কীটনাশকেও রক্ষা করা যাচ্ছে না আমনের ফসল(ভিডিও)

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

কীটনাশকেও রক্ষা করা যাচ্ছে না আমনের ফসল(ভিডিও)

এম ইদ্রিস আলী, মৌলভীবাজার ৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৩১, ২০১৮

গাছে বার বার নানা প্রকারের কীটনাশক ওষুধ প্রয়োগ করেও আমন ফসল রক্ষা করতে পারছেন না শ্রীমঙ্গল উপজেলার খেটে-খাওয়া কৃষকেরা। তাদের অভিযোগ উপজেলা কৃষি অফিসের মাঠকর্মী ও দায়িত্বশীলদের সঠিক সময়ে পরামর্শ না পাওয়ায় তাদের এই স্বপ্নবোনা ফসল চোখের সামনেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

তবে কৃষকদের এই অভিযোগের বিপরীতে কৃষি অফিসের দায়িত্বশীলরা বলছেন, যৎসামান্য জমিতে রোগাক্রান্ত হয়েছে। কৃষকদের বার বার পরামর্শ দেওয়া সত্ত্বেও ইন্ডিয়ান ভেরাইটিজ জাতের বীজ বপন করায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে।

আমন ফসলে এই  অবস্থা  শুধু পশ্চিম ভাড়াউড়া, নোয়াগাঁও, ইছবপুর, উত্তসুর, উত্তর উত্তসুর, দক্ষিণ ভাড়াউড়া গ্রামেই নয় উপজেলার রামনগর, জামসী, আলীসারকুল, ভূনবীর, লইয়ারকুল, পাত্রীকুল, লাহারপুর, ষাড়েরগঞ্জ, মির্জাপুর, শহরশ্রী, হুগলীয়া, ভৈরবগঞ্জ, কালাপুর, লামুয়া, সিরাজনগর, এলাকার বিভিন্ন গ্রামের শত শত একর আমন ফসলে আক্রান্ত হয়েছে।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় ১৫ হাজার ১১০ হেক্টর আবাদি জমিতে আমন ধান চাষ করা হয়েছে। ফলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমিতে। কিন্তু ধানক্ষেতে গোড়া পচা, পাতার কান্ড লাল, বাদামী, হলদে বর্ণ হয়ে শীষ রোগে আক্রান্ত হয়ে অর্ধেকেরও বেশি জমির ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের পশ্চিম ভাড়াউড়া গ্রামের আমন ফসলের ক্ষেত ঘুরে পথে দেখা হয় ওই গ্রামেরই কৃষক ইউছুব আলীর সঙ্গে।

তিনি বলেন, আমনের ফসল সাড়ে ৮ কেয়ার( প্রতি ৩০ শতাংশে এক কেয়ার) জমিতে ৪৯ ধান রোপন করি। আমার সব ধান হলদে বর্ণ ধারণ করেছে। এসব ধান যে নষ্ট হচ্ছে পরামর্শ নেয়ার জন্য কোনো কৃষি অফিসার খুঁজে পাই না।’

একই গ্রামের কৃষক মঈনুল মিয়া বলেন, ইবার আমনের ২৬ কেয়ার জায়গা করছিলাম, ৪৯, রঞ্জিত ও চিনিগুড়া। সব ধানে বেমার আইছে, হলদে বর্ণ ধারণ করে ধান গাছ মরে যাচ্ছে। ৫ হাজার ৭০০ টাকা খরচ করে তিনবার ওষুধ দিয়েছি। সিতারা, নাইট্রো ও বাগানি(চা বাগানে ব্যবহৃত চোরাই) ওষুধ। এর কোনো ফল পাইনি।’

একই গ্রামের কৃষক আল আমিন বলেন, ৬ কেয়ার জমিতে রঞ্জিত, ৪৯ ও বিরুন ধান রোপণ করেছিলাম। রোগ দেখা দিয়ে সব গাছ লাল হয়ে মরে যাচ্ছে। দুই/তিন বার ওষুধ দিয়ে কোনো ফল পাইনি।

কৃষক সাইদুল মিয়া বলেন, ধামার ১৮ কেয়ার জমিতে একই রোগে আক্রমণ করেছে। আমি রঞ্জিত, ৪৯, চিনিগুড়া ফসল লাগিয়েছি। এখন সব নষ্ট হয়ে গেছে।

একই গ্রামের কৃষক জুনাব আলী ২ কেয়ার, ইয়াদ আলীর ৬ কেয়ার জমির ফসলেরও একই অবস্থা।

এই গ্রামের কৃষক ছদর মিয়া বলেন, প্রায় ৬০/৭০ হাজার টাকা খরচ করে ২০ কেয়ার জমিতে আমন ধান রোপণ করেছিলাম। এখন সব ধানেই হলুদ, লাল বর্ণ হয়ে গেছে। কৃষি অফিসের লোকজন না পেয়ে নিজেরাই পায়রাগুল, নাইট্রো ও বাগানি ওষুধ প্রয়োগ করেও কোনো ফল পাইনি।

কৃষক দিলু মিয়া বলেন, সাড়ে তিন কেয়ার আমন ধানের জমি লাল হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। গত বৈশাখ মাসেও মড়কে বোরো ধানের সব ফসল নষ্ট করি গেছে।

কৃষি অফিসের লোকজনের বক্তব্যর দ্বিমত পোষণ করে বলেন, আমরা যদি ক্ষেতে সঠিক সময়ে রোপণ না করি,তাহলে ফসলের জন্য এতো টাকা কেন ব্যয় করি। না জাইন্যা(জেনে) না আইস্যা(এসে) তারা (অফিসে বসে) ব্যক্তিগত কথা কয়। কৃষক ফুরকান মিয়া বলেন, আমি ৪ কেয়ার জমিতে রঞ্জিত ধান রোপণ করেছিলাম। এখন সব ধান হলদে হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষি অফিসের মাঠকর্মী না এসেই বলছে,সময়মতো ফসল লাগাইছি না। চারা বেশী বয়সে ফসল লাগাইছি। তারা না এসেই এসব মনগড়া কথা বলছে।

কৃষক হাফিজ আলী বলেন, পশ্চিম ভাড়া উড়া গ্রামের ননপুর বন্দে ৮ কেয়ার জমির মধ্যে ২ কেয়ারের ধান অবশিষ্ট আছে। বাকি ধান সব লাল হই গেছে। দুইবার ওষুধ নাইট্রো দিয়ে কাজ হয় নাই।’

কৃষক ফুরকান আলী বলেন, তখন সময়ে বোরো ধানের গাছে প্রথমে থোড়ের মাথায়, এরপর মধ্যখানে, এরপর গাছের গোড়ায় রোগাক্রান্ত হয়ে ধান গাছে মোড়ক আসে। যেখানে মরে সেইস্থান কালো হয়ে যায়। পরে এসব মোড়ক লাগা ফসল গরু-মহিষও খায়নি।

এদিকে সিন্দুরখান ইউনিয়নের পূর্ব লাহার গ্রামের জমির মিয়া ২ বিঘা জমিতে ইন্ডিয়ান আসামি জাতের ধান চাষ করেন। ধানের চারায় লালচে দাগ ও পাতায় ছিদ্র রোগ দেখা দিয়েছে। একই অবস্থার শিকার পূর্ব জামসী গ্রামের শুসেন কর, তেলিআব্দা গ্রামের এনামুল হক, আশিদ্রোণ ইউনিয়নের ভূজপুর গ্রামের আলম মিয়া, একই গ্রামের মামুন মিয়া। তাদের ক্ষেতেও ধান গাছের গোড়ায় একই সমস্যা।

এছাড়াও একই গ্রামের সেলিম মিয়া ৩ বিঘা জমি ও জামসী দেবীপুর গ্রামের কৃষক আল আমিনর ৫ বিঘা জমিতেও ধান গাছের গোড়ায় পচন রোগ দেখা দিয়েছে। 

একই সমস্যায় পড়েছেন উদনারপার গ্রামের সুমন মিয়া। তিনি ৮ বিঘা জমিতে স্বর্ণমুসুরী ফলন লাগিয়েছেন। পূর্ব লাহারপুর গ্রামের জাকির মিয়ার ৪ বিঘা জমিতে আসামী ও ১০ জাতের ধান, ভূজপুর গ্রামের কৃষক শরীফ খান ২ বিঘা জমিতে স্বর্ণমুসুরী ফলন করেন। সিক্কা গ্রামের হিরণ মিয়া তিনি ৩২ জাতের ধান করেন। তার জমিতে ধানে লালচে দাগ হয়ে চারা মরে যাচ্ছে। জামসী গ্রামের কুদ্দুস মিয়া ১১ জাতের ধান বপন করেন। তার সমস্যাও একই রকমের।

এই কৃষকদের অভিযোগ, এসব রোগের প্রতিকারের জন্য কৃষি বিভাগের কোনো পরামর্শ বা মাঠকর্মীদের তারা পাননি।

শ্রীমঙ্গল কৃষি অফিসের ইছবপুর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রথীন্দ্র দেব বলেন, আমন ফসলে বর্তমানে কিছু জমিতে ব্লাস্টের আক্রমণ দেখা দিয়েছে। যার পরিমাণ ৪/৫ কেয়ার হবে। কৃষকদের ইন্ডিয়ান ভেরাইটিজ চাষ করায় ভাইরাসজনিত কারণে একটা জমিতে আক্রান্ত হলে বাতাসের মাধ্যমে পাশের সমস্ত জমিতে আক্রান্ত হয়। কৃষকদের বলার পরও ইন্ডিয়ান ভেরাইটিজ তারা চাষ করছেন।

তিনি বলেন, মাটির সমস্যাও আছে পরীক্ষা করার জন্য নমুনা সংগ্রহ করছি, ল্যাবে টেস্টের জন্য। এমনিতেই আবহাওয়া ভালো না। দিনে গরম রাতে ঠান্ডা। আবহাওয়াগত কারণে রোগপোকার আক্রমণও বেড়ে যায়।

উত্তরসুর  ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শংকর কান্তি দাশ বলেন, জমির মাটির সমস্যায় কিছু ধান গাছে লাল হয়ে গোড়াপচা রোগ ধরছে। এসব জমিতে পানি পায় নাই রীতিমতো। রোগাক্রান্ত যেগুলো ইন্ডিয়ান ভেরাইটিজ ধান। ২/৩ কেয়ার জমি নষ্ট হইছে।’

রামনগর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অরুণ কুমার গোস্বামী কিছু জমিতে স্বর্ণা ধানে খুল পচা পাঙ্গাল ডিজিজ দেখা দিয়েছিল। দমন হয়েছে।

আলীসারকুল ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রণব চৌধুরী বলেন, ৮/১০ কেয়ার জমিতে বীজবাহিত রোগ স্বর্ণামসুরী, ইন্ডিয়ান রঞ্জিত ভেরাইটিজ আবাদ করায় ৮/১০ কেয়ার জমিতে রোগে আক্রমণ করে। নিষেধ করা সত্বেও বেশি ফলনের আশায় কৃষকরা ৩০/৪০ কেয়ার জমিতে ফসল আবাদ করেন।

জানতে চাইলে শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াসমিন মোনালিসা সুইটি বলেন, গত দুইদিন থেকে বৃষ্টি হয়েছে। এতে কৃষকরা লাভবান হবে। যাদের জমিতে পানি জমে গেছে, আগে আগাছা পরিষ্কার করেননি। তারা যেন হাত দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করেন। আর যাদের জমিতে থোড় চলে এসেছে তাদের পরিষ্কার করা প্রয়োজন নেই। তারা প্রতি কেয়ারে ৫ কেজি ইউরিয়া ও পটাশ দিয়ে দিলেই ফলন ভাল হবে। তবে ব্লাস্ট রোগের লক্ষণ কোথাও পাওয়া যায় তাহলে তাদের বলব ওই মুহূর্তে দোপাক ও নাইট্রো স্প্রে করতে। এর ১০ দিন পর আবার স্প্রে করতে। তারপরও যদি এ রোগ না সারে তাহলে স্থানীয় উপ-সহকারী কর্মকর্তা বা কৃষি অফিসে এসে যোগাযোগ করতে।

আইএ/বিএইচ/