হুজি থেকে নব্য জেএমবি

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

হুজি থেকে নব্য জেএমবি

প্রীতম সাহা সুদীপ ১:৫৭ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৭, ২০১৮

হুজি থেকে নব্য জেএমবি

জঙ্গি হামলা আর জিম্মি সঙ্কটের ভয়াবহতা যে কতটুকু, তা ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর জানতে পারে বাংলাদেশের মানুষ। তবে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে যে সিরিজ বোমা হামলা চালানো হয়েছিল, তার ভয়াবহতাও কম ছিল না।

সেদিন মাত্র আধ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছিল সারাদেশ। মুন্সিগঞ্জ বাদে দেশের ৬৩টি জেলায় বোমা হামলার খবরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বাংলার প্রতিটি মানুষের চোখে-মুখে। আলোচিত এ দুইটি হামলার কথা বাদ দিয়ে ইতিহাসের পাতা ঘাটলে এমন ভয়াবহ ঘটনা অসংখ্য পাওয়া যাবে।

১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরের টাউন হল মাঠে উদীচীর সমাবেশে বোমা হামলা, একই বছর ৮ অক্টোবর খুলনার নিরালা এলাকায় অবস্থিত কাদিয়ানীদের উপাসনালয়ে বোমা বিস্ফোরণ, ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে সিপিবির মহাসমাবেশে বোমা হামলা, ১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসবে বিস্ফোরণ, ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনাগুলোও কম ভয়ঙ্কর ছিল না।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, নব্বই দশকের গোড়াতে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের গোড়াপত্তন হয়েছিল আফগান ফেরত মুজাহিদদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। তবে তার আগে আশি দশকে মুসলিম মিল্লাত বাহিনীর উত্থানকেই বাংলাদেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর সশস্ত্র তৎপরতার প্রথম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ধরা হয়। তবে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশকেই (হুজি-বি) দেশের ‘ফার্স্ট জেনারেশন’ জঙ্গি সংগঠন বলা যায়।

এর এক দশক পর দেশে শরীয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে জন্ম নেয় জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি। জেএমবির পর সক্রিয় হয় আল-কায়েদার অনুসারী আরেক সংগঠন আনসার আল-ইসলাম। সবশেষ মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএসের মতাদর্শে জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির আত্মপ্রকাশ ঘটে।

মিল্লাত বাহিনী

১৯৮৬ সালে চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তা মতিউর রহমান ‘মুসলিম মিল্লাত বাহিনী’ গঠন করেন। মধ্যপ্রাচ্য ঘুরে এসে তিনি কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার শিমুলিয়ায় নিজ গ্রামে আস্তানা গড়ে তোলেন। পাঁচ একরের ওই আস্তানায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু করেন।

১৯৮৯ সালের ১২ ডিসেম্বর মতিউরের ওই আস্তানায় ২ দিনের অভিযানে ২ পুলিশ সদস্যসহ ২১ জন নিহত হন। উদ্ধার হয় আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র। আহত অবস্থায় পালাতে গিয়ে মতিউর ও তার ৪৮ সহযোগী গ্রেফতার হন।

পরে জামিনে বেরিয়ে আসেন মতিউর। এরপর আর তার গতিবিধির ওপর কোনো নজরদারি করা হয়নি। গোয়েন্দা সংস্থাসহ কারো কাছেই কোনো তথ্য নেই এই মতিউরের বিষয়ে।

হরকাতুল জিহাদ

১৯৮৯ সালে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যশোরের মনিরামপুরের মাওলানা আবদুর রহমান ফারুকী। কিন্তু ওই বছরই আফগানিস্তানের খোস্তে মাইন অপসারণের সময় মাওলানা ফারুকী নিহত হন।

পরে ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করে হুজি-বি। আফগানফেরত মুজাহিদদের বেশিরভাগই এর সঙ্গে যুক্ত হন। তারা ছিলেন এ দেশে ভারতের দেওবন্দ ধারার মাদ্রাসায় শিক্ষিত এবং হানাফি মাজহাবের। তবে সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অনেকে পাকিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছিলেন। আফগান যুদ্ধের সময় তারা গেরিলাযুদ্ধ ও ভারী অস্ত্র চালনায় প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। এই হুজি-বিকেই এ দেশে জঙ্গি তৎপরতার গোড়াপত্তনকারী হিসেবে ধরা হয়ে থাকে।

যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা দিয়ে নাশকতামূলক কার্যক্রম শুরু করে হুজি-বি। এই জঙ্গি সংগঠনটি ৬ বছরে মোট ১৩টি নির্মম হামলা চালায়, এতে ১০৯ জন নিহত হন। আহত হন ৭০০ জনের বেশি মানুষ। ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থলের কাছে ও হেলিপ্যাডে বোমা পেতে রাখার ঘটনার পর প্রথম হরকাতুল জিহাদ ও মুফতি হান্নানের নাম জানাজানি হয়।

হুজি-বি'র জঙ্গিরা সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ হামলা চালায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার জনসভায়। ওই গ্রেনেড হামলায় ২২ জন নিহত হন। আহত হন শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েকশ নেতা-কর্মী। হুজি-বি'কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় ২০০৫ সালের অক্টোবরে।

জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি

১৯৯৮ সালের এপ্রিল মাসে জন্ম নেয় জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ বা জেএমবি। দ্বিতীয় পর্যায়ের এই জঙ্গি সংগঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সালাফি মতাদর্শী উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। নিজেকে আমীর ঘোষণা করে জেএমবি নামের জঙ্গি সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন শায়খ আবদুর রহমান। তার লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের সহযোগিতা নিয়ে এ দেশে সশস্ত্র লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি করা।

২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে ২৬টি হামলা চালায় এই সংগঠনটি। এসব ঘটনায় ৭৩ জন নিহত এবং প্রায় ৮০০ জন আহত হন। একই সময়কালে হরকাতুল জিহাদও (হুজি-বি) বেশ কয়েকটি নাশকতামূলক হামলা চালায়। সব মিলিয়ে তখন দেশে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।

২০০৪ সালের এপ্রিল-মে মাসে রাজশাহীতে কথিত বাম চরমপন্থী দমনে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে অভিযানের পর থেকে দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে এই উগ্র গোষ্ঠীর তৎপরতার কথা উঠে আসে। কিন্তু তখন তারা সংগঠনের নাম হিসেবে ব্যবহার করেছিল 'জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ বা জেএমজেবি'। পরে ২০০৫ সালে একযোগে ৬৩ জেলায় বোমা ফাটিয়ে ও প্রচারপত্র ছড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্বের আনুষ্ঠানিক জানান দেয় জেএমবি।

তৎকালীন সরকার ২০০৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জেএমবি ও জেএমজেবিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর জেএমবি ঝালকাঠি, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নেত্রকোনায় পাঁচটি আত্মঘাতী হামলা চালায়। এগুলোই ছিল দেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রথম আত্মঘাতী হামলা।

২০০৬ সালের ২ মার্চ সিলেটে স্বপরিবারে গ্রেফতার হন শায়খ রহমান। এর আগে-পরে বাংলা ভাইসহ জেএমবির তখনকার শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় সব নেতা ধরা পড়েন। ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ জেএমবির ছয় শীর্ষ জঙ্গি শায়খ আব্দুর রহমান, বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, ইফতেখার হোসেন মামুন ও খালেদ সাইফুল্লাহ ওরফে ফারুকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর মধ্য দিয়ে জেএমবির প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটে।

এরপর হবিগঞ্জের মাওলানা সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে নতুন কমিটি করে সংগঠনটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ২০১০ সালে তিনিসহ নতুন নেতৃত্বের অনেকে ধরা পড়ায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তবে এখনো এই জঙ্গি সংগঠনের পলাতক নেতারা দেশে-বিদেশে থেকে সংগঠনের কার্যক্রম গোপনে চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। 

আনসার আল-ইসলাম

২০০৭ সালের শেষ দিকে বা ২০০৮ সালের শুরুতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা আনসার আল-ইসলাম নামে আরেকটি জঙ্গি সংগঠন। সংগঠনটির সদস্যদের বেশিরভাগই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, বিত্তবানের সন্তানও রয়েছেন।

২০১৩ সালে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে হত্যার পর এই সংগঠন আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় সরাসরি জড়িত সবাই নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়। ওই মামলার বিচার শেষে রায়ে দুজনের ফাঁসি এবং মুফতি রাহমানীসহ বাকি পাঁচজনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়।

২০১৩ সালে ব্লগার রাজীব হত্যার পর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ২০১৫ সালে আবার হত্যাকাণ্ড শুরু করে আনসারুল্লাহ। তার আগে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে আল-কায়েদা নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি এক ভিডিও বার্তার মধ্য দিয়ে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা (একিউআইএস) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এর পরপরই বাংলাদেশের

আনসারুল্লাহ একিউআইএসের অধিভুক্ত হয় বলে তখন ঢাকায় জঙ্গিবাদ দমনে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ একাধিক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন। এরপর সংগঠনটি আনসারুল্লাহ নাম বদলে আনসার আল-ইসলাম নাম ধারণ করে এবং নিজেদের একিউআইএসের বাংলাদেশ শাখা দাবি করে। আনসারুল্লাহ বা আনসার আল-ইসলাম বিবৃতি দিয়ে অনেককে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। এদের বেশিরভাগই ব্লগার, প্রকাশক, শিক্ষক ও সমকামীদের অধিকারকর্মী। ২০১৭ সালের ৫ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে এই জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

নব্য জেএমবি

বাংলাদেশে ‘নব্য জেএমবি’র সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে। ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরী সিরিয়া থেকে দেশে এসে প্রথমে আইএসের জন্য যোদ্ধা সংগ্রহের কাজ শুরু করে। পরে সে প্রথমে জুনুদ আল তাওহীদ আল খলিফা নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। সেই সংগঠন থেকেই জন্ম হয় আরেকটি জঙ্গিগোষ্ঠীর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়- এই গোষ্ঠীর নাম ‘নব্য জেএমবি’। পুরনো জেএমবির একটি অংশ বেরিয়ে এসে নতুন নেতৃত্বে সক্রিয় হয়েছে এরা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে নব্য জেএমবি আইএসের ভাবাদর্শের একটি সংগঠন। আইএসের কিছু কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করে তারা দেশে কথিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

সংগঠনটির পেছনে যে পাঁচজনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম তামিম চৌধুরী। বাকি চারজন হলো— সারোয়ার জাহান ওরফে মানিক, আব্দুস সামাদ ওরফে আরিফ ওরফে মামু, শাইখ আবুল কাশেম ও মামুনুর রশীদ রিপন। এদের মধ্যে তামিম ও মানিক সিটিটিসি ও র‍্যাবের অভিযানে নিহত হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে নব্য জেএমবি সারা দেশে ৪০-৪২টি হামলা ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। এর মধ্যে ২৮টি ঘটনায় আইএস দায় স্বীকার করেছে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়েছিল এরাই। তবে গুলশান হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক অভিযানে বর্তমানে থমকে গেছে এই জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রমও।

 

 

পিএসএস/এএল/আরজি