শিল্পী গ্রামে স্তব্ধতাপ্রেমী হোটেলে থেকে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ!

ঢাকা, সোমবার, ২৫ জুন ২০১৮ | ১০ আষাঢ় ১৪২৫

শিল্পী গ্রামে স্তব্ধতাপ্রেমী হোটেলে থেকে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ!

পরিবর্তন ডেস্ক ৬:৩৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ০৪, ২০১৮

print
শিল্পী গ্রামে স্তব্ধতাপ্রেমী হোটেলে থেকে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ!

বিশ্বকাপের সময় সব দল নিশ্চয়ই জাকজমকপূর্ণ কোনো হোটেলে থাকতে চায়। কিন্তু রাশিয়ার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড দল খেলার বাইরে যেন স্তব্ধতার গান শুনতে চাইছে! তাই তারা বেছে নিয়েছে সেইন্ট পিটার্সবার্গের ছোট্ট একটি শহর রেপিনোকে। যেটাকে গ্রাম বললেই বুঝি আদর্শ হয়। শহর থেকে খানিক দূরে গাছগাছালিতে ঘেরা সাদামাটা একটি হোটেল বেছে নিয়েছেন ইংলিশরা। ওখানে ইতিহাস আছে মিশে। ইউরোপের সংস্কৃতিতে রাশিয়ান সাম্রাজ্যের চিত্রকলাকে তুলে ধরা কিংবদন্তি শিল্পী ইলিয়া রেপিনের নামেই ওই অঞ্চলটা।

১৪ জুন শুরু বিশ্বকাপের গ্রুপর্বে শহরের কাছ ঘেঁষে থাকা গ্রামটিতে দাঁড়িয়ে ফোর-স্টার হোটেল 'ফররেস্টমিক্স ক্লাব স্পোর্ট অ্যান্ড রিল্যাক্স'। গাছের রাজ্যে শান্ত-শিষ্ট একটি হোটেল। শান্তির পরশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় চারদিক। ওখানে বিনোদনের উপাদান কম। কিন্তু আছে খুব স্বস্তিতে নিঃশব্দতা বা স্তব্ধতার মাঝে মৃত্যুর মতো ঘুমের নিশ্চয়তা।

চাকচিক্যে অভ্যস্ত ইংলিশ সমর্থকদের এমন হোটেল আবিস্কার করে একটু ধন্দেই পড়ার কথা। তাদের প্রিয় ইংলিশ দল বিশ্বকাপের মতো সর্ববৃহৎ আসরে এমন জায়গায় কেন পড়ে থাকবে! রাশিয়ার নর্দার্ন ক্যাপিটাল সেইন্ট পিটার্সবার্গের খুব কাছেও তো না। গ্রুপপর্বের ম্যাচগুলো খেলতে ভোলগা নদী থেকে পোল্যান্ডের ধার দিয়ে সব মিলিয়ে ৪ হাজার মাইল ঘুরে ফিরতে হবে ইংল্যান্ডকে। ভোলগোগ্রাদে ১৮ জুন তিউনিসিয়া, ২৪ জুন নিঝনি নভোগোরোদে পানামা এবং ৩০ জুন কালিনিংগ্রাদে বেলজিয়ামের সাথে খেলা ইংল্যান্ডের।

কিন্তু কোচ গ্যারেথ সাউথগেট রেপিনোকেই টিম হোটেলের জন্য বেছে নিয়েছেন। ফিনল্যান্ডের কাছে। একসময় ফিনদের অংশ ছিল। সাউথগেটের মতে, তার খেলোয়াড়দের এমন জায়গা দরকার পরিপূর্ণ শান্তি ও নিস্তব্ধতার জন্য, 'এমন একটি পরিবেশ আমরা চেয়েছিলাম যেখানে খেলোয়াড়রা রিল্যাক্স থাকতে পারে।'

সেইন্ট পিটার্সবার্গ থেকে ২৭ কিলোমিটার দূরে ইংল্যান্ডের আবাসের ওই গ্রাম। ইংল্যান্ড এটিকে চিনবে ইলিয়া রেপিনেরই নামে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষটায় এখানে থেকেই রেপিন তার অমর চিত্রকর্ম সৃষ্টি করে গিয়েছেন। ইলিয়া ইয়েফিমোভিচ রেপিনের জন্ম ১৮৪৪ সালে। ১৯৩০ সালে মারা যাওয়ার আগে রুশ সাম্রাজ্যের চিত্রকলাকে তখনকার বিশ্বে পরিচিতি দিয়ে গেছেন। ছিলেন রিয়ালিস্টিক পেইন্টার। উনবিংশ শতাব্দীতে রাশিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পী তিনি। তখন বিশ্ব শিল্পে রেপিনের অবস্থান লিও তলস্তয়ের সাহিত্যের সাথে তুলনা করা হতো। রাশিয়ান আর্টকে ইউরোপের মূলধারার সংস্কৃতিতে নিয়ে যেতে আসল ভূমিকা ছিল এই শিল্পীর।

১৯৪৮ পর্যন্ত ওই জায়গাটির নাম ছিল ফিন নামে, কুয়োক্কালা। পরে চিত্রকর রেপিনের নামে হয় এই অঞ্চলের নামকরণ। গাছে ঘেরা এলাকাটির দিকে রাশিয়ান শিল্পী, বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা করা এবং জ্ঞানীদের ঝোঁক ছিল বড় বেশি। পরে সোভিয়েত আমলে এটা শ্রমিক ও তাদের সন্তানদের বিশ্রামস্থল হয়েছে।

এখনো ইতিহাসের অনেক দাগ লেগে আছে রেপিনোর শরীরের। কমিউনিস্টদের কংক্রিট স্যানাটোরিয়ামও আছে। আছে সুন্দর কটেজ। চারতলা হোটেলের সাথে ইতিহাসেরই বসবাস। তবে হোটেল ম্যানেজার তাতিয়ানা যুবোশেনকো কাব্য করেই বলেন, 'আমাদের হোটেলটা স্তব্ধতাপ্রেমীদের জন্য।' ইংলিশ ফুটবলারদের মনস্তত্বে ওই স্তব্ধতাটাই নিশ্চিত করতে চাইছেন কোচ।

ইংল্যান্ড দলের এই হোটেলটি হয়েছে ২০১১ সালে। ১০৫টি রুম ওখানে। হোটেল রুম থেকে বনের সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায় খুব। চারদিকে ঘন জঙ্গল। ওখানে স্ট্যান্ডার্ড একটি রুমে থাকে দুটি আর্মচেয়ার, ল্যাপটপ সাইজের একটি টিভি স্ক্রিন। ভাড়া মোটে ১৪৫ মার্কিন ডলার। ফ্যামিলি রুমে ব্যালকনি ও কাউচ থাকে। ২৪০ ডলার ভাড়া। চারটি রেস্টুরেন্ট আছে। এমনিতে একসাথে ২০০ মানুষ থাকতে পারে হোটেলে। ২৫ মিটারের সুইমিং পুল এবং আধুনিক জিম আছে। আছে বার। ২০১৬ রিও অলিম্পিকের আগে রাশিয়ার জুডো দল এই হোটেলে থেকে তাদের শেষ প্রস্তুতি নিয়েছিল।

হোটেলের ট্রেনিং গ্রাউন্ডটাও বেশ। একটু দূরে। সাত কিলোমিটারের দূরত্ব। বাসে ১৫ মিনিট। শহরে ইংলিশ ফুটবলাররা হাওয়া লাগিয়ে আসতে পারবেন যখন তখন। ইংল্যান্ড দলের জন্য সবকিছুই আদর্শ শুধু একটি ঝামেলা। সেইন্ট পিটার্সবার্গের পালকোভা বিমানবন্দরে যেতে ৪০ লাখ মানুষের চাপের শহরের ট্র্যাফিক জ্যাম পেরুতে হয়। ওটা নিয়ম করা বেদনা। কিন্তু এত শান্তি যেখানে সেখানে থেকে বিশ্বকাপ খেলার জন্য ওইটুকু বেদনা ওখানে যাওয়ার আগেই যে মেনে নিয়েছে ইংল্যান্ড দল!

এএফপি অবলম্বনে।

ক্যাট

 
.




আলোচিত সংবাদ