ইন্টারনেট ব্যবহার করে নারীদের সবজি বিপ্লব

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৯ আশ্বিন ১৪২৫

ইন্টারনেট ব্যবহার করে নারীদের সবজি বিপ্লব

ইব্রাহিম খলিল, সাতক্ষীরা ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৮

ইন্টারনেট ব্যবহার করে নারীদের সবজি বিপ্লব

জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর উপজেলার নারীরা স্মার্ট ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করে গুগলের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে সবজি চাষে সফলতা পাচ্ছেন। নোনা এলাকায় বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ বিষমুক্ত সবজি চাষ করে পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আয় করছেন বাড়তি অর্থ।

কম খরচে বাড়ির পাশের পতিত জমিতে চাষ করে লাভবান হওয়ায় দিনে দিনে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এ পদ্ধতি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অর্থনীতিতে আরও অবদান রাখতে পারবেন এ অঞ্চলের নারীরা।

জানা যায়, ২০০৯ সালের প্রলয়ঙ্করী আইলার প্রবল জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় জেলা শ্যামনগরে নোনা পানির জন্য চাষাবাদ হুমকির মুখে পড়ে। হতাশার কালো মেঘ ভর করে এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে।

পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ার মোনাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে, অক্সফ্যামের সহযোগিতায় সুশীলন রি-কল প্রকল্প নারীদের নিয়ে কাজ শুরু করে।

এ প্রকল্পের মাধ্যমে শ্যামনগর উপজেলার বড়কুপট গ্রামে ১০০ জন নারী কৃষাণীকে স্মার্ট ফোন বিতরণ, ফোন ব্যবহারের উপর প্রশিক্ষণ প্রদান, ফেইজ বুক আইডি খুলে দেওয়া, মোবাইলে মেগাবাইট সরবারহ করা, ফোনের মাধ্যমে উপজেলা কৃষি অফিস, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার ও প্রতীক কল সেন্টার, প্রতীক এসএমএস ও প্রতীক ভয়েস এসএমএস’র মাধ্যমে কৃষি তথ্য সংগ্রহ করে সবজি চাষ করা বিষয়ে ব্যবহার করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এ অঞ্চলের নারীরা।

জেলার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের বড়কুপট গ্রামের লবণাক্ততার কারণে এক সময় শাক-সবজি চাষ করতে পারতেন না চাষীরা। চাষ করতে না পারায় পতিত থাকত বেশির ভাগ জমি।

বর্তমানে এসব এলাকায় স্মার্ট ফোনে তথ্যপ্রাপ্তির জন্য কমিউনিটিভিত্তিক নারীদের কৃষি সার্ভিস সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে। তারা টাওয়ার বা থ্রি-ডি পদ্ধতি, বস্তাপদ্ধতি (বস্তার মধ্যে মাটি ও জৈব সার মিশিয়ে বস্তার ভেতরে সবজি চাষ), ১.৫ ফুট মাটির নীচে পলিথিন বিছিয়ে জৈব সার প্রয়োগের মাধ্যমে সবজি চাষ, লবণ পানির এলাকায় মাটিতে গর্ত করে পলিথিন ও ত্রিপল বিছিয়ে মিষ্টি পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সবজি চাষ, বাগদা রেনু বহনকারী কর্কসিটে জৈব সার ও মাটি ভরাট করে সবজি চাষ শুরু করে সফলতা পাচ্ছে।

এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীরা বাড়ির পাশে পতিত জমিতে ওলকপি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, বীটকপি, টমেটো, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, লালশাক, পালংশাক, মুলা, গাজর, পুঁইশাক, কচুরমুখী, লাউ, চালকুমড়া, গোলআলু, ঝিঙ্গা, ডাটাশাক, শিম, বরবটি, ঢেঁড়স, তরুল, পেঁয়াজ, রসুন, ওল, কচু, চিচিঙ্গা ও মরিচসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করছে।

এসব সবজিতে আলুর ধ্বসা রোগ, বেগুনের ডগা ছিদ্র কারী পোকার আক্রমণ, টমেটোর নাভি ধ্বসা রোগ, শিম, মরিচ, বরবটি গাছের জাব পোকার আক্রমণ, লালশাক, পালংশাক, মরিচ গাছ, টমেটো গাছের ছত্রাকে আক্রমণ বা মাজা পঁচা রোগের আক্রমণসহ সবজির বিভিন্ন প্রকার রোগ দেখা দিলে প্রতিকারের জন্য স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে গুগোল অ্যাপস বা প্রতীক কল সেন্টার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা প্রয়োগ করে লবণাক্ত এলাকাতে পূর্বের তুলনায় ৪-৫ গুণ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে।

বর্তমানে এ অঞ্চলের নারীরা সংসারের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি বাড়ির নিকটের পতিত জমিতে সবিজ চাষ করে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রয় করে বাড়তি অর্থ আয় করছে।

শ্যামনগরের কৃষানি মমতাজ বেগম বলেন, মোবাইলে প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা সফলতা পেয়েছি। যেকোন সমস্যা আমরা অ্যাপস’র মাধ্যমে সমাধান পেয়ে থাকি। আমরা বিষমুক্ত শাক সবজি চাষাবাদ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছি। সরকারিভাবে যদি আরও সহযোগিতা পাওয়া যায় তাহলে আমরা লবণাক্ত এলাকায় কৃষি বিপ্লব ঘটাতে পারবো।

সুশীলনের প্রোগ্রাম অফিসার তাপস কুমার মিত্র বলেন, আইলার পরে নোনা জলে যখন ফসল ফলাতে না পেরে কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়েন তখন থেকে তারা কৃষি উন্নয়নে কাজ শুরু করেছেন। বর্তমানে এ অঞ্চলের প্রযুক্তি ব্যবহারে ফলে কৃষির ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তারা নিজেদের পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করেও বাড়তি টাকা আয় করতে সক্ষম হচ্ছের।

সাতক্ষীরার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আব্দুল মান্নান বলেন, এ অঞ্চলের কৃষক-কৃষাণীরা স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে শাক-সবজি চাষ করছের। এর মাধ্যমে সহজেই তারা প্রযুক্তিগুলো পাচ্ছে। সেগুলো মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ করছের।

তিনি বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কয়েকটি জনপ্রিয় অ্যাপস রয়েছে সেগুলো কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছি। মাঠ পর্যায়েও এই অ্যাপসগুলোর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই সাতক্ষীরা কৃষকরা এই অ্যাপস ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করবে।

আইকে/এসবি