বাহাসেই আ’লীগ-বিএনপির বছর পার

ঢাকা, সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮ | ৭ শ্রাবণ ১৪২৫

বাহাসেই আ’লীগ-বিএনপির বছর পার

মাহমুদুল হাসান ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৭

print
বাহাসেই আ’লীগ-বিএনপির বছর পার

রাত পোহালেই নতুন সূর্যের দেখা মিলবে। এর মধ্য দিয়ে গত হবে ২০১৭। গণনা শুরু হবে ২০১৮ সালের।

ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে হারিয়ে যেতে বসা বছরের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব যেমন করতে হচ্ছে, তেমনি নতুন বছরে স্বপ্নের তালিকা বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও এখনই সেরে রাখতে হচ্ছে।

অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, চড়াই-উৎরাই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আনন্দ-বেদনার সাক্ষী ছিল বিদায়ী ২০১৭ সাল। রাজনৈতিক অঙ্গনও এর ব্যতিক্রম নয়।

বিদায়ী বছরে সংঘাতময় পরিস্থিতির দেখা না মিললেও নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে প্রধান দুই দল- ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষনেতাদের মধ্যে বাহাস দেখা গেছে। অনেকটা ‘বিচার মানি, তাল গাছটা আমার’ টাইপের তর্ক-বিতর্কে পার হয়েছে গোটা সময়। এসব করতে গিয়ে নেতারা পরস্পরকে তীর্যক বাক্যবাণ ছাড়াও নোংরা ভাষায় আক্রমণ করেছেন।

বাস্তবে মাঠের রাজনীতি খুব একটা দেখা যায়নি। একাদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে বছরের শুরুতে হাকডাক দিলেও মাঝ পথে এসে থেমে যায় আওয়ামী লীগ। তবে বছর শেষ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আবারো সরব হয়ে ওঠে দলটি।

বিপরীতে বিএনপি দেরিতে হলেও নির্বাচনী প্রস্তুতির চেয়ে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়। শেষদিকে দলটির নেতাদের মুখেও উঠে আসে আগামী নির্বাচনে প্রস্তুতির আহ্বান।

এছাড়া বছরের শুরুতে হেফাজত-আওয়ামী লীগ বৈঠক, রোহিঙ্গা ইস্যু, একাদশ সংসদ নির্বানকে সামনে রেখে কমিশনের সংলাপ, দীর্ঘদিন পর রাজধানীতে রাজনৈতিক দলগুলোর শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, নতুন রাজনৈতিক জোটের আত্মপ্রকাশসহ রাজনীতিতে ঘটনাবহুল আরেকটি বছর পার করল বাংলাদেশ।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের সংলাপে অংশ নেয়। কমিশন নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ১৫ অক্টোবর দলের ২০ দফা প্রস্তাব নিয়ে সংলাপে যোগ দেয় বিএনপি। আর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ১১ দফা প্রস্তাব নিয়ে অংশ নেয় ১৮ অক্টোবর।

তবে প্রধান দু’দলের মূল প্রস্তাব ছিলো পরস্পর বিরোধী। বিশেষ করে সেনা মোতায়ন, সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তন ও ইভিএম ব্যবহার নিয়ে তাদের অবস্থান বিপরীতমুখী।

২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে রাজনৈতিক নানা সমীকরণে বিএনপি অংশ না নিলেও এ বছর শুরু থেকেই আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক দলটি। নির্বাচনকে টার্গেট করে কর্মপরিকল্পনা ‘ভিশন টুয়েন্টি থার্টি’ নামে মূলত নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

সুনীতি, সুশাসন ও সু-সরকারের সমন্বয় ঘটিয়ে জাতি গঠনে নতুন ধারার রাজনীতি ও অর্থনৈতিক বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে প্রস্তাবনা তুলেন তিনি।

রাজনৈতিক বড় শো-ডাউনের মাধ্যমে অক্টোবরে নিজেদের অবস্থানও জানান দেয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদান শেষে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফেরার দিন ৭ অক্টোবর। ওইদিন দলের নেতাকর্মীরা রাজধানীতে ব্যাপক শো-ডাউন করে।

এদিকে তিন মাস লন্ডনে চিকিৎসা শেষে গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ১৮ অক্টোবর দেশে ফিরেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দীর্ঘদিন আন্দোলন সংগ্রামে পর্যদুস্ত বিএনপিও নিজেদের শক্তি জানান দেয় ওইদিন।

বিমানবন্দর থেকে গুলশান পর্যন্ত রাজপথে নেতাকর্মীরা অনেকটা মানবপ্রাচীর তৈরি করে। অবশ্য দু’নেত্রীর আগমনের দিন পরিবহন সংকট আর যানজটে নাকাল হতে হয় নগরবাসীকে।

আগস্টের শেষভাগে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ঘিরেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে খানিকটা ব্যস্ততা দেখা যায়। ১২ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের দেখতে ছুটে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সুনাম কুড়ায় বিশ্ব অঙ্গনেও।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ নামে আখ্যায়িত করেন শেখ হাসিনাকে। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের ৭২তম অধিবেশনে যোগ দিয়ে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জোরাল তৎপরতা চালান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

এখানে পিছিয়ে নেই বিএনপিও। মানবিক সহায়তার পাশাপাশি রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিজেদের সাংগঠনিক কর্মকসূচিও ঝালিয়ে নেয় দলটি। ২৮ অক্টোবর রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সহায়তা দিতে কক্সবাজারে যান চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দীর্ঘ ৫ বছর পর চট্টগ্রাম অঞ্চলে খালেদা জিয়ার এমন উপস্থিতি নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করে তোলে। তবে, যাওয়া-আসার পথে ফেনীতে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর হামলার শিকার হয়।

রাজনৈতিক এমন সহাবস্থানে সরকারের নমনীয়তা দেখা যায় নভেম্বরে। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর ১২ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করে বিএনপি। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় নেতাকর্মীদের ব্যাপক শো-ডাউন করতে দেখা যায় সেদিন। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয় বিএনপির নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগও নভেম্বরে দু’দফা সমাবেশ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ৭ মার্চের ভাষণের বিশ্ব স্বীকৃতি উদযাপনে ১৮ নভেম্বর নাগরিক সমাবেশ ও ২৫ নভেম্বর দলের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

এখানেই শেষ নয়, রাজনীতিতে এ বছর শুরুর দিকে হেফাজত প্রধান আল্লামা আহমেদ শফীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতির বৈঠক আলোচনার জন্ম দেয়। ১১ এপ্রিল গণভবনে আলেম ওলামাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রায় এক যুগ পর মুখোমুখি হন শেখ হাসিনা ও বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে শেখ পরিবারের সদস্যের সঙ্গে কাদের সিদ্দিকীও আমন্ত্রণ পেয়ে সেখানে উপস্থিত হন। অত্যন্ত পারিবারিক পরিবেশে আলোচনা হয় দুই পরিবারের।

বছরের একবারে শেষ দিকে এসে দেশের রাজনীতিতে নতুন চমক দেয়ার চেষ্টা করে বিকল্পধারা প্রধান সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে নতুন জোট ‘যুক্তফ্রন্ট’। দীর্ঘ সলা-পরামর্শের পর একাদশ সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করে ৪ ডিসেম্বর বিকল্পধারা, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সমন্বয়ে এই জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

বছরজুড়ে রাজপথে সহিংস আন্দোলন সংগ্রামের পরিবর্তে নির্বাচনী বাতাসই বয়েছে রাজনীতিতে। তবে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে অনড় থেকেই বছর শেষ করল দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল।

সংবিধান মেনেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে এবং সেটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে- এমন দাবিতে সোচ্চার প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী ফোরামের নেতারা।

অন্যদিকে বিএনপিও এই বাহাস জমিয়ে রেখেছে। শেখ হাসিনা ও বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রেখে কোনো নির্বাচন হবে না, হতে দেওয়া হবে না- এমন দাবিতে প্রয়োজনে তারা আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়ে যাচ্ছেন। এখন দেখার, নতুন বছরে এই বাহাসের সমাপ্তি হয় কিনা?

এমএইচ/আইএম

 
.

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ




আলোচিত সংবাদ