। তাই হাদিসকে এ মাসে বেশি পরিমাণে রোযা রাখার ব্যাপারে উৎসাহ দেয়া হয়েছে বলে ধরা হবে।

ইমাম নববি রহ. বলেন, শা’বান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক রোযা রেখেছেন বলে একাধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। হতে পারে মুহররম মাসের ফজিলত সম্বন্ধে তাঁকে একেবারে জীবনের শেষ পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে আর তিনি তা বাস্তবায়ন করে যাবার সময় পাননি। -শারহু সহিহ মুসলিম 

আশুরা বা ১০ মুহাররমের রোযা

উপরে হাদিস থেকে আমরা সাধারণভাবে পুরো মুহাররম মাসের নফল রোযার ফযিলত সম্বন্ধে অবগত হলাম। তবে বিশেষভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১০ মুহাররম রোযা রেখেছেন। কিন্তু ইহূদী ও নাছারারা শুধুমাত্র ১০ই মুহাররমকে সম্মান করত এবং রোযা পালন করত। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বিরোধিতা করার জন্য ঐ দিনসহ তার পূর্বের অথবা পরের দিন রোযা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। 

অতএব সুন্নাত হ’ল, ৯ ও ১০ই মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ই মুহাররমে রোযা পালন করা। আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

حِيْنَ صَامَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنَّهُ يَوْمٌ تُعَظِّمُهُ الْيَهُوْدُ وَالنَّصَارَى. فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ إِنْ شَاءَ اللهُ صُمْنَا الْيَوْمَ التَّاسِعَ قَالَ فَلَمْ يَأْتِ الْعَامُ الْمُقْبِلُ حَتَّى تُوُفِّىَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আশূরার রোযা পালন করলেন এবং রোযা পালনের নির্দেশ দিলেন, তখন ছাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! ইহূদী ও নাছারাগণ এই দিনটিকে (১০ই মুহাররম) সম্মান করে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আগামী বছর বেঁচে থাকলে ইনশাআল্লাহ আমরা ৯ই মুহাররম সহ রোযা রাখব’। রাবী বলেন, কিন্তু পরের বছর মুহাররম আসার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়ে যায়। -মুসলিম:১১৩৪

অন্য হাদীসে এসেছে, ইবনে আববাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

صُوْمُوْا يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ وَخَالِفُوْا فِيْهِ الْيَهُوْدَ صُوْمُوْا قَبْلَهُ يَوْماً أَوْ بَعْدَهُ يَوْماً

‘তোমরা আশূরার দিন রোযা রাখ এবং ইহুদীদের বিরোধিতা কর। তোমরা আশুরার সাথে তার পূর্বে একদিন বা পরে একদিন রোযা পালন কর’। -বায়হাক্বী ৪/২৮৭ 

৯, ১০ অথবা ১০ ও ১১ – যেকোন দু’দিন রোযা রাখা উচিত। তবে প্রথমোক্ত হাদিসে যেমন রয়েছে  ৯ ও ১০ দু’দিন রাখাই সর্বোত্তম। ইমাম আহমাদ, ইমাম ইসহাক ও ইমাম শাফেয়ী রহ. প্রমুখ বলেছেন, আশুরার রোযার ক্ষেত্রে দশম ও নবম দিনের রোযা অধিক উত্তম। কেননা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশ তারিখ রোযা রেখেছেন এবং নয় তারিখ রোযা রাখার নিয়ত করেছেন।

এরই উপর ভিত্তি করে বলা যায়, আশুরার রোযার কয়েকটি স্তর রয়েছে: সর্ব নিম্ন হচ্ছে কেবল ১০ তারিখের রোযা রাখা। এরচে উচ্চ পর্যায় হচ্ছে তার সাথে ৯ বা ১১ তারিখের রোযা রাখা। এমনিভাবে মুহররম মাসে রোযার সংখ্যা যত বেশি হবে মর্যাদা ও ফযিলতও ততই বাড়তে থাকবে। 

আশুরায় উদযাপিত কিছু বিদআত – যা বর্জনীয় 

আশুরার দিন লোকেরা সুরমা লাগানো, গোসল করা, মেহেদি লাগানো, মুসাফাহা করা, খিচুড়ি রান্না করা, আনন্দ উৎসবসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করে থাকে এ সম্বন্ধে শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রহ. কে প্রশ্ন করা হল, এর কোনো ভিত্তি আছে কি না?

জবাবে তিনি বললেন, এসব অনুষ্ঠানাদি উদযাপন প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহিহ কোনো হাদিস বর্ণিত হয়নি এবং সাহাবাদের থেকেও না। চার ইমামসহ নির্ভরযোগ্য কোনো আলেমও এসব কাজকে সমর্থন করেননি। কোনো মুহাদ্দিস এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ও সাহাবাদের থেকে কোনো সহিহ কিংবা জয়িফ হাদিসও বর্ণনা করেননি। তাবিয়ীদের থেকেও কোনো আছর পাওয়া যায়নি। পরবর্তী যুগে কেউ কেউ কিছু বানোয়াট ও জাল হাদিস বর্ণনা করেছে যেমন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিন সুরমা লাগাবে সে ব্যক্তি সে বছর থেকে চক্ষুপ্রদাহ রোগে আক্রান্ত হবে না’। ‘ যে ব্যক্তি আশুরার দিন গোসল করবে সে সেই বছর থেকে আর রোগাক্রান্ত হবে না। এরূপ অনেক হাদিস। এরই ধারাবাহিকতায় তারা একটি মওজু হাদিস বর্ণনা করেছে। যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালল্লামের প্রতি মিথ্যারোপ ব্যতীত আর কিছুই নয়। হাদিসটি হচ্ছে,

أَنَّهُ مَنْ وَسَّعَ عَلَى أَهْلِهِ يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَسَّعَ اللَّهُ عَلَيْهِ سَائِرَ السَّنَةِ

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আশুরার দিন নিজ পরিবারের উপর উদার হাতে খরচ করবে আল্লাহ তাআলা সারা বছরের জন্য তাকে সচ্ছলতা দান করবেন।

এ ধরণের সবগুলো বর্ণনা মিথ্যা ও জাল।

অতঃপর শায়খ উল্লেখ করেছেন – যার সার সংক্ষেপ হচ্ছে, এ উম্মতের অগ্রজদের উপর যখন সর্ব প্রথম ফেতনা আপতিত হল ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু’র শাহাদাত সঙ্ঘটিত হল। এর কারণে বিভিন্ন দলের লোকেরা কি করল? তিনি বলেন,

তারা যালেম ও জাহেলদের দলে রুপান্তরিত হল। হয়ত মুনাফিক বা বেদ্বীন নয়ত বিভ্রান্ত ও বিপথগামী। তারা হুসাইন রা. ও আহলে বাইতের বন্ধুত্ব প্রকাশ করতে লাগল। আশুরার দিনকে রোলবিল, কান্নাকাটি ও শোক দিবস হিসাবে গ্রহণ করল। তাতে তারা বুক ও চেহারা চাপড়ানো, আস্তিন ছেড়াসহ জাহেলি যুগের বিভিন্ন প্রথা প্রকাশ করতে লাগল। বিভিন্ন শোকগাথা যার অধিকাংশই বানোয়াট ও মিথ্যায় পরিপূর্ণ ও গীত আবৃত্তি করতে লাগল। এর ভেতর সত্যের কিছুই নেই আছে শুধু স্বজনপ্রীতি ও মনোকষ্টের নবায়ন। মুসলমানদের পরস্পরে যুদ্ধ ও দুশমনি সৃষ্টির পায়তারা। পূর্ববর্তী পূন্যাত্মা সাহাবিদের গালমন্দ করার উপাদান।

মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের অনিষ্টি ও ক্ষতির পরিসংখ্যান কেউ লিখে শেষ করতে পারবে না। তাদের মোকাবেলা করেছে হয়ত আহলে বাইত ও হুসাইন রা. -এর ব্যাপারে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত নাসেবি সম্প্রদায় অথবা একদল জাহেল সম্প্রদায়। যারা ফাসাদের মোকাবেলা করেছে ফাসাদ দিয়ে। মিথ্যার মোকাবেলা মিথ্যার মাধ্যমে, খারাপের জবাব দিয়েছে খারাপ দিয়ে এবং বিদআতের জবাব বিদআতের মাধ্যমে।

ইবনুল হাজ্জ রহ. বলেন, আশুরার বিদআতের আরো একটি হচ্ছে, এ দিনে যাকাত আদায় করা। বিলম্বিত কিংবা অগ্রীম। মুরগি জবাইর জন্য একে নির্ধারণ করা। নারীদের মেহেদি ব্যবহার করা। -আল-মাদখাল, ১ম খন্ড, অধ্যায়: ইয়াওমু আশুরা

আল্লাহ তাআলা আশুরাসহ ইসলামের যাবতীয় মৌলিক ও আনুসাঙ্গিক আমলে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সা. এর আদর্শের পূর্ণ অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএফ/