মহিমান্বিত রজব মাস; করনীয় ও বর্জনীয়

ঢাকা, ২৪ আগস্ট, ২০১৯ | 2 0 1

মহিমান্বিত রজব মাস; করনীয় ও বর্জনীয়

মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ ৩:২৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৭, ২০১৮

মহিমান্বিত রজব মাস; করনীয় ও বর্জনীয়

মহিমান্বিত রজব মাসের প্রথম দিন আজ। হিজরি মাসগুলোর মধ্যে রজব মাস বিশেষ ও মহিমান্বিত একটি মাস। এ মাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এ মাস আল্লাহ প্রদত্ত চারটি সম্মানিত মাসের একটি। যে মাসগুলো ইসলামি পরিভাষায় ‘আশহুরে হুরুম’ হিসেবে প্রশিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ সা. এ মাসকে খুবই গুরুত্ব দিতেন। ফলে রজবের চাঁদ দেখা গেলেই তিনি কিছু বিশেষ আমল শুরু করতেন।

হাদিস শরিফে এসেছে, হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রজব মাস শুরু হতো, নবী করিম সা. তখন এ দু’আটি বেশী বেশী পড়তেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজাবা ওয়া শা’বান, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান।’ অর্থ : হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করুন এবং আমাদের রমজান মাস পর্যন্ত (হায়াত বৃদ্ধি করে) পৌঁছে দিন।’ (আল-মু’জামুল আওসাত, হাদিস : ৩৯৩৯)

রজবের প্রথম রাতে দু’আ কবুল হয় : রাসুলুল্লাহ সা. রজবের প্রথম রাতে দু’আ কবুল হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘পাঁচটি রাত এমন আছে, যেগুলোতে বান্দার দু’আ আল্লাহ তা’আলা ফিরিয়ে দেন না, অর্থাৎ অবশ্যই কবুল করেন। রাতগুলো হলো, জুমার রাত, রজবের প্রথম রাত, শা’বানের ১৫ তারিখের রাত, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার রাত।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৭৯২৭)

এ মাসে মুসলমানদের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে উম্মাহর জন্য অনেক শিক্ষা রয়েছে। এ মাসের ২৭তম রাত্রিতে রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় হাবিব রাসুলে কারিম সা.-কে এই জগৎ থেকে ঊর্ধ্বজগতে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন।

তবে ২৭ তম রাতে যে বিশেষ নামায পড়া হয়- সমাজে যা শবে মে’রাজের নামায হিসেবে প্রশিদ্ধ, তা বিদ’আত। কোন হাদিস থেকে এ নামায বা এ রাতের বিশেষ কোন আমল প্রমাণিত নয়।

এমনিভাবে মে’রাজের রাতপরবর্তী দিনে অর্থাৎ রজবের ২৭ তম দিনে রোযা রাখার অনেক ফযিলতের কথা প্রচলিত আছে। অনেকে এমনও বিশ্বাস করেন যে, এই একটি রোযার প্রতিদান এক হাজার রোযার সমান। এবং এ জন্য তাকে হাজারি রোযা বলেও অভিহিত করেন। অথচ এ রোযার ব্যাপারে সহিহ ও গ্রহণযোগ্য কোনো বর্ণনা নেই।

আল্লামা ইবনুল জাওজি, হাফেজ জাহাবি, তাহের পাটনি, আবদুল হাই লখনবি (রহ.) প্রমুখ প্রখ্যাত মুহাদ্দিস এ রোযার ফজিলতকে ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলেছেন।

রজব মাসে রোযা রাখার ভিন্ন কোনো ফযিলত নেই। তবে হ্যাঁ, এমনিতেই নফল রোযা রাখা অনেক ফযিলতপূর্ণ আমল। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. লিখেছেন, বিশেষভাবে রজব মাসে রোযার ফযিলত সম্পর্কে সহিহ ও আমলযোগ্য কোনো হাদিস নেই।

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেছেন, ‘রজবের রোযা ও নামাযের ব্যাপারে যেসব হাদিস উল্লেখ করা হয়, তার সবই মিথ্যা, অগ্রহণযোগ্য। সুতরাং তা বর্জনীয়।’

ইসলামী শরিয়তে রোযা রাখার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ দিনগুলো ছাড়া যেকোনো দিনই নফল রোযা রাখা যায়। এর অনেক ফযিলত রয়েছে। তবে রজবের বিশেষ রোযা হিসেবে ফজিলতপূর্ণ মনে করে রোযা রাখা সুন্নত নয়। বিশেষত, রজবের রোযাকে সুন্নত ও মুস্তাহাব মনে করে নফল রোযা রাখা ঠিক নয়।

তবে কয়েকটি হাদিসে আশহুরে হুরুম তথা সম্মানিত চার মাসে নফল রোযা রাখার নির্দেশ রয়েছে। সে হিসেবে রজব মাসও আশহুরে হুরুমের একটি মাস হওয়ায় এ মাসের যেকোনো দিন নফল রোযা রাখলে সওয়াব পাওয়া যাবে।

সালাতুর রাগায়েবও এ মাসের প্রচলিত বিদ’আতগুলোর একটি - যা এ মাসের প্রথম জুম’আয় বাদ মাগরিব সাত সালামের মাধ্যমে ১২ রাকাত নামায পড়া হয়।

ইমাম নববি রহ. এ নামায সম্বন্ধে বলেছেন তা নিকৃষ্ট পর্যায়ের বিদ’আত। ইমাম ইবনে আবিদিন, ইবনে তাইমিয়াহ ও ইবনে নুজাইম রহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ ফকিহ ও মুহাদ্দিসগণও এই নামাযকে বিদ’আত বলেছেন।

তবে ইমাম গাজ্জালি রহ. ও কূতুল কুলুব-এর লেখক আবু তালিব আল-মাক্কী এই নামাযকে মুস্তাহাব বলেছেন। ইমাম নববী রহ. তাদের সম্বন্ধে বলেন, যারা মুস্তাহাব হওয়ার কথা বলেছেন, তারা ভুল করেছেন। 

মোট কথা, শরিয়তের পক্ষ থেকে এ মাসের জন্য নির্ধারিত কোন বিশেষ নামায, রোযা ও বিশেষ পদ্ধতির কোনো আমলের হুকুম দেওয়া হয়নি। তাই সমাজে প্রচলিত মনগড়া ও বিদ’আত আমলগুলো করে এ মাসের ফযিলত ও বরকত লাভ করা যাবে না। রজব মাসের বরকত ও ফযিলত লাভের জন্য গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে এবং অন্য মাসে পালনীয় ফরয ইবাদতগুলো যথাযথরুপে পালন করতে হবে ও বেশি বেশি নফল ইবাদত করতে হবে।

তথ্য সূত্রঃ

রদ্দুল মুহতার : ২/৪৬৯-৭০, কিতাবুল মাওযুআত, লি-ইবনিল জাওযি : ২/২০৮, তালখিসুল মাওযুআত, পৃ. ২০৯, তাজকিরাতুল মাওযুআত, পৃ. ১১৬, আল-আসারুল মারুফাহ, পৃ. ৫৮, তাবইনুল আজার বিমা ওরাদা ফি ফজলি রজব, পৃ. ১১

এফএস/

 

আমল / জীবন পাথেয়: আরও পড়ুন

আরও