মাছের অভাবে সংকটে চলনবিলের শুটকিশিল্প

ঢাকা, বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ৮ ফাল্গুন ১৪২৫

মাছের অভাবে সংকটে চলনবিলের শুটকিশিল্প

রিজভী জয়,পাবনা ৯:২১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৮, ২০১৯

মাছের অভাবে সংকটে চলনবিলের শুটকিশিল্প

দেশি মাছের সংকটে লোকসানে পড়েছেন চলনবিলের শুটকি ব্যবসায়ীরা। দখল-দূষণে বিলের উৎসমুখ ভরাট ও বিচরণক্ষেত্রের অভাবে কমেছে প্রাকৃতিক মাছ। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে দেশীয় প্রজাতির শুটকি মাছের বাজারেও।

দেশের বৃহত্তম চলনবিল একসময় পরিচিত ছিল উত্তরবঙ্গের মৎসভান্ডার নামে। বর্ষা মৌসুমে এ বিলে ধরা পড়া ট্যাংরা, বাইম, বাতাসি, লেটুকি, কই, শিং, বোয়াল, শোল, ভাঙন, বৌ, টাকি, শিংসহ নানা প্রজাতির মাছ একসময় স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে পাঠানো হতো কলকাতায়। এরপরও উদ্বৃত্ত থাকত মাছ। সে মাছের ওপর নির্ভর করেই বিলাঞ্চলে নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর, সিরাজগঞ্জের তাঁড়াশ আর পাবনার চাটমোহরে গড়ে ওঠে অসংখ্য শুটকি চাতাল।

মিঠা পানির দেশীয় প্রজাতির মাছের সুস্বাদু এসব শুটকি কিনতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন ক্রেতারা। পাইকারদের পাশাপাশি রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কের চাটমোহরের মান্নাননগর, তাড়াশের মহিষলুটি এলাকা থেকে শুটকি কিনে নিয়ে যান সৌখিন ক্রেতারাও।

শুটকি ব্যবসায়ীরা জানান, কাঁচামাছ প্রক্রিয়াজাতের পর চলনবিলের শুটকি সরবরাহ করা হয় রাজধানীসহ সারাদেশে। বছর কয়েক আগেও বাছাইকৃত মাছ রপ্তানি হয়েছে ভারত, ইন্দোনেশীয়া, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।

তবে সে সব গল্প এখন ঠাঁই পেয়েছে ইতিহাসের পাতায়। কাঁচা মাছের সংকটে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এ শিল্প এখন ধ্বংসের মুখে।

সরেজমিনে পাবনার চাটমোহর উপজেলার মান্নাননগর ও নাটোরের মহিষলুটি এলাকার বেশ কয়েকটি আড়ত ঘুরে দেখা  মাছের অভাবে বন্ধ হয়েছে অনেক শুঁটকি চাতাল। কোন মতে টিকে থাকা চাতালগুলোতে দৈনিক ৫০-৬০ মণ চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ২০ থেকে ৩০ মণ কাঁচা মাছ। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল শ্রমিকরা।

মহিষলুটি মাছের আড়তের পাশে শুটকির চাতাল দিয়েছেন সলঙ্গার সেকেন্দাসপুর গ্রামের দেলবার হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর শুটকির মৌসুমে চাতাল পাতি। ভাদ্র থেকে মাঘ ৬ মাছ চাতালে মাছ শুকাই। কিন্তু এ বছর চলনবিল এলাকায় বেশি মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যান্য বছর এসময়ে চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় তিন শতাধিক চাতালে মাছ শুকানোর কাজ চলতো। হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করতো। কিন্তু এ বছর হাতে গোনা কয়েকটি চাতালে চলছে মাছ শুকানোর কাজ।

দেলবার হোসেন আরো জানান, বর্তমান বাজারে প্রতি কেজি পুঁটি মাছ আকার ভেদে ৮০ থেকে দেড়শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য মাছ পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে।

শুটকির মৌসুমে চলনবিলের মহিষলুটি আড়তে গত ২০ বছর ধরে কাজ করেন আসমা বেগম। তিনি বলেন, প্রতি বছর ক্রমাগত বিলের মাছ কমে যাচ্ছে। এ বছর মাত্র সপ্তাহখানেক বিলে পানি ছিল। মাছের অভাবে বেশির ভাগ আড়তই বন্ধ হয়ে গেছে। আড়তে আড়তে ঘুরেও কাজ পাচ্ছি না। আমার মতো শত শত শ্রমিকই কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।

একসময় বছরের ৬ মাস জলে টইটুম্বুর চলনবিলে ভরা বর্ষায়ও এখন তেমন পানি থাকে না। সোঁতি, কারেন্ট, বাদাই জাল ব্যবহার আর জলসেচে মা মাছ নিধনে বিলুপ্ত হয়েছে দেশীয় প্রজাতির অধিকাংশ মাছ। মৎসবিভাগ অভয়াশ্রম ও মৎস আইন প্রয়োগে এসব মাছ সংরক্ষণে উদ্যোগের কথা বললেও, তা খুব বেশি কাজে আসেনি।

জেলা মৎস কর্মকতা আব্দুর রউফ বলেন, ‘অন্যান্য বছর চলনবিলের পানি ধীরগতিতে নিষ্কাশিত হলেও এ বছর কয়েক দিনের মধ্যে বিল থেকে পানি নেমে যাওয়ায় অন্যান্য বছরের মতো মাছ ধরা পড়েনি। তাছাড়া আশ্বিনের শেষে বৈরী আবহাওয়ার কারণে পানি দ্রুত নামলেও মাছ ধরতে পারেনি জেলেরা। ফলে মাছ শুটকি করাও সম্ভব হয়নি।’

তাছাড়া গত চার দশকে প্রকৃতির ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপে চলনবিলের প্রাণ প্রতিবেশ বিপন্ন হয়েছে। এ এলাকায় চাষ করা মাছের উৎপাদন বাড়লেও, অস্তিত্ব হারিয়েছে কমপক্ষে ৪০ প্রজাতির দেশীয় মাছ। অভয়াশ্রম ও মৎস আইন প্রয়োগের পাশাপাশি টেকসই ও বিজ্ঞাননির্ভর পরিকল্পনায় চলনবিলের প্রাণ ফেরানো গেলে এর সাথে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে। সেক্ষেত্রে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি।

এইচআর