কেন নামায পড়া আমাদের একান্ত প্রয়োজন?

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

কেন নামায পড়া আমাদের একান্ত প্রয়োজন?

মুল: ড. সুহাইব হুসাইন; ভাষান্তর: কায়সার আহমেদ ৮:০১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০১৮

কেন নামায পড়া আমাদের একান্ত প্রয়োজন?

একটি দীর্ঘ ও কর্মব্যস্ত সময় কাটানো একজন ক্লান্ত ব্যক্তির জন্য জায়নামাযে দাঁড়িয়ে আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়া কতই না কঠিন। নরম ও আরমদায়ক বিছানায় শুয়ে থেকে মুয়াজ্জিনের “নামাযের দিকে এসো, কল্যানের দিকে এসো” ডাকে সাড়া দেয়া কতই না কঠিন।

বিখ্যাত দার্শনিক ইবনে সিনা একবার তার অতীতের স্মৃতিচারণ করতে লাগলেন। একদিন ভীষণ ঠান্ডা রাতে তিনি এবং তার গোলাম খোরাসানের একটি সরাইখানায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। রাতে তিনি খুব পিপাসা অনুভব করলেন, এবং গোলামকে ডাক দিয়ে পানি আনতে বলেন। এই আরমদায়ক বিছানা থেকে উঠে পানি আনতে গোলামের ইচ্ছে হল না, তাই সে ইবনে সিনার ডাক শুনতে পায়নি বলে ভান করে থাকলো। বেশ কয়েকবার ডাকাডাকি করলে সে অবশেষে বিছানা ছেড়ে উঠে মুনিবের জন্য পানি নিয়ে আসে। কিছুক্ষণ পর, আযানের মনোরম সুরেলা ধ্বনি বাতাসে গুঞ্জরিত হল। মুয়াযযিন আল্লাহর ইবাদাতের দিকে আহবান জানাচ্ছেন।

ইবনে সিনা মুয়াযযিনের কথা ভাবলেন। তিনি ভাবলেন, আমার গোলাম আবদুল্লাহ, সে সব সময় আমার শ্রদ্ধা ও সম্মান করে। আমাকে খুশি করার জন্য সুযোগ তালাশ করে, কিন্তু আজ রাতে সে আমার প্রয়োজনের চাইতে নিজ আরামের দিকে বেশি মনোযোগী হয়েছে। অন্যদিকে, এই পারস্য গোলাম, সে আরাম দায়ক উষ্ণ বিছানা ছেড়ে বের হয়েছে। বরফ শীতল ঠান্ডা পানি দিয়ে উযু করেছে, এবং মসজিদের উচু মিনারে উঠে তাঁর মালিক ও প্রভু আল্লাহর গুণকীর্তন করছে, তাঁর ইবাদাতের দিকে ডাকছে।

“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই।” “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল।”

রাতের ঘটনা ইবনে সিনা লিপিবদ্ধ করেন, “আজ রাতে আমি সত্য ভালোবাসা চিনতে পেরেছি, ওই ভালোবাসা যা সম্পূর্ণ আত্নসমর্পণ ও অনুগত্য থেকে তৈরি হয়। নিশ্চয়ই, আল্লাহকে ভালোবাসার দাবী হল সম্পূর্ণ ও নিঃশর্ত আনুগত্য।”

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ

(হে নবী! মানুষকে) বলে দাও, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবেসে থাক, তবে আমার অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।– (সূরা আলে-ইমরানঃ ৩১)

ব্যক্তির অহংকার ও গর্ব তাকে যুলুম ও অন্যায়ের দিকে ধাবিত করে। কখনো আত্নগৌরব ব্যক্তিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, ব্যক্তি নিজেকে ঈশ্বর মনে করে বসে। ফিরাউন, মিশরের শাসক সে ছিল এমন একজন ব্যক্তি, যে ঘোষণা করেছিল-

“আমিই তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিপালক” (সূরা নাযিআত- ২৪)

সে তার দৃষ্টিতে তার তথাকথিত মহত্ত্ব ও গর্বে অভিভূত হয়ে পড়ে। ফিরাউন বনী ইসরাইল জাতিকে বশ্যতাস্বীকারে বাধ্য করে এবং তাদের সুন্দর ও স্বাধীন জীবন দুর্দশাগ্রস্ত ও দুর্বিষহ করে তোলে।

কিন্তু, একজন ব্যক্তির অহংবোধ তাকে যতটা শক্তিশালী এবং মহান বলে তার নিকট উপস্থাপন করে সত্যিই কি সে ততটা মহৎ ও শক্তিশালী? পবিত্র কুর’আন আমাদেরকে মানুষের প্রকৃত বাস্তবতা সম্পর্কে জানাচ্ছে,

“আল্লাহ সেই সত্তা, যিনি তোমাদের সৃষ্টি (শুরু) করেছেন দুর্বল অবস্থা থেকে, দুর্বলতার পর তিনি দান করেন শক্তি, ফের শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন এবং তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।” (সূরা রূম- ৫৪)

প্রারম্ভেও মানুষ দুর্বল ও অক্ষম এবং সমাপ্তিতেও মানুষ দুর্বল ও অক্ষম- এটাই হল মানুষের পরিচয়। সে জন্মের সময় এত দুর্বল ও অসহায় থাকে যে, তার পুরো অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নির্ভর করে তার বাবা-মা ও পরিবারের উপর। যদি জন্মের প্রথম বছরগুলোতে সে পরিত্যাজ্য হয় তাহলে সে নিজ থেকে বেঁচে থাকতে পারবে না। শুধু বাল্যকালে নয়, শৈশব এবং কৈশোরকালেও তার একটি যত্নশীল, অমায়িক এবং ভালোবাসার হাতের প্রয়োজন।

একসময় শিশু যৌবনে উপনিত হয়, পরনির্ভরতা থেকে বের হয়ে আত্ননির্ভরশীল হয়। সে নিজ জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নিতে শিখে। সে তার শক্ত শরিরের দিকে তাকায়, সে গর্ব ভরে তাকায় তার সুন্দর দেহ কাঠামো এবং প্রতিভার দিকে। সে দুর্বল অক্ষম মানুষদের তুচ্ছজ্ঞান করে, এমনকি তারা পিতা-মাতা ও অভিভাবক যারা সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে তাকে লালন-পালন করেছে, তাদেরকেও অবজ্ঞা করতে শুরু করে।

সে অবিবেচক ও নিষ্ঠুর হয়ে উঠে, সে তার শক্তি ব্যবহার করে অন্যের উপর আধিপত্য কায়েম করে। সে মনে করে, সে এখন মনিব তাই যা ইচ্ছে তা করতে পারবে। কিন্তু, এই যৌবন, এই সুন্দর দেহ কাঠামো ও প্রাণশক্তি কি চিরদিন থাকবে? মাত্র কয়েক দশকেই সে তার কর্মশক্তি হারিয়ে ফেলবে। তার স্বাস্থ্যের চরম অবনতি হবে, ধীরে ধীরে তার মাথায় সাদা চুল স্থান করে নিবে, তার যৌবন বার্ধক্যের রূপ নিবে। যৌবনকাল থেকে বার্ধক্যে উপনিত হওয়ার প্রক্রিয়া যদিও খুব ধীরে ধীরে হয় এবং সময় লাগে তবুও বেঁচে থাকলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে বৃদ্ধ হতে হবে।

সময়ের কাঁটা টিক টিক করে নির্দয় ভাবে অবিরত চলতে থাকে, একসময় প্রত্যেক যুবককে বার্ধক্যে নিয়ে যায়। শক্তিশালী যুবক একসময় দুর্বল ও অক্ষম হয়ে যায়, যেমন সে জন্মকালীন সময়ে ছিল, কিন্তু এখন তার কাছে কোনো অভিভাবক বা পিতা মাতা নেই যারা তাকে সাহায্য করবে। মাঝে মাঝে এমনো হতে পারে তার পরিবার তাকে পরিত্যাগ করবে, কোনো ঘরের কোণে তার জীবন ও ভবিষ্যৎ আটকে থাকবে।

“প্রারম্ভেও মানুষ দুর্বল ও অক্ষম এবং সমাপ্তিতেও মানুষ দুর্বল ও অক্ষম।” কথা খুব স্পষ্ট; সত্যিকারের প্রভু হলেন আল্লাহ। তিনিই একমাত্র পরাক্রমশালী, তিনিই সবচেয়ে মহান।

একমাত্র তিনিই ক্লান্ত হন না, তাঁর কোনো আরামের প্রয়োজন হয় না, তিনি কারোর উপর নির্ভরশীল নন।

আল্লাহু আকবর- আল্লাহ সবচেয়ে মহান

যখন এই বার্তা মানুষের মনে স্পষ্ট ভাবে বুঝে আসে তখন সে উপলব্ধি করতে পারে যে, মহান আল্লাহ -যিনি তাঁকে সৃষ্টি করেছেন- তার নিকট বিনম্রতা প্রদর্শন করতে হবে। এবং বিনম্রতা ও সম্মান দেখানোর এর চেয়ে ভালো কী পদ্ধতি থাকতে পারে যে সে তার প্রভুর সামনে গোলামের মত দাঁড়াবে, তাঁর নিকট মাথা নত করবে এবং সম্পূর্ণ আত্নসমর্পণ করে সিজদায় লুটিয়ে পড়বে; হাত উঠিয়ে তাঁর প্রশংসা করবে।

নামাজ বান্দার উপর চাপিয়ে দেয়া কোনো বোঝা নয় বরং এটা হল প্রত্যেক অন্তর আত্মার ক্রন্ধন। যে হৃদয় আল্লাহকে চিনেছে সে হৃদয়ের কান্না। এটা হল আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতের জন্য তাঁর নিকট বান্দার খুব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, কেউ আমাদের সাহায্য করলে আমরা হাঁসি মুখে সাহায্যকারীকে ধন্যবাদ জানাই। তাহলে, মহান আল্লাহ যিনি আমাদের প্রত্যেক চাহিদা, আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেন তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব না?

তোমাদের চারপাশে আল্লাহর নিখুঁত ও নির্ভুল সৃষ্টি, সৃষ্টির সৌন্দর্য ও নেয়ামতের দিকে তাকাও এবং সিজদায় লুটিয়ে পড়ে মহান প্রতিপালকের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো!

এমএফ/

আরও পড়ুন...
নামাযে বিভিন্ন কথা মনে হয়? আপনার জন্য চার পরামর্শ
প্রস্রাবের পর পোশাকের পবিত্রতা নিয়ে সন্দেহ হলে যা করবেন

 

আমল / জীবন পাথেয়: আরও পড়ুন

আরও