নিজের গড়া সেনা ক্যু’তেই পতন বশিরের

ঢাকা, ১৬ মে, ২০১৯ | 2 0 1

নিজের গড়া সেনা ক্যু’তেই পতন বশিরের

পরিবর্তন ডেস্ক ৯:৩১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০১৯

নিজের গড়া সেনা ক্যু’তেই পতন বশিরের

অন্যের জন্য কূপ খনন করলে, এক সময় তাতে নিজেই পড়তে হয়। নির্মম এই সত্য বৃহস্পতিবার ঘটল সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের ভাগ্যে।

যে সেনাঅভ্যুত্থানে দেশের ক্ষমতাভার পেয়েছিলেন, ৩০ বছর পর সেই সেনাবাহিনীই বশিরকে গদিচ্যুত করল। ১৯৮৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাসীন হন বশির।

আর ১১ এপ্রিল একই পরিস্থিতির মধ্যে তাকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হলো। এর মধ্যদিয়ে আফ্রিকার দেশটি ৩০ বছরের স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্ত হলো।

বৃহস্পতিবার দিনভর নানা নাটকীয়তা শেষে সুদানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আওয়াদ মোহাম্মেদ আহমেদ ইবনে আউফ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করার কথা ঘোষণা করেন, ‘ওমর আল-বশিরকে তার কার্যালয় থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।’

সুদানের এই প্রথম ভাইস-প্রেসিডেন্ট বলেন, প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের পর থেকে সেনাবাহিনী ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ হিসেবে ২ বছর দেশটি পরিচালনা করবে।

তিনি বলেন, সেনাবাহিনী সুদানে ৩ মাসের জরুরি অবস্থা জারি করেছে। ২০০৫ সালের সংবিধান বাতিল এবং রাষ্ট্রপতির শাসন, সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ৭৫ বছর বয়সী বশিরকে ‘নিরাপদ জায়গায়’ বন্দি করে রাখা হয়েছে এবং সেনা পরিষদ দেশ পরিচালনার কাজ শুরু করেছে।

ওমর আল-বশিরের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওয়ারেন্ট রয়েছে। ২০০৩ সালে সুদানের দারফুরে সরকারি মদদে ‘গণহত্যা’ চালানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই অভিযানে ৩ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়।

ওমর আল-বশির ১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি উত্তর সুদানের হাউস বাংলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এটি সিন্ধি প্রদেশের নিকটে।

১৯৮৯ সালের জুনে, ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সাদিক আল-মাহাদীর নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা নেন ওমর আল-বশির।

এই অভ্যুত্থানে তাকে সমর্থন দেন দেশটির জনপ্রিয় ইসলামপন্থী রাজনীতিক হাসান আল-তুরাবি। কিন্তু, ১৯৯০ সালের মাঝামাঝি বশিরকে দেয়া সমর্থন তুলে নেন তিনি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে হাসান তুরাবিকে একাধিকবার কারাগারে পাঠান বশির।

বশিরের বিরুদ্ধে হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক এই আদালত তার বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফের বিজয়ী হওয়ার পরপরই ওয়ারেন্ট জারি করে।

২০০৩ সাল থেকে সুদানের পশ্চিমাঞ্চল দারফুরে সংঘাত চলছে। সেখানে বশির সরকারের সেনাবাহিনীর অভিযানে গণহত্যা চালানো হয়।

২০১১ সালে দক্ষিণ সুদানে ওমর আল-বশির গণভোটের আয়োজন করেন। ওই ভোটে জনতা স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেন।

ওই বছরের জানুয়ারিতে ‘আরব বসন্তের’ ধাক্কা লাগে বশিরের সরকারের শরীরেও। জ্বালানীর দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া তুমুল জনপ্রিয় ওই বিক্ষোভে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন তিনি। ২০১৩ সালেও একই অবস্থা হয়েছিল, ঠিক একই কারণে যেমনটি চলতি মাসের শুরুতে সুদানে গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছে।

২০১৩ সালের গণবিক্ষোভ দমনে সরকারি বাহিনী চড়াও হলে বহু মানুষ নিহত ও শতাধিক আহত হন। তবে, শেষ পর্যন্ত সরকার বিক্ষোভ দমাতে সক্ষম হয়।

এরপর ২০১৮ সালের শেষদিকে অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে সুদানে ফের গণবিক্ষোভ শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে সেই বিক্ষোভ থেকে ওমর আল-বশিরের পদত্যাগ দাবিটিই মুখ্য হয়ে দেখা দেয়।

সুদানের কর্তৃপক্ষ বলেছে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত বহু আন্দোলনকারী নিহত হয়েছেন। দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের দাবি, অন্তত ৫০ বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়েছে।

দাবির মুখে ওমর আল-বশির চলতি বছরের শুরুতে জরুরিভাবে দেশটির অর্থনৈতিক সংস্কারের ঘোষণা দেন। কিন্তু, তার এই আশ্বাসে সাড়া মেলেনি। বিরোধীরা তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।

এরই মধ্যে গত ৬ এপ্রিল হাজারো বিক্ষোভকারী রাজধানী খার্তুমে সেনা সদরদফতরের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।

সেখান থেকে বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তা বাহিনী সরাতে গেলে সংঘর্ষ হয়। পরে সেনাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের পক্ষে অবস্থান নেয়। ওই সংঘর্ষে বুধবার পর্যন্ত ২২ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ৬ সেনা সদস্য ছিলেন।

নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনী ওমর আল-বশিরকে প্রেসিডেন্ট থেকে সরিয়ে দেয়। পরে তাকে গৃহবন্দি করার কথা জানোনো হয়েছে।

ওমর আল-বশিরকে গৃহবন্দি করা ছাড়াও তার ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির শতাধিক নেতাকর্মীকেও আটক করেছে সেনাগোয়েন্দা সংস্থা।

এদের মধ্যে দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদেল রহিম মোহাম্মদ হোসেন, সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট আলী ওসমান ত্বহা এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রধান আহমেদ হারুনের মতো নেতারাও রয়েছেন।

আইএম

আরও পড়ুন...
৩০ বছর পর সেনা হস্তক্ষেপে গদিচ্যুত বশির
গদিচ্যুত বশির গৃহবন্দি, বহু নেতা আটক
কী আছে সুদান সেনাবাহিনীর ‘সেই’ ঘোষণায়?

 

আফ্রিকা: আরও পড়ুন

আরও