মিসরে চার বছরে রহস্যজনক নিখোঁজ ১৫০০

ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫

মিসরে চার বছরে রহস্যজনক নিখোঁজ ১৫০০

পরিবর্তন ডেস্ক ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৮

মিসরে চার বছরে রহস্যজনক নিখোঁজ ১৫০০

মিসরের একটি মানবাধিকার সংগঠন দাবি করছে, দেশটিতে গত চার বছরে কমপক্ষে দেড় হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছে বলে তাদের কাছে দলিলপত্র রয়েছে। তবে আসল সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি হবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির কর্মকর্তারা।

সংগঠনটি বলছে, সরকারবিরোধী বলে সন্দেহ করা হয়, এমন যে কেউ এখন মিসরে ঝুঁকির মুখে। সে সন্দেহ সঠিক না বেঠিক তা বিবেচনা করা হয় না। এসব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু যারা হন, তাদের অনেকেই ইসলামপন্থী। সন্দেহভাজনদের আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুদেরও গ্রেফতার হবার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।

মানবাধিকার কর্মী মোহাম্মদ লতিফের ভাষায়, ‘প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল সিসির শাসনের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব রহস্যজনক গুম।’

মানবাধিকার কর্মীরা বলেন, এইসব নিখোঁজ লোক যখন কয়েক সপ্তাহ বা মাস পরে আবার আবির্ভূত হন, তার আগে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয় এবং খুবই অত্যাচার করা হয়।

এমনই এক নিখোঁজ নিরীহ জুবাইদার গল্প বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে-
মিসরের রাজধানী কায়রোর হাসপাতালে মানসিক বিপর্যয়ের কারণে চিকিৎসাধীন ছিলেন ২৩ বছরের জুবেইদা। তার ছোট ভাই তাকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবার জন্য জন্য রওনা হলেন। পথেই একটি ওষুধের দোকান পেয়ে জুবাইদাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে তার জন্য ওষুধ কিনতে ঢুকলেন তার ভাই।

কয়েক মিনিট পর তার ভাই বেরিয়ে এসে দেখলেন জুবাইদা নেই। সেদিন এপ্রিলের ৮ তারিখ, ২০১৭ সাল। জুবাইদাকে এরপর থেকে আর দেখা যায়নি। মিসরের অসংখ্য 'নিখোঁজ'-দের তালিকায় তিনিও উঠে গেলেন।

গত ১০ মাস ধরে আমরা জুবাইদাকে খুঁজে পাবার চেষ্টা করছি"- অশ্রুসজল চোখে বললেন তার মা।

তার মায়ের অভিযোগ, মুখোশ পরা পুলিশ জুবাইদাকে তুলে নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি পুলিশই তাকে নিয়ে গেছে। আমাদের প্রতিবেশীরা বলেছে, মুখোশ পরা অস্ত্রধারী লোকেরা পুলিশের গাড়িতে করে এসে তাকে তুলে নিয়ে গেছে। তারা আমাদের পুরোনো বাড়িতেও গিয়েছিল, আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে।’

নিরীহ জুবাইদার হাতে তার ভাইয়ের মোবাইল ফোনটি ছিল। তিনি আটক হবার পর একটা ফোন করতে পেরেছিলেন তার এক আত্মীয়কে। “সে শুনতে পেয়েছে একজন অফিসার জুবাইদাকে গালাগালি করছে, তারপরই ফোনটা বন্ধ করে দেয়া হলো।”

আসলে মূল ঘটনার শুরু তারও কয়েক বছর আগে। ২০১৪ সালে জুবাইদা এবং তার মা একটি সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ সমাবেশে যোগ দেওয়ার অপরাধে সাত মাসের জেল খেটেছিলেন। অবশ্য পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

জুবাইদার মা বলছিলেন, পুলিশ আমাদের ধরে নিয়ে ১৪ ঘণ্টা ধরে মারধর করে, গালাগালি করে, আমাদের কাপড় খুলে ফেলে, বিদ্যুতের শক দেয়। তারা আমাদের স্বীকার করতে বলে যে আমরা একটা হোটেলে বোমা ফাটাতে পরিকল্পনা করেছি, আমাদের কাছে অস্ত্র আছে এই সব মিথ্যা অভিযোগ। আমি শুনতে পাচ্ছিলাম জুবাইদার চিৎকার, কিন্তু ওকে দেখতে পাচ্ছিলাম না।”

জুবাইদার মা বললেন, “ওরা হুমকি দিল, আমরা অভিযোগ স্বীকার না করলে আমাদের সামনেই জুবাইদাকে ধর্ষণ করবে। তবুও আমরা স্বীকার করিনি।”

জুবেইদার মা বলছিলেন, তারা কখনো মুসলিম ব্রাদারহুড বা অন্য কোন নিষিদ্ধ সংগঠন করেননি। ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট হবার এক বছরের মধ্যেই ক্ষমতাচ্যুত হন। এর পর ২০১৩ সালে ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

এরপর সাত মাস জেলে থাকার পরে তারা ছাড়া পেলেন।

তার বছর দুয়েক পরেই ২০১৬ সালের জুলাই মাসে প্রথম বারেরমতো জুবাইদা নিখোঁজ হন। তার মায়ের কথা, সেবারও পুলিশই তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল।

এর ২৮ দিন পর জুবেইদাকে পাওয়া যায় শহরের উপকণ্ঠে - সেখানে পুলিশ তাকে হাত, পা এবং চোখ বাঁধা অবস্থায় রাস্তার পাশে ফেলে রেখে গিয়েছিল।

জুবাইদার মা বললেন, “তার গায়ে ছিল কাটা দাগ, বিদ্যুতের শকের দাগ। আল্লাহ ক্রুদ্ধ হন এমন সব রকম অত্যাচারই তার ওপর করেছে তারা, সব কিছু”।

এর পর জুবাইদার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। তাকে হাসপাতালে মানসিক চিকিৎসার জন্য ভর্তি করানো হয়। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বেরুনোর পরই আবার তাকে অপহরণ করা হয়, এবং তিনি আর ফেরেননি।

এমন আরও অসংখ্য গুম খুনের হৃদয় বিদারী বর্ণনা রয়ে গেছে মিসরের মায়েদের কাছে। এবং এগুলো এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

মিসরে অনেকগুলো নতুন কারাগার তৈরি করেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট সিসি।

মানবাধিকার কর্মীদের অনেকে বলেন, আবদুল ফাত্তাহ আল সিসির শাসনের মতো এত রক্তাক্ত সময় তারা আগে কখনো দেখেননি।

তাদের একজন মোনা সইফ বলেন, “জীবনকে এত কম মূল্য দেয় - এমন প্রশাসন আমরা আর দেখিনি।”
মিসরে এখন মৃত্যুদণ্ড, গুম, নির্যাতন প্রতিদিনের খবর হয়ে গেছে। যারা আগে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, এখন তারা নিরব হয়ে গেছেন। তারাও এখন আটক হচ্ছেন, গুম হচ্ছেন।

মিসরে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এখন মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। মিসর হচ্ছে সাংবাদিকদের জেলে পাঠানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের তৃতীয় স্থানে।

আগামী মার্চের ২৮ তারিখ মিসরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনে যারা সিসির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন তারা অনেকেই অযোগ্য ঘোষিত হয়েছেন, কেউ আটক হয়েছেন, কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

অবশ্য একজন 'প্রতিদ্বন্দ্বী' আছেন। তিনি মধ্যপন্থী মুসা মুস্তাফা মুসা। তাকে সাজানো প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হলেও তিনি তা অস্বীকার করেন। অনেকে মন্তব্য করছেন, এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট সিসির সাথে তার ছায়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট সিসির শাসনে মিসরে ১৭টি নতুন কারাগার নির্মিত হয়েছে, রাজনৈতিক বন্দীর সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার, জানান মানবাধিকার কর্মীরা।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেকে মিসরের প্রেসিডেন্ট সিসির মানবাধিকার রেকর্ড দেখেও না দেখার ভান করে। কারণ, তিনি মুসলিম স্বাধীনতাকামী বা তাদের ভাষায় ‘উগ্রপন্থী’দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে একজন মূল্যবান মিত্র।

এফএস/আরপি