শ্রীমঙ্গলে আমনে পচন, যাচ্ছে গরুর পেটে

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

শ্রীমঙ্গলে আমনে পচন, যাচ্ছে গরুর পেটে

এম ইদ্রিস আলী, মৌলভীবাজার ৪:২৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৮

শ্রীমঙ্গলে আমনে পচন, যাচ্ছে গরুর পেটে

ভাল নেই শ্রীমঙ্গলের আমন চাষীরা। আমনের ফসল ভাল হলেও অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে ফসলের। তাই কৃষকের আশার মুখে পড়েছে হতাশার ছাপ। কৃষি বিভাগের গাফিলাতি ও সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করে পরামর্শ না পাওয়ায় অনেক কৃষকের স্বপ্নের আমন ধান যাচ্ছে এখন গরুর পেটে।

গুটি স্বর্ণ, স্বর্ণমুসুরী, চিনিগুড়া, কালা বিরুন জাতের শত শত বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে।

যে সময় ধানের শীষ গাছে পরিপক্ষ হওয়ার কথা, সে মুহুর্তে কেটে বাজারে গবাদি পুশুর খাদ্য হিসাবে বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষকদের।

অথচ আর কয়টা দিন গেলেই স্বপ্নের ফসল পাকা ধান কৃষকের ঘরে তোলার কথা ছিল।

ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের অভিযোগ স্থানীয় কৃষি বিভাগের সঠিক পরামর্শ না পাওয়ার ফলে কৃষকদের  এই ক্ষতি হয়েছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় উপজেলার আশিদ্রোন খোশবাস এলাকার কৃষক মনফর মিয়া তার জমিনে ধান গাছের আগাছা পরিষ্কার করছেন।

এসময় তার ধান ক্ষেতের অবস্থা এ প্রতিবেদকে দেখিয়ে বলেন ‘বেমারে ধান পইচ্চা একবারে শেষ। আর ঔষধের লাগি গেলে, একটার লাগি গেলে আরেকটা দেয়। তারা কয় ওটা ভালা হটা ভালা। ওটায় কাজ করব। কিন্তু তারার কথায় ঔষধ আনিয়া আমরার কাজ অয় না। আমরার ধান মরিয়া ক্ষের অই যায়। আর লাল অইয়া ধান মাঝে মাঝে পইচ্চা ধানের অবস্থা শেষ।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা ক্ষেত গৃহস্থী কইরা খাই। খাইলে কিতা অইব আমরার তো ক্ষেতে লাভবান না। ওই দেখইন ধান যে মরছে। প্রতি গোছার মাছে, একছা বের হয়। বারইয়া অখল গোছি গাইল্লা মাইরা জেগাত বই থাকে। বাড়য় না।’

তিনি বলেন, ‘অখন ধান বাড় অইবার সময়। এখন তো বাড়ইতো নায়। এক ছা বাড় অইব। তিন গাছা ছোছা থাকব। আমরার বাঁচার তো উপায় নাই। এক গাছা বাড়য় তিনগাছা বাড়য় না। ধানও বেমারে লাগাল পাইছে। ধানও খালি ছোছা। ছোছার মাঝে একছা ভালা অইলে নকছা ছোছা।’

তিনি বলেন, ‘আমার ১০ কের জায়গা ক্ষেত আছে। এমলা আমার ৪ কের জাগাত। কৃষি অফিসারের লগে আমরার দেখা অয় কিন্তুক জমিনও এক দিনও আইছে না। কোনও পরামর্শও দিছে না।’

মনফর মিয়া আরো বলেন, ‘’আমি অনেক টাকা ঋণ করে ১২ কেয়ার (৩০ শতাংশে এক কেয়ার) আমন ফসল করছি। সময় মত বিষ ও সার দিছি। তারপরও ৪ থেকে ৫ কেয়ার জমির ফসল লাল হয়ে পচে মরে যাচ্ছে। চলতি শীত মৌসুমে এই ধান কাটার কথা ছিল।’

একই  গ্রামের কৃষক মো. মোস্তফা মিয়া জানান, ‘আমি ৭ কেয়ার জমিতে আমন ধান রোপন করি। এরই মধ্যে  আমার ৩/৪ কেয়ার জমিতে আমন ফসল লাল হয়ে পচন ধরে মরে যাচ্ছে। এই ফসল আর হবে না। তাই এখন গরুকে কেটে খাওয়াচ্ছি।’ 

শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের ভাড়াউড়া গ্রামের কৃষক ইউছুব মিয়া, ছদর মিয়া ও রিয়াজ মিয়া জানান, তাদের জমিতে ধানের থোড়ে দুধ শুকিয়ে শীষ গুলো সাদা হয়ে যাচ্ছে। সেকারণে আমনের আশানুরুপ ফল পাবেন না তারা।

আশিদ্রোন খোশবাস এলাকার কৃষক আব্দুল কাদির, ফারুক মিয়া ও মোস্তফা মিয়ার সাথে কথা হলে তারা জানান, এবারে ফসলের ফলন দেখে প্রথমে বুকটা ভরে গেয়েছিল। পরে ধানের পাতা লালচে হয়ে ধান গাছের গোছা আর বৃদ্দি পাচ্ছে না। মাঝে মধ্যে ধানের থোড় বেরুচ্ছে।

কিন্তু অজ্ঞাত রোগে কয়েকবার স্প্রে করেও ধান ক্ষেত রক্ষা করতে পারছেন না তারা।

এ চিত্র শুধু আশিদ্রোণ ও পশ্চিম ভাড়াউড়া নয় এটি উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নের আলীসারকুল, লইয়ারকুল, ভুনবীর, কালাপুর ইউনিয়নের লামুয়া, সিন্দুর খান ইউনিয়নের লাহার পুর, ভূজপুরসহ মির্জাপুর ইউনিয়নের বেশ কিছু ফসলি জমিতে এ অবস্থা বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াসমিন মোনালিসা সুইটি তার লিখিত বক্তব্য বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ১৫ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদ হয়েছে। ফসলের সার্বিক অবস্থা ভাল। তবে ২/৩ টি জমির প্লট কৃষকের সুষম সার ব্যবহার না করা এবং সময়মত আগাছা পরিস্কার না করায় ধান গাছ হালকা হলুদ হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘গত ২ দিনের বৃষ্টিতে এটা ৩/৪ দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। এছাড়া স্থানীয় জাতে বিজাত থাকায় কিছু ধান আগে ও কিছু ধান পরে বের হয়েছে।’ 

তিনি বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে আমার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়োজিত রয়েছে। তারা কৃষকদের মাঝে পরামর্শ অব্যাহত রেখেছেন।’ 

এমএআই/এফএম