ধানের ভালো ফলনেও ন্যায্যমূল্য নিয়ে শঙ্কায় কৃষক

ঢাকা, শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯ | ২৪ কার্তিক ১৪২৬

ধানের ভালো ফলনেও ন্যায্যমূল্য নিয়ে শঙ্কায় কৃষক

শরীয়তপুর প্রতিনিধি ৩:৩৭ অপরাহ্ণ, মে ১২, ২০১৯

ধানের ভালো ফলনেও ন্যায্যমূল্য নিয়ে শঙ্কায় কৃষক

বোরো মৌসুমের শুরু থেকেই আবহাওয়া যথেষ্ট অনুকূলে থাকায় শরীয়তপুরে ধানের ভালো ফলন হয়েছে। তা সত্ত্বেও এলাকার কোনো কৃষকের মুখে হাসি নেই। ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষকরা এখন দিশেহারা।

এবার উৎপাদন খরচের চেয়েও দেড় থেকে দুইশ টাকা কমে প্রতিমণ ধান বিক্রি করছে কৃষকরা। এছাড়াও রয়েছে ধান কাটা শ্রমিকের অভাব।

কৃষকের পাকা ধান সময়মত তুলতে অতিরিক্ত মজুরি দিয়ে জেলার বাইরের শ্রমিক দিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে। তবে ধান আবাদে কৃষকদের লাভবান করতে উৎপাদন ব্যয় কমানোর কৌশল প্রয়োগসহ ধানের ন্যায্যমূল্য পেতে কৃষকদের ধান শুকিয়ে সংরক্ষণ করে একটু দেরিতে বিক্রির পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষি বিভাগ।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শরীয়তপুরে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ধান কাটা শুরু হয়েছে। জেলার প্রায় প্রত্যেক গ্রামে সোনালী ধানের মৌ মৌ গন্ধে ভরে উঠেছে কৃষকের বাড়িঘর। কৃষকরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজে। পাশাপাশি কৃষানীরাও বসে নেই। তারা মাড়াইয়ের কাজে যোগান দেয়াসহ ধান শুকানো ও সিদ্ধ করার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কৃষকরা তাদের আশানুরুপ ফলনও পেয়েছে। তারপরেও শরীয়তপুরের কোন কৃষকের মুখে হাসি নেই।

বোরো মৌশুমের শুরুতে চারা রোপণ, টিএসপি সার, পটাশ, ইউরিয়া দস্তা ও জৈবসার এবং কীটনাশক খরচ, সেচ খরচ, নিড়ানি খরচসহ মাড়াই ও পরিবহনে প্রতিমণ ধান উৎপাদন করতে কৃষকের খরচ হয়েছে প্রায় ৬শ থেকে সাড়ে ৭শ টাকা। জেলার বিভিন্ন ধানের বাজারে প্রকারভেদে ধানের বাজার দর রয়েছে সাড়ে ৫শ থেকে ৬শ টাকা মণ (৪০ কেজি)। কৃষকের প্রতিমণ ধান বিক্রি করতে গিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে দেড় থেকে ২শ টাকা পর্যন্ত।

তাই ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে লোকসানের ঝুঁকিতে আছেন কৃষকরা। তবে সরকারিভাবে ধান ক্রয় শুরু হলে লাভবান হওয়ার আশা করছেন তারা।

কিছু দিন আগেও শরীয়তপুরের বিভিন্ন হাটবাজারে প্রতিমণ ধান সাড়ে ৭শ থেকে ৮শ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কৃষকের ধান উঠতে শুরু করার পর দাম কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। অপর দিকে ধান কাটার জন্য স্থানীয় শ্রমিকের সংকট থাকায় খুলনা, পাবনা, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী ও জামালপুর জেলা থেকে অতিরিক্ত মজুরি দিয়ে শ্রমিক এনে ধান কাটাতে হচ্ছে কৃষকের।

শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ২৭ হাজার ৩৭৩ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে ২৭ হাজার ২১৫ হেক্টর জমিতে। এতে চাল উৎপাদন হবে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার ৩২৬ মে.টন।

আবাদকৃত ধানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের মধ্যে রয়েছে ব্রি-ধান- ২৯, ৫৮, ৬২, ৬৩ এবং ৬৪। হাইব্রিড জাতের এসএলএইচ-৮ এবং স্থানীয় জাতের ধানেরও আবাদ করেছেন কৃষক।

এবার বোরো মৌসুমের শুরু থেকেই আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় শরীয়তপুরে বোরোর ফলন গত মৌসুমের তুলনায় ভালো হয়েছে। জাতভেদে বিঘা প্রতি ২০-২৫ মণ ধান পাচ্ছেন কৃষকরা। জেলার কৃষকরা এখন বোরো ধান কেটে ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে স্থানীয় শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকরা কিছুটা ভোগান্তিতেও রয়েছেন।



কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আরো জানান, ধানের উৎপাদন ব্যয় কমাতে রোপণ মৌসুমে মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাগণ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের আওতায় ধান কাটার রিপার যন্ত্র ৩০% ভর্তুকি মূল্যে কৃষকদেরকে সরবরাহ করছে। যাতে করে ধানের উৎপাদন ব্যয় কমে আনুপাতিক হারে কৃষকরা বেশি লাভবান হয়।

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার একান্দল গ্রামের কৃষক শহীদুল ইসলাম দাদন রমজান আলী ও কুদ্দুস মিয়া বলেন, জমিতে ধানের ভালো ফলন দেখে আমরা বেশ খুশি হয়েছি। তবে বাজারে ধানের কম দাম থাকায় আমাদের উৎপাদন খরচ তুলতেই পারছি না। তার ওপর আবার শ্রমিক সংকট ও মজুরি বেশি। বোরো মৌশুমের শুরুতে চারা রোপণ, টিএসপি, সার, পটাশ, ইউরিয়া দস্তা ও জৈবসার এবং কীটনাশক খরচ, সেচ খরচ, নিড়ানি খরচসহ মাড়াই ও পরিবহনে প্রতিমণ ধান উৎপাদন করতে কৃষকের খরচ হয়েছে প্রায় ৭শ টাকা। বাজারে গিয়ে একমণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. রিফাতুল হোসাইন জানান, ধানের ভরা মৌসুমে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃষকদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কম দামে ধান কেনার প্রচেষ্টায় থাকেন। তাই ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের বিষয়ে ধান শুকিয়ে সংরক্ষণ করে একটু দেরিতে বিক্রি করলে এবং সরকারিভাবে ধান ক্রয় শুরু হলে কৃষকরা লাভবান হবেন।

তিনি বলেন, আবাদ মৌসুমে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদেরকে উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার, পরিমিত বীজ (১০ কেজি বীজে ১ একর জমি রোপণ) ব্যবহার, কীটনাশক ব্যয় কমাতে পার্চিং, লাইন সুইং পদ্ধতি প্রয়োগ, সেচ খরচ কমাতে সেচ ব্যবস্থাপনায় AWD (Alternative wet and drying system) ও সার খরচ কমাতে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করার পরামর্শসহ নানা প্রযুক্তি ব্যবহার প্রক্রিয়া ও কৌশল বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। যা ধানের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে কৃষকদেরকে লাভবান করতে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

এইচআর

 

কৃষি ও খাদ্য: আরও পড়ুন

আরও