সুপার ওভারে সুপার ফাইনালের সুপার সমাপ্তি

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

 /

সুপার ওভারে সুপার ফাইনালের সুপার সমাপ্তি

পরিবর্তন ডেস্ক ১২:৩৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৫, ২০১৯

সুপার ওভারে সুপার ফাইনালের সুপার সমাপ্তি

ফাইনালের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নিতে গিয়ে খুবই সংক্ষেপে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বেন স্টোকস। তবে তার কয়েকটি বাক্যেই যেন লর্ডসের ফাইনালের মহানাটকীয়তার চিত্রটা অঙ্কিত। সঙ্গে ইংলিশদের নাটকীয়ভাবে বিশ্বকাপ জয়ের চিত্রও। স্টোকস শুরুই করেন এভাবে, ‘কী বলব, ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। এই মুহূর্তটি জন্ম দিতে আমরা গত ৪ বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করেছি। কিন্তু সেটি এমনভাবে এলো! আমার মনে হয় না ক্রিকেট ইতিহাসে এমন ম্যাচ আর কখনো হবে।’

স্টোকস বলেছেন ভবিষ্যতের কথা। কিন্তু বাস্তবে এমন মহানাটকীয়, রোমাঞ্চকর, স্নায়ুক্ষয়ী ফাইনাল অতীতেও কখনো দেখেনি বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের ফাইনাল মানেই একপেশে লড়াই। অন্তত ক্রিকেট বিশ্বকাপের অতীতটা এমনই। ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত কমই আছে।

ফাইনাল মানেই ম্যাড়ম্যাড়ে, অতীতের এই দায় মুছে ফেলার দায়িত্বই যেন কাঁধে তুলে নিয়েছিল এবারের বিশ্বকাপের লর্ডসের ফাইনাল। নয়তো, একটা ম্যাচে এত নাটক হবে কেন! ৫০ ওভারের ম্যাচ ৫০ ওভারে নিষ্পত্তি হলো না। সেখানে টাই হওয়ায় শিরোপা নির্ধারণের ভাগ্য গড়াল ‘সুপার ওভারে’। সেই সুপার ওভারেও সুপার টাই। ইংল্যান্ডের ১৫ রানের জবাবে নিউজিল্যান্ডেরও ১৫। কী নাটক!

শেষ পর্যন্ত সেই নাটকের সমাপ্তি ম্যাচে দুই দলের মারা বাউন্ডারির ভিত্তিতে। মূল ম্যাচ ও সুপার ওভার মিলিয়ে নিউজিল্যান্ড বাউন্ডারি (চার-ছক্কা) মেরেছে মোট ১৭টি। মূল ম্যাচে ১৬টি, সুপার ওভারে ১টি, যেটি হয়েছে ছক্কা। জবাবে মূল ম্যাচ ও সুপার ওভার মিলিয়ে ইংলিশরা বাউন্ডারি মেরেছে ২৬টি। মূল্য ম্যাচে ২৪টি, সুপার ওভারে ২টি। সেটি দুটিই চার।

যাই হোক, মূল ম্যাচেই বাউন্ডারি সংখ্যায় অনেক অনেক এগিয়ে থাকায় ইংলিশরা আগে থেকেই জানতো, সুপার ওভার টাই হলেই জয় হবে তাদের। তাই তো জয়সূচক রানটি নিতে গিয়ে মার্টিন গাপটিল রানআউট হতেই আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে ইংলিশরা।

নিজেদের ভাগ-গাম্ভীর্যের ঐতিহ্যের কথা ভুলে ইংলিশদের এমন বাধ ভাঙা উচ্ছ্বাসে পাখা মেলার রহস্যটাও স্পষ্টই। ক্রিকেটের জন্মদাতা তারা। অথচ দীর্ঘ ৪৪ বছরেও বিশ্বকাপ ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখা হয়নি। তিন তিন বার ফাইনালে উঠেও স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। গত ২৭ বছর ধরে তো ফাইনালেও উঠতে পারছিল না।

অবশেষে আজন্ম সেই স্বপ্ন যখন বাস্তব হয়ে ধরা দিল, সেটিও এমন মহানাটকীয়ভাবে, ইংলিশরা আবেগের স্রোতে বাঁধ দেন কী করে! শুধু তো সুপার ওভার বা মূল ম্যাচের শেষ ওভার নয়, কাল লর্ডসের ফাইনালে নাটক হয়েছে তার আগেও।

নিউজিল্যান্ডের ২৪১ রানের জবাবে মাত্র ৮৬ রানেই দলের প্রতিষ্ঠিত ৪ ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে বসে ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপটা তো তখনই নিউজিল্যান্ডের হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত ছিলেন কেউ কেউ! কিউই সমর্থকরাও হয়তো বিশ্বকাপ শিরোপা উৎসবের আগাম প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন। ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে ভেসে উঠছিল একপেশে ফাইনালের প্রতিচ্ছবিও।

সেই অবস্থা থেকে টেনে এনে লর্ডসের ফাইনালটাকে চরম রোমাঞ্চের উপাখ্যানে পরিণত করেন বেন স্টোকস ও জস বাটলার। দলকে ১৯৬ রানে রেখে জস বাটলার আউট হওয়ার পরও নিউজিল্যান্ডের জয়টাকেই সম্ভাব্য নিয়তি মনে হচ্ছিল। জয়ের জন্য তখনো যে ইংল্যান্ডের দরকার ৪৬ রান। বল বাকি মাত্র ৩১টি। এমনকি নিউজিল্যান্ডের জয়কে নিয়তি মনে হচ্ছিল শেষ ওভারেও। কিন্তু ওই যে, ইংলিশদের উদ্ধারকর্তা হয়ে তখনো উইকেটে বেন স্টোকস। জস বাটলার আউট হওয়ার পর কীটন সমীকরণ মেলানোর গুরুদায়িত্ব যিনি একার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন! পণ করেছেন, নায়ক তাকে হতেই হবে। জিততেই হবে বিশ্বকাপ।

তার সেই পণ শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়েছে। তবে তার আগে ঘটেছে স্নায়ুক্ষয়ী নাটক। শেষ ওভারে ইংলিশদের দরকার ছিল ১৫ রান। বোলিংয়ে আবার কিউইদের সেরা পেসার ট্রেন্ড বোল্ট। বোল্টের ওভারে ১৫ রানের হিসাব মেলানো কি সম্ভব! সমীকরণটা আরও হয়ে যায় স্টোকস প্রথম দুই বলেই কোনো রান না নেওয়ায়!

প্রথম দুই বল ডট দেওয়ায় সমীকরণ দাঁড়ায় ৪ বলে ১৫ রান। যতই দলকে জেতানোর দায়িত্ব একার কাঁধে তুলে নিন, বেন স্টোকসের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না, কঠিন এই সমীকরণ মেলানোর। ওপাশে নির্ভরযোগ্য সঙ্গীও নেই, যারা কঠিন যুদ্ধে যোগ্য সহায়তা দিতে পারবে। উপায়? বীর স্টোকসকে সহায়তা করতে যুদ্ধে নেমে পড়লেন স্বয়ং ভাগ্যদেবী!

ভাগ্যদেবী স্টোকসের ব্যাটে তো ভর করলেনই, ভর করলেন কিউই ফিল্ডারের হাতেও। নয়তো কিউই ফিল্ডারের রান আউটের জন্য থ্রু করা বল স্টোকসের ব্যাটের কানায় লেগে উল্টো দিক দিয়ে বাউন্ডারি হয়ে যাবে কেন! ওভার থ্রুতে ওই চারটি না হলেই তো জিতে যায় নিউজিল্যান্ড। তীরে গিয়ে তরী ডুবে ইংল্যান্ডের।

ভাগ্যদেবী কারসাজি করেই ওভার থ্রুটি স্টোকসের ব্যাটের কানায় লাগিয়ে বল সীমানা করলেন। ২ রান নিতে গিয়ে যার রানআউট হওয়ার কথা, সেই বেন স্টোকস পেয়ে গেলেন ৬ রান!

ওই চার হওয়ার পর অবশ্য ইংল্যান্ডের সমীকরণটা সহজ ছিল, ২ বলে ৩ রান। কিন্তু ভাগ্যদেবী আরও নাটক জমিয়ে রেখেছিলেন বলেই হয়তো বেন স্টোকসকে দিয়ে শেষে সহজ সমীকরণটাও মেলাতে দিলেন না! শেষ দুই বলে দুই রানআউটে ম্যাচটা করে দিলেন টাই। এর পর সুপার ওভারেও দেখালেন নাটক। মূল ম্যাচে ইংল্যান্ড জয় পায়নি রানআউটের খড়গে কাটা পড়ে। সুপার ওভারের শেষ বলে নিউজিল্যান্ডেরও স্বপ্ন ভঙ্গ সেই রানআউটেই।

আইপিএলসহ বিভিন্ন দেশের ফ্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে সুপার ওভার নাটক হয়। আইপিএলে একবার সুপার ওভারে টাই হাওয়ার পর বাউন্ডারি সংখ্যার ভিত্তিতে ম্যাচের নিষ্পত্তিও হয়েছে। ২০০৭ সালে প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচে সুপার ওভারে টাই হয়েছিল। পরে ম্যাচের নিষ্পত্তি টানা হয় বোল্ড আউটে!

তবে ওয়ানডে ক্রিকেটে এমন দমবন্ধ করা নাটক কখনোই হয়নি। বিশ্বকাপের ফাইনালে তো এমন নাটকীয় সমাপ্তির কথা কল্পনাতেও ছিল না। অতীতে হয়নি। বেন স্টোকসের কথায়, অজানা ভবিষ্যতেও এমন ফাইনাল হয়তো কখনো দেখা যাবে না।

এমন ফাইনাল আসলেই হয় না!

কেআর

 

ICC_worldCup_related: আরও পড়ুন

আরও