শোকের মাস হোক আত্মোপলব্ধির উৎস

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ৯ ফাল্গুন ১৪২৫

শোকের মাস হোক আত্মোপলব্ধির উৎস

নূরে আলম সিদ্দিকী ১১:৪০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০১৮

শোকের মাস হোক আত্মোপলব্ধির উৎস

যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে, বাঙালি জাতীয় চেতনার উন্মেষ, তার বিকাশ, ব্যাপ্তি ও সফলতায় যাদের অথবা যাদের পূর্বসূরিদের অবদান আছে, পরাধীনতার বক্ষ বিদীর্ণ করে স্বাধীনতার প্রদীপ্ত সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে এই রক্তাক্ত বাংলার যেসব দামাল ছেলেরা অভিষিক্ত; ৪৭ থেকে ৭১ এই দীর্ঘ পথপরিক্রমণে একেকটি আন্দোলনের সোপান উত্তরণের মাঝে একেক গুচ্ছ তরুণ তাজা তপ্ত প্রাণ অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন। কিন্তু এই সবকিছুরই পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ প্রতীক ছিলেন জাতির জনক, আমার প্রাণের মুজিব ভাই।

আগস্ট মাসটি বাঙালি জাতির তথা বাংলাদেশের জন্য শোকের মাস। কিন্তু আমার জন্য এটি হৃদয়ের রক্তক্ষরণের মাস; অনুভূতি, উপলদ্ধি ও মননশীলতার পরতে পরতে অসহ্য ও তীক্ষ্ম যন্ত্রণা সহ্য করার মাস। আজকে ৪২ বছর হল, মুজিব ভাই আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আমার অনুভূতিতে, বিশ্বাসে এটা আজও পুরোপুরি সত্যরূপে প্রতিভাত হয় না। আমার মননশীলতা, অনুভূতি, হৃদয়ের অনুরণন, কোন জায়গায় বঙ্গবন্ধু নেই বা তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন এটা মানতে পারি না। আমার স্বপ্নের মধ্যে তো বটেই, জাগরণেও তার উপস্থিতি স্পষ্টভাবে উপলদ্ধি করি। এ এক অদ্ভূত অনুভূতি, এ অনুভূতি কোনো ভাষার মাধ্যমেই কাউকে বোঝানো যায় না।

নতুন প্রজন্মকে জানিয়ে রাখি, দীর্ঘ কারারুদ্ধ জীবনের মধ্যে ১৭টি মাস প্রত্যহ এত দীর্ঘ সময় ধরে আমি যে তার নিবিড় সান্নিধ্য পেয়েছি, বাস্তবে কারাগারের বাইরে অথবা ভেতরে অনুজ তার অগ্রজের, সন্তান তার পিতার এত নিবিড় সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য হয় না। যেটি আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার হয়েছে।

আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মাতকোত্তর ডিগ্রিধারী উদ্ধত উদ্যত পূর্ণায়ত পদ্মটির মতো উদ্ভাসিত যৌবনের অধিকারী। আজকের যুবকেরা সেটি অনুধাবন করতে অক্ষম, এটি আমি শতভাগ নিশ্চিত। তখন আমাদের পুরো জীবনটা চেতনার সমস্ত অংশটুকু রাজনীতির সমুদ্রের অতলান্তে নিমজ্জিত। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনের প্রেম-ভালোবাসা, চাওয়া-পাওয়া সবকিছুই ছিল রাজনৈতিক চেতনার গভীরে নিমগ্ন। বাংলার স্বাধীনতা ছাড়া আমাদের কল্পনার আবর্তে আর কোনকিছুই তখন দোলা দিত না। এই যে স্বায়ত্বশাসন থেকে স্বাধিকার, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরণ এর অগ্রভাগে ছিলেন মুজিব ভাই। তিনি ছিলেন আন্দোলনের স্থপতি। তার কালজয়ী নেতৃত্বকে ঘিরেই আবর্তিত হয় প্রতিটি আন্দোলনের স্রোতধারা। কিন্তু এই স্রোতধারার স্রষ্টা ছিল ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধুকে বহুজনের মধ্য থেকে একক নেতৃত্বে প্রতিস্থাপিত করার পূর্ণ কৃতিত্ব ছাত্রলীগের। রাজনৈতিক চেতনা হিসেবে আমাদের চিন্তায়, মননশীলতায় সুরের মূর্ছনা তুলতো “এ মাটি আমার সোনা, আমি করি তার জন্মবৃত্তান্ত ঘোষণা”,  ‘‘সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি যে আছে মাটির কাছাকাছি”, “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর”। লাহোরে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে যখন আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলনে আইয়ুবকে উৎখাত করার জন্য পাকিস্তানের সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সর্বদলীয় কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, সেই সম্মেলনের প্রারম্ভে বঙ্গবন্ধু তখনকার পূর্ব-পাকিস্তান আজকের বাংলাদেশের তরফ থেকে ৬ দফা কর্মসূচিকে আন্দোলনের প্রধান কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করার দাবি তোলেন। এই কর্মসূচিটা তখনকার দিনে প্রশাসনে যারা বাঙালি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন সর্বজনাব আহমদ ফজলুর রহমান, রুহুল কুদ্দুস, শামসুর রহমান খান জনসন ভাই, অর্থনীতিবিদ নূরুল ইসলাম, রেহমান সোবহানসহ কয়েকজন প্রতিভাপ্রদীপ্ত সিএসপি অফিসার ৬ দফা কর্মসূচিটি গ্রন্থনা করে চরম আস্তা ও প্রতীতির প্রতীক বাংলার মানুষের স্বার্থের প্রশ্নে আপোষহীন, অকুতোভয়, দৃপ্ত চেতনার ধারক শেখ মুজিবের হাতে তুলে দেন। শেখ মুজিব ৬ দফা প্রস্তাবটি সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সর্বদলীয় বৈঠকে উপস্থাপন করেন। মুজিব ভাই তখন এতটাই প্রদীপ্ত ও অকুতোভয় মানসিকতায় উজ্জীবিত ছিলেন যে, ৬ দফা স্বাধীনতার উপক্রমণিকা এটি তার প্রতীতি ও প্রত্যয়ে পরিণত হয়। তিনি ওই সম্মেলনে নির্ভীক চিত্তে বলেন, আইয়ুব স্বৈরাচারী সামরিক শাসক, একনায়ক, গণতন্ত্রের হত্যাকারি সবই সত্য। তার স্বৈরশাসনের অবসানও অপরিহার্য। কিন্তু তার অবসানে আমার পূর্ব-বাংলার মানুষের মুক্তি ও কল্যাণ বয়ে আসবে না। তার পরিবর্তে যেকোন ছুতোয়-ছলনায় আরেকজন ক্ষমতায় এসে স্বৈরাচারী হিসেবেই প্রতিভাত হবেন। বাংলাদেশের মানুষের উপর অবিচার ও শোষণের অবসান হবে না। বরং শোষণের চারণক্ষেত্র হিসেবেই ব্যবহৃত হবে। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে আরও বলেন, স্বৈরাচারের অপসারণ চাই, আরও দৃঢ়ভাবে চাই আমার পূর্ব-বাংলা যেন শোষণের চারণক্ষেত্র হিসেবেই অব্যাহতভাবে ব্যবহৃত না হয়। আমার কৃষকের বুকের রক্ত পানি করা অর্থায়নে করাচি, রাওয়ালপিন্ডি, ইসলামাবাদ ধূসর মরুভূমি থেকে নয়নাভিরাম মহানগরীতে পরিণত হতে দেখেছি। কাশ্মিরের জন্য বারবার যুদ্ধ হয়, অথচ আমার সোনার বাংলা সম্পূর্ণ অরক্ষিত থাকে। তিনি আরও বলেন, কাশ্মিরে পাকিস্তানি সৈন্য প্রবেশের প্রাক্কালে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী লাহোর আক্রমণ না করে যদি পূর্ব-পাকিস্তান (আজকের বাংলাদেশ) আক্রমণ করতেন, তাহলে অনতিবিলম্বে গোটা পূর্ব-পাকিস্তানটাই বাধা-বিমুক্ত অবস্থায় ভারত দখল করে নিতে পারতো। মুজিব ভাই এটাও উল্লেখ করতে ভুল করেননি, যুদ্ধবাজ আইয়ুব ও তার সামরিক জান্তা পূর্ব-পাকিস্তানকে রক্ষা করার ন্যূনতম দায়িত্ববোধের পরিচয় দেননি। ৬৫-এর যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে, পূর্ব-পাকিস্তান অক্ষত ছিল পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও প্রতিরোধশক্তির কারণে নয়, ভারত তার নিজের রণকৌশলেই পূর্ব-পাকিস্তানকে তাদের আক্রমণের আওতার বাইরে রেখেছিল বলে। তিনি আরও কৌতুক করে বলেছিলেন, ১৬০০ মাইল দূরত্বে হলেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান একই দেশের অংশবিশেষ। সেখানে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকায় আসলে কাস্টম চেকিং-এর বেড়াজাল পেরিয়ে তবে আসতে হয়। পূর্ব-পাকিস্তানে ব্যবহৃত টাকার বিপরীতে কোনো রিজার্ভ সোনা বা ডলার কিছুই নেই। জিন্নাহ সাহেবের ছবি ছাপা নোটগুলো সোনা বা ডলারের কোনো শক্তিরই ভিত্তি ছিল না। গতানুগতিক ধারায় চালাতো, তাই চলতো। রাজনৈতিক ও ভৌগলিকভাবে একই রাষ্ট্রের প্রদেশসমূহে এমন অসহনীয় ও নির্লজ্জ বৈষম্য, আর্থিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় এমন করুণ দশা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এই অস্থিতিশীলতা ও অস্থিরতা থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে ৬ দফা কার্যকর করাই একমাত্র রক্ষাকবচ। ওই গোলটেবিলে উপস্থিত পাকিস্তানের দুই অংশেরই রক্ষণশীল নেতারা  অন্ধকারে ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিলেন। আর আইয়ুব খানসহ সামরিক জান্তার কাছে তো সাপের লেজে পা দেয়ার মতোই ঔদ্ধত্যপূর্ণ ছিল ওই কর্মসূচি।

এখানে একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, পাকিস্তান সৃষ্টির জন্মলগ্ন হতেই সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন সমন্বিতভাবে একটা অপ্রতিরোধ্য জান্তা তৈরি করে। যার মূখ্য কেন্দ্রভূমি ছিল পাঞ্জাব। আর নিকৃষ্ট শোষণের শিকার ছিল পূর্ব-পাকিস্তান। অন্যান্য প্রদেশগুলোও যেন পাঞ্জাবিদের জমিদারীর একেকটি তালুক ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের অন্য ৪টি প্রদেশ শোষিত ছিল; কিন্তু কখনোই তখনকার পূর্ব-পাকিস্তানের মতো দৈন্যদশা তাদের ছিল না।

৬ দফা প্রদানের প্রাক্কালে তখনকার শেখ মুজিবুর রহমান এমনকি পূর্ব পাকিস্তানেও অনেক নেতার মধ্যে অন্যতম ছিলেন। কিন্তু ৬ দফার দাবি উপস্থাপনের পর ছাত্রলীগের নিরলস ও নিরবিচ্ছিন্ন আন্দোলনের বিস্তীর্ণ পথপরিক্রমণের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগ তাকে বাংলার মানুষের হৃদয়ের সিংহাসনে মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। আমি আমার লেখনী এবং টক-শোর আলোচনায় প্রতিবারই বলেছি এবং আমৃত্যু বলতেই থাকবো, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, স্থপতি, মূর্তপ্রতীক কিন্তু একে বাস্তবায়িত করার সুদক্ষ রাজনৈতিক সৈনিক ও প্রতিস্থাপনের মূল কারিগর সন্দেহাতীতভাবে ছাত্রলীগ ও তার নেতৃত্ব। এই কারণেই বঙ্গবন্ধুকে প্রাণের চাইতে বেশি ভালোবাসলেও আমি অস্বস্তি বোধ করি, যখন আজকের প্রজন্ম এবং তখনকার বুদ্ধিজীবী মহল, যারা বঙ্গবন্ধুকে নানাভাবে সিআই-এর দালাল, ভারতের অনুচর হিসেবে আখ্যায়িত করতেন, দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসি চাইতেন তারাই আজকে বোল পাল্টে সর্বকালের সর্বনিকৃষ্ট চাটুকার হয়ে স্বাধীনতার একক কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে বন্দনা-অর্চনা করে সরকার ও আওয়ামী লীগে তাদের অবস্থানকে ক্রমাগতভাবে সুদৃঢ় করে চলেছেন। বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধৃতি দিয়েই আমি বলতে পারি, আমাদের প্রজন্মে আমার চাইতে স্নেহভাজন, বিশ্বস্ত ও প্রিয়পাত্র মুজিব ভাইয়ের আর কেউ ছিল না। তবুও স্বাধীনতার দীর্ঘ আন্দোলনের একক কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধুকে দেয়ার পক্ষপাতি আমি নই। এখানে ছাত্রলীগ তো বটেই, ইত্তেফাক, তার সম্পাদক মানিক ভাই (তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া), বার্তা সম্পাদক শহীদ সিরাজউদ্দীন হোসেনের অনবদ্য সাহায্য সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতাকে অস্বীকার করলে গোটা ইতিহাসটিই বিকৃত হয়ে যাবে।

আজকের রাজনীতির এই ডামাডোলের ক্রান্তিলগ্নে নতুন প্রজন্মকে অবহিত করা আমার নৈতিক দায়িত্ব, ৬ দফাকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানাতে গিয়ে ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ হয়েছিল। মানিক ভাইও কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। সর্বজনাব শহীদ সিরাজউদ্দীন হোসেন, মরহুম আসফ উদদৌলা রেজা, মাহমুদ উল্লাহ ভাইসহ অগণিত সাংবাদিক ও সংবাদপত্রকর্মী অনাহারে-অর্ধাহারে কী যে দুঃসহ যন্ত্রণার জীবন ইত্তেফাক বন্ধ থাকাকালীন কাটিয়েছেন, আজকে তা কল্পনা করাও কঠিন। হাইব্রিড নেতারা তো বটেই, অন্য দল থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা সাইবেরিয়ান পাখিগুলো যারা বামধারার  রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিন্ন করে নৌকায় শুধু আশ্রয়ই নেননি, নৌকার মালিকই বনতে চলেছেন; আজকে শেখ মুজিবের রক্ত যাদের ধমনীতে প্রবাহিত শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার সময় বয়ে যাচ্ছে, মস্কো, পিকিং, জাসদ, গণবাহিনী তাদের সূক্ষ্ম  রাজনৈতিক কূটকৌশল ও ষড়যন্ত্রের জাল সিরাজ শিকদার বাহিনী ও গণবাহিনী কর্তৃক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ঈদের জামাতে সংসদ সদস্য কিবরিয়া ও রাজবাড়ীতে আরেক সংসদ সদস্য কাজী হেদায়েতকে হত্যা ১৫ আগস্টের বেদীমূল রচনা করেছিল। জাসদ নেতৃত্ব এবং মস্কো-পিকিং-এর নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুকে কী অশ্লীলভাবে কখনো জাতির পিতা না জুতার ফিতা, শেখ মুজিবের চামড়া দিয়ে ঢোল বানাবো, হাড্ডি দিয়ে ডুগডুগি বাজাবো এ সমস্ত অশোভন ও নির্মম উক্তি করেছেন।

স্মরণ করলে আজও গর্ব ও প্রশান্তিতে আমার বুক ভরে ওঠে, ১৯৭০-এর নির্বাচনের কিছুকাল পূর্বে ছাত্র ইউনিয়নকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করেছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই তারাই আজকে ছাত্রলীগের প্রকৃত নেতৃত্বকে প্রায় নির্বাসিত করে ফেলেছে! যে নৌকার গুণ টানতে গিয়ে আমাদের মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে গেছে, আজকে শেখ হাসিনাকে সামনে বসিয়ে ক্ষমতার পাল তুলে চরম প্রশান্তিতে ক্ষমতার সিংহভাগ ভোগ করছেন তারা। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সামরিক বাহিনীর ধিকৃত, চাকরিচ্যুত ও বিপদগামী ২৬ জন কর্মকর্তা ও সৈনিক নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করে। কিন্তু নানা রকমের মিথ্যা অপপ্রচারের মাধ্যমে দেশবাসী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সূক্ষ্ম কারিগরের মতো সিরাজ শিকদারের বাহিনী, গণবাহিনী, জাসদ তিলে তিলে এর পটভূমিকা রচনা করে। আফসোস, এককালে সর্বজনবিদিত এই নিগুঢ় সত্যিগুলো আজ রাজনীতিতে বিস্মৃতপ্রায়।

আগস্ট আসলে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ তো হয়-ই, একটা আশঙ্কায় সমস্ত হৃদয় কুঁকড়ে কেঁদে ওঠে। ভ্রান্ত বামেরা ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনাকে যেভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছেন, এর শেষ পরিণতি সামাজিক বিপর্যয়ে রূপ নেবে না তো? মৌলিক অধিকার-বিবর্জিত আজকের এই সমাজ ব্যবস্থায় কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না। অধিকার-বিবর্জিত মানুষ স্বস্থি পায় না, নিঃসংশয় চিত্ত হতে পারে না। এই হৃদয়বিদারক আগস্ট মাসে আল্লাহতায়ালার কাছে আমার ফরিয়াদ, বঙ্গবন্ধু ও তার সঙ্গে শহীদ সকলের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত, জঙ্গি-সন্ত্রাস ও মুরতাদদের হাত থেকে স্থায়ী বিমুক্তি।

স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন আওয়ামী লীগের আমি কঠোর সমালোচনা করি এই কারণে যে, তারা যেন পথভ্রষ্ট না হয়। ক্ষমতার দাম্ভিকতায় আদর্শচ্যুত না হয় এবং ক্ষমতার মূল ভিত্তি প্রান্তিক জনতাকে যেন বেমালুম বিস্মৃত না হয়। যেকোন বাহিনীর উপর অন্ধ নির্ভরতা আওয়ামী লীগের জন্য বেমানান। মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগের ক্ষমতার প্রকৃত উৎস প্রান্তিক জনতা।

বঙ্গবন্ধুকে অকালে হারানোর ক্ষতবিক্ষত আমার হৃদয়কে দীপ্তিহীন আগুনের শিখায় দগ্ধীভূত করে যখন একান্তে ভাবি, বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের গৃহটি আক্রান্ত হওয়ার পর দুই ঘণ্টার কাছাকাছি সময় তিনি হাতে পেয়েছিলেন। এই সময়ের মধ্যে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে এবং রক্ষীবাহিনীর যিনি রাজনৈতিক দায়িত্বে ছিলেন তাদের সবার সঙ্গে টেলিফোনে বারবার পরিস্থিতি জানিয়ে সাহায্যের জন্য, অর্থাৎ ওদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন। কিন্তু বারবার টেলিফোন করার পরও কারো কাছ থেকে তিনি কোনো সহযোগিতা পাননি, শুধুমাত্র কর্নেল জামিল ব্যতিরেকে। আমি প্রত্যয়দৃঢ় চিত্তে মনে করি, সশস্ত্রবাহিনী ও রক্ষীবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তো বটেই, ন্যূনতমভাবে তাদের দেহরক্ষীদের নিয়ে বের হলেও দুষ্কৃতিকারিরা পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করার পথ খুঁজে পেত না। কিন্তু দুর্ভাগ্য বঙ্গবন্ধুর, মর্মান্তিক শাহাদাতের পূর্বে তিনি বুকভরা বেদনা নিয়ে উপলদ্ধি করে গেলেন, তিনি কতটা একা, নিঃস্ব ও রিক্ত!

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে কিন্তু দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর ডাকে যারা সাড়া দেননি, নিষ্ক্রিয়, নিস্পৃহ ও নিস্তব্ধ থেকেছেন, তাদের সনাক্ত করে আওয়ামী লীগের মতো সংগঠন থেকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরে থাক, তাদের চিহ্নিত করে প্রতিবাদ ও জবাবদিহিতা পর্যন্ত চাওয়া হয়নি। বারবার সাহায্য চেয়েও নিষ্ফল হয়ে একাকীত্ব ও অসহায়ত্বের বেদনা নিয়ে বঙ্গবন্ধু মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আজও সেই গ্লানি থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। যারা নিষ্কলুষ চিত্তে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন, তারা আজও কান পাতলে হয়তো ইথারে তার বিদেহী আত্মার এই বেদনার ধ্বনি শুনতে পান।

লেখক: স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি