সিরিজ হামলায় বোমা মিজানের ভূমিকা কী ছিল?

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

সিরিজ হামলায় বোমা মিজানের ভূমিকা কী ছিল?

প্রীতম সাহা সুদীপ ৩:০১ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৭, ২০১৮

সিরিজ হামলায় বোমা মিজানের ভূমিকা কী ছিল?

অন্যান্য কর্মদিবস থেকে ব্যতিক্রম ছিল না ক্যালেন্ডারের পাতার ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট। দিনটি ছিল বুধবার। প্রতিদিনের মতোই সকালে ঘুম থেকে উঠে জীবিকার তাগিদে দেশের কর্মজীবী মানুষ ছুটেছিলেন যার যার কর্মক্ষেত্রে। অফিস-আদালতে ছিল কর্মচাঞ্চল্য, কলকারখানাগুলোতেও কাজে ব্যস্ত ছিলেন শ্রমিকরা। হাট-বাজারে চলছিল নিয়মিত বেচাকেনা। স্কুল-কলেজেও চলছিল ক্লাস।

হঠাৎই সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে মাত্র আধ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে বিকট শব্দে কেঁপে উঠে সারাদেশ। মুন্সিগঞ্জ বাদে দেশের ৬৩টি জেলায় বোমা হামলার খবরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বাংলার প্রতিটি মানুষের চোখে-মুখে। এমন ঘটনা ইতিহাসে এর আগে কখনোই কেউ শোনেননি, দেখেনও নি। সবার চোখ তখন টিভি পর্দায়, ব্রেকিং নিউজ আসছে চ্যানেলগুলোতে। স্ক্রলে দেখাচ্ছে বোমা বিস্ফোরণে আক্রান্ত জেলাগুলোর নাম।

মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে যায় দেশের মহাসড়কগুলো। মানুষজন কর্মক্ষেত্র থেকে নিরাপদ আশ্রয় পেতে যে যার বাড়ির দিকে ছুটে, ফাঁকা হয়ে যায় অফিস-আদালত-ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। স্বাধীনতার পর দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা ছিল এটি। নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিতে সেদিন ৬৩টি জেলার ৪০০ স্পটে প্রায় ৫০০ বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। এই হামলায় নিহত হন দুজন এবং আহত হন দুই শতাধিক মানুষ।

সেদিন জঙ্গিদের টার্গেট ছিল হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট,  জেলা আদালত, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়,  প্রেসক্লাব ও সরকারি-আধা সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। আর অধিকাংশ স্থানেই রিমোর্ট কন্ট্রোলে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল, যা ছিল জঙ্গিদের হাতে বানানো।

একসঙ্গে এতো বোমা তৈরির নেপথ্যে যে মূল ভূমিকা পালন করেছিল, তার নাম মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজান ওরফে মুন্না ওরফে কাওসার। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) বোমা তৈরির মূল কারিগর ছিল সে। এই মিজানের হাত ধরেই উগ্রপন্থিদের মধ্যে বোমা তৈরির হাতেখড়ি হয়। তার কাছ থেকেই ইম্প্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) তৈরির দীক্ষা পায় জঙ্গিরা। এ কারণেই তার নাম দেয়া হয় বোমা মিজান।

 সিরিজ বোমা হামলায় বোমা মিজানের ভূমিকা

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ১৭ আগস্ট সারা দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে যে বোমা হামলা চালিয়েছিল জেএমবি, তাতে বোমা তৈরির নেপথ্যে মূল ভূমিকা ছিল বোমা মিজানের। এছাড়াও সে কক্সবাজার এলাকায় থেকে এই হামলায় অংশ নিয়েছিল।

শীর্ষ জঙ্গি আতাউর রহমান সানি কক্সবাজারের দায়িত্ব দিয়ে সেখানে পাঠায় মিজান ও তার সহযোগীদের। তারা সেখানকার চেচুয়া এলাকায় বাসা ভাড়া নেয়। সিরিজ বোমা হামলার দুই দিন আগে ঢাকা থেকে এসএ পরিবহনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে ৪০টি বোমা পাঠানো হয়। সেখান থেকে ৬টি বোমা সংগ্রহ করে কক্সবাজারে নিয়ে যায় মিজান। পরে পরিকল্পনা অনুযায়ী তা ১৭ আগস্ট আদালতের বাইরে এবং মার্কেটের চারটি স্পটে লাগিয়ে রাখে, যা সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এক যোগে বিস্ফোরিত হয়।

মিজানের বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া ও ভারতে গ্রেফতার

জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমানের খুবই কাছের লোক ছিল বোমা মিজান। যে কারণে আব্দুর রহমান-বাংলা ভাইদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর জেএমবির হাল ধরতে বারবার এগিয়ে যায় বোমা মিজান। ২০০৯-এর ১৯ জুলাই ঢাকার মিরপুর থানার একটি অস্ত্র মামলায় যাবজ্জীবন সাজা হয় মিজানের। এ ছাড়া আরো দু’টি মামলায় ছয় বছর করে, একটিতে ১৬ বছর ও একটি মামলায় পাঁচ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ছিল এই শীর্ষ জঙ্গি।

২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গাজীপুর কাশিমপুর কারাগার থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি নেতা সালাউদ্দিন সালেহীন, হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাকিব হাসান ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি বোমা মিজানকে প্রিজন ভ্যানে ময়মনসিংহের একটি আদালতে নেয়া হচ্ছিল। ময়মনসিংহের ত্রিশালে পৌঁছার পর প্রিজন ভ্যানের গতিরোধ করে এলোপাতাড়ি গুলি ও বোমা ছুড়ে ছিনিয়ে তাদের নিয়ে যায় জঙ্গিরা। এর পরই বোমা মিজান ও সালেহীন ভারতে পালিয়ে যায়।

দীর্ঘ চেষ্টার পর গত ৭ আগস্ট ভারতের কর্নাটকের রামনগর জেলায় অভিযান চালিয়ে মিজানকে গ্রেফতার করে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ। বাংলাদেশে ফিরে পুরনো জেএমবিকে চাঙ্গা করতে ব্যর্থ হওয়ায় ভারতেই জেএমবিকে সক্রিয় করার কাজে হাত দিয়েছিল বোমা মিজান। ভারতের খাগড়াগড় ও বুদ্ধগয়ায় বিস্ফোরণে মূল ভূমিকা পালন করে সে।

বোমা মিজানকে দেশে ফেরানোর চেষ্টায় সংশ্লিষ্টরা

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, বোমা মিজান যেমন বোমা বানাতে পারদর্শী, তেমনি সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় দক্ষ ছিল সে। ময়মনসিংহে তাকে প্রিজন ভ্যান থেকে ছিনিয়ে নেয়ার পর মিজান ভারতে গিয়ে আত্মগোপন করে এবং সেখানেও সে তার সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।

তিনি আরো বলেন, ভারতে থাকলেও সে দেশে থাকা জেএমবি সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতো। তাকে সম্প্রতি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা গ্রেফতার করেছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, বোমা মিজানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আশা করছি, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই তাকে দেশে ফেরত আনা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে বিভিন্ন চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা আশ্রয় নিয়েছে। তাদের ফেরত আনার ব্যাপারে আমাদের কথাবার্তা চলছে। তাদের ফেরত আনার বিষয়টি চলমান। সন্ত্রাসীদের সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ভারত তাদের ফেরত দেয়ার বিষয়ে সম্মত হলে আমরা ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করব।

পিএসএস/এএল/আরজি