ইতিহাসের তীর্থস্থান ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি

ঢাকা, রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

ইতিহাসের তীর্থস্থান ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি

মাহমুদুল হাসান ৯:৫১ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৫, ২০১৮

ইতিহাসের তীর্থস্থান ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি

বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীনতার লাল সূর্য এনে দিয়েছিলেন যে মানুষটি, সেই মহামানবকে স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে এ দেশেরই মানুষরূপী গুটিকয়েক হায়েনা। অথচ জনগণের দাবি আদায়ের জন্য, স্বাধীকার ও স্বাধীনতার জন্য সেই মানুষটি সারাজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও বলেছেন বাঙালির স্বাধীনতার কথা। স্বাধীনতার সেই মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতি হারিয়ে ফেলে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।

পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডি হওয়ার আগ পর্যন্ত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের যে বাড়িটিতে বসবাস করতেন তা এখন ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর’। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর থেকে এ বাড়িতে সপরিবারে থাকতে শুরু করেন শেখ মুজিব। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ বাড়িতেই ছিলেন। যা বাঙালি জাতির তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানাতে আসে নানা বয়সের লাখো মানুষ। বিশেষ করে ছুটির দিনে ছুটে যায় ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে।

বাড়িটির নিচতলায় প্রবেশমুখেই রাখা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জীবনী ও তার কর্মকাণ্ড নিয়ে রচিত নানা দুর্লভ গ্রন্থ। প্রথম কক্ষেই প্রদর্শিত হচ্ছে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য আলোকচিত্র। আছে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার আলোকচিত্রটিও। ১৯৯৪ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তর করা হয় শোকগাঁথা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের এ বাড়িটিকে।

৪৩ বছর আগে শেষ রাতের দিকে এ বাড়ির সামনে মানুষ নয়, এসেছিল মানুষ রূপধারী একদল পশু। তারা এসেছিল সশস্ত্র অবস্থায়। তারা এঁকে দেয় বাঙালির ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায়। তারা হত্যা করেছিল পবিত্র শিশুপুত্রকে। মেহেদি রাঙা হাতে যে তরুণী নববধূ হয়ে এসেছিল স্বপ্নভরা যুবকের হাত ধরে, তাকেও হত্যা করেছিল ওরা। পিতাসহ হত্যার কাতারে ছিল ১৮টি প্রাণ। প্রাণ হারিয়েছেন এ বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীরাও। সেই থেকে শুরু আগস্টের শোকগাঁথা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি ঘিরে।

শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে ভূমিকায় শেখ হাসিনা লিখেছেন- ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার পরপরই আমাদের ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে (বর্তমান সড়ক নম্বর ১১, বাড়ি নম্বর ১০) পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হানা দেয় এবং আমার পিতাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তাকে গ্রেফতারের পর আমার মা ছোট দুই ভাই রাসেল ও জামালকে নিয়ে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেন। এরপর আবার ২৬ মার্চ রাতে পুনরায় সেনারা হানা দেয় এবং সমগ্র বাড়ি লুটপাট করে, ভাঙচুর করে।’ এ বাড়ি থেকেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। আজ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোকের দিন। জাতির অশ্রুসিক্ত হওয়ার দিন। পঁচাত্তরের এই দিনে জাতির জনকের দেহ যখন বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা করেছিল ঘাতকরা, তখন বৃষ্টিরূপে অশ্রুপাত করেছিল বাংলার প্রকৃতিও।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশব্যাপী তখন স্লোগান ছিল 'জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব'। কিন্তু বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে যখন দেশ পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, কাজ করছিলেন মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য— তখন ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে তাঁকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল একদল রক্তপিপাসু বিপথগামী উচ্ছৃঙ্খল সেনাসদস্য। স্বাধীনতার মাত্র কিছুদিন পরই রাষ্ট্র হারায় তার গর্ব ও ইতিহাসের মহানায়ককে।

বঙ্গবন্ধুরর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থ থেকে পাওয়া যায়- সেদিন বিপথগামী সেনাসদস্যরা আরো যাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করেছিল তাঁরা হলেন— বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তাঁর তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল, নবপরিনীতা দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতি ও কৃষিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, দৌহিত্র সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু, ভ্রাতুষ্পুত্র শহীদ সেরনিয়াবাত, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মনি, বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে যাওয়া কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ এবং ১৪ বছরের কিশোর আবদুল নঈম খান রিন্টুসহ ১৬ জন। শেখ রাসেল তখন ১০ বছরের শিশু। তাঁকেও রেহাই দেয়নি ঘাতকরা।

বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা। ১৯৯৪ সালের ১১ এপ্রিল এ বাড়িটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

এমএইচ/এএল/