ফারজানা করিমের ‘গল্পের কিছু অংশ’

ঢাকা, শনিবার, ২৬ মে ২০১৮ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

ফারজানা করিমের ‘গল্পের কিছু অংশ’

পরিবর্তন ডেস্ক ৭:৪৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮

print
ফারজানা করিমের ‘গল্পের কিছু অংশ’

এবার তোমার জন্য আমার এক অন্যরকম অপেক্ষা ছিল। প্রবল ভালোবেসে এবার তুমি দূরে গেলে। আর বলে গেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরবো। ওখানে গিয়েও তুমি প্রতিবারের মতো হারিয়ে গেলে না। আমার অনেক খবর নিলে। আমি ভাবলাম এবার কাজের ভিড়ে তুমি আমায় ভুলে যাওনি। আমার মনটা অব্যক্ত আনন্দে ভরে উঠলো। অপেক্ষার তীব্র যন্ত্রণাকে আর যন্ত্রণা মনে হলো না প্রথমবারের মতো।

তোমার ফেরার সময় হলো। আমি আজ স্নান শেষে অনেক সেজেছি। মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তাকাচ্ছি। দুবার ফোন করেও ফেললাম। নাহ বন্ধ এখনো। মানে প্লেন এখনো মাটির স্পর্শ পায়নি।

তারপর একসময় তোমার সত্যিকারের ফোনটি এলো। একটা মানুষ কেমন স্পষ্ট ভাষায় বলল, আপনি তাড়াতাড়ি আসুন, আপনার পরিচিত এই মানুষটি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন।

আমি লোকটাকে তুমি ভেবে বেশ বকতে যাচ্ছিলাম মিথ্যে অভিমানে। আমার এবার অপেক্ষার একটুও যন্ত্রণা হয়নি। কিন্তু এয়ারপোর্টে যাওয়ার রাস্তাটা এতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে কেন?

খুব মনে করার চেষ্টা করলো ঋদ্ধি। পারলো না। যাবার আগে রাকিব যা বলে গিয়েছিল কেন কিছুই মনে পড়ছে না। ওর কেমন যেন ঠাণ্ডা লাগছে, বাইরে ভয়ঙ্কর গরম। এবারে বর্ষা কেবলই আসি আসি করছে। গ্রীষ্মে প্রচুর বৃষ্টি অথচ গরমটা কমছে না। আজকের আবহাওয়াটা খুব বাজে। আকাশ মেঘে ঢাকা কিন্তু একটা বাজে গরম। বাতাসের ছিটেফোঁটা নেই। কোথাও নিম্নচাপ হচ্ছে হয়তো। প্রেশারটাও বেড়েছে মনে হচ্ছে। আচ্ছা কথায় কথায় এখন প্রেশার মাপবে কে? যখন-তখন ফার্মেসিতে রিকশা দাঁড় করিয়ে?

বাবু, প্রেশারটা মাপবে এসো।

আরে বাবা কিছু না তো। একটু মাথা ধরেছে শুধু।

না, তুমি না বললে ঘাড় ব্যথা করছে তোমার?

ওটা প্রেশারের না।

তো কিসের? তোমার অনেক ঘাম হচ্ছে। তোমার প্রেশার বেড়েছে। নামো। প্রেশারটা একটু মেপে নিই।

না, এখন না।

নাম বলছি। ঠ্যাটায়ে একটা চড় দেবো কিন্তু, নাম।

ঋদ্ধি নামবে। এবং যথারীতি প্রেশার মাপার জন্য হাতটা বাড়িয়ে দেবে, রাকিব প্রথমে ফার্মেসির ছেলেটার মাপা প্রেশারের মাপ মেনে নেবে না। ওকে দেবে অনেক জোরে একটা ধমক। তারপর ওর কাছ থেকে যন্ত্রটা নিয়ে নিজেই ঋদ্ধির প্রেশার মাপবে।

হুম ঠিক আছে।

আচ্ছা রাকিব, প্রতিবার তুমি দেখ ফার্মেসির ছেলেটা ঠিকমতো মাপে, তবু এমন করো কেন?

সাবধান থাকি বুঝলে? যেন তোমার কোন লুকানো অসুখ-বিসুখ না থাকে।

এভাবে বলতে বলতে একসময় তুই করে ডাকতে শুরু করে রাকিব।

এমনিতে তুই আমার চেয়ে বয়সে বড়। তোকে অনেক দিন বাঁচতে হবে বুঝলি গাধী? আমার আগে তুই মরতে পারবি না।

ঋদ্ধির কেমন যেন লাগে। এতো ভালোবাসতে পারে একজন মানুষ!

নিজের গাড়িতে করেই রওনা হয়েছে ও। ঘেমে শরীর ভিজে গেছে অনেকটা।

সোহেল এসি টা আরেকটু বাড়াও তো।

অনেক দিনের পুরনো ড্রাইভার সোহেল। ঋদ্ধিকে খুব বোঝে। ঋদ্ধি গরম সহ্য করতে পারে না। তাই ঋদ্ধি গাড়িতে উঠলেই সোহেল খুব সতর্ক থাকে। গাড়িতে যেন বাজে গন্ধ না থাকে। এসি ফুল করে শুরুতেই গাড়িটা একদম ঠাণ্ডা করে নেয়। বেশ সন্ত্রস্ত হয়ে সোহেল বলে-

ম্যাডাম এসি ফুল দেয়া আছে।

ঋদ্ধির কেমন ভয় করছে। কেমন যেন ক্ষিধেও পাচ্ছে। খাওয়া হয়নি। উত্তেজনায় খেতে ইচ্ছে করছিল না কিছুই। রাকিব আসবে। রাকিব আসবে- ও যেন তোতা পাখির মতো জপ করছিল মনে মনে।

এত কষ্ট হচ্ছে। অথচ কান্না আসছে না। এরকম গা গোলানো টাইপ কষ্ট হচ্ছে কেন? বমি হয়ে যাক না।

সোহেল, গাড়িটা একটু সাইড করো।

জি ম্যাডাম। 

ঋদ্ধি অনেক চেষ্টা করলো বমি করার। হচ্ছে না।

ম্যাডাম, একটু পানি খাইবেন?

আছে গাড়িতে?

জী।

এক দমে পানিটা খেয়ে ফেললো ঋদ্ধি। সাথে সাথে হড়হড় করে বমি।

অসহ্য কষ্ট হচ্ছে।

ম্যাডাম, আমি একটু পরে স্টার্ট দিই। আপনি কিছু খান। পেট খালি মনে হয়। শুধু পানি বারাইসে।

না না। দেরি হয়ে যাবে। চল।

গাড়ি চলতে আরম্ভ করলো।

ঋদ্ধি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু মনে করছে। কিন্তু কয়েকটা স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই মনে পড়ছে না। এমন কি রাকিবের মুখটাও ঠিকমতো চোখে ভাসছে না। আশ্চর্য তো!

আচ্ছা মোবাইল এ ছবি আছে তো গত সপ্তাহের। ঋদ্ধি মোবাইল খুলে দেখল।

হতেই পারে না। এইতো সেদিন। গত সোমবার রেস্টুরেন্টে বসে ছিল। যথারীতি রাকিব ওকে চামচে তুলে খাইয়ে দিচ্ছিল। এইতো সেই ছবিটা। গ্লাসের ফাঁকে ঋদ্ধির মুখটা তোলা। এটা রাকিব শুরু থেকেই করতো।

পরিচয় হয়েছে পর্যন্ত ঋদ্ধি রাকিবের সামনে কখনো নিজের হাতে কিছু খেতে পারেনি। রাকিব খুব যত্ন করে এক প্লেটে খাবার নিতো আর ওকে খাইয়ে দিতো। নিজেও খেতো।

না না। ও ভুল শুনেছে মনে হয়। লোকটা ভুলে ওকে কল করেছে। চাপা যন্ত্রণা নিয়ে ঋদ্ধির ইচ্ছে হলো অনেক শব্দ করে কাঁদে। কিন্তু সোহেলের সামনে পারছিল না।

এই গাড়িতে রাকিবের সাথে বহুবার চড়েছে ঋদ্ধি। রাকিব অতি সন্তর্পণে ওর ডান হাতটা ধরে ফেলতো গাড়িতে উঠেই। সারা রাস্তা আর ছাড়তো না। আরেকটা কাজ খুব বেশি করতো রাকিব। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় ঋদ্ধির কোমরে খুব হাত রাখতো। এটা ঋদ্ধির সবচেয়ে ভালো লাগার। আচ্ছা রাকিবের সবকিছু এতো ভালো লাগে কেন?

তবে একটা কাজ খুব বিরক্ত লাগতো। মোবাইল ঘাঁটাঘাঁটি। ঋদ্ধিকে কে কখন কি মেসেজ পাঠায় সব রাকিবের নখদর্পণে। ঋদ্ধির বরকে নিয়ে ওর কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু ঋদ্ধির আর কোনো বন্ধু থাকতে পারবে না। রাকিব রীতিমতো ক্ষেপে যেত যখন দেখতো ঋদ্ধি কারো সাথে কথা বলেছে রাতে মেসেজের মাধ্যমে। মাঝে মধ্যে ঋদ্ধির দম বন্ধ লাগতো। এত ভালোবাসে কেন? আর প্রায়ই ও রাকিবকে বলতো তুমি আমাকে এত বদ অভ্যাস করাচ্ছ। সারাক্ষণ তুমি তুমি তুমি। তুমি কোথাও দূরে গেলে আমি তো মরে যাবো। শোন তোকে ছেড়ে আমি কোথাও গেলেই তো। সারাক্ষণ এভাবেই তোকে জ্বালাবো ।

রাকিব। ৩০ বছরের যুবক। একদিন হঠাৎ ফেসবুকে ঋদ্ধির কিছু ছবি দেখে ফেলে। ছিপছিপে গড়নের মেয়েটির বয়স বোঝার কোনো উপায় নেই। কে বলবে ওর মেয়ে এইচএসসি দেবে এবার। বয়স ৩৬। চেহারাটা কবিতার মতো। খুব ভালো গান গায়। রাকিব ওকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায়। কিছুক্ষণ ভালো করে দেখে ঋদ্ধি অ্যাকসেপ্ট করে। তারপর সেই রাতে রাকিব গুনে গুনে ঋদ্ধির ৪টা ছবিতে লাইক দেয়। ঋদ্ধি এটা খেয়াল করে। সেও গুনে গুনে রাকিবের ৪টা ছবিতে লাইক দেয়। পরদিন আবার একই অবস্থা। পরদিন আবারো। ঋদ্ধি মনে মনে হাসে। বোঝে ছেলেটা যোগাযোগ করতে চাইছে। কেন যেন ভালো লাগতে থাকে ওর। তারপর রাকিব নিজেই এগিয়ে আসে চ্যাট-এ। সেদিন ঋদ্ধি ওর গানের অনুষ্ঠানের কিছু ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছিল। রাকিব লিখল,

আপনার আর কখনো কোনো গানের প্রোগ্রাম থাকলে আমাকে বলবেন। আমি দেখতে যাবো।

আচ্ছা বলব।

আমি আপনাকে খুব পছন্দ করি।

আচ্ছা

আপনি অনেকটা আমার মায়ের মতো। কপালে আমার মাও এভাবেই টিপ পরেন।

তাই? ভালো তো।

মায়ের ছবি পাঠাচ্ছি। দেখুন। আপনার সাথে অনেক মিল। সাথে সাথে মায়ের একটা ছবি পাঠায় রাকিব।

ঋদ্ধি বেশ অবাক হলো। অনেক মিল। সত্যি অনেক মিল।

ঋদ্ধি হঠাৎ কিছু না ভেবেই লিখে ফেললো,

আপনার মা কেমন আছেন?

ভালো না। বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছি।

মানে?

উনার একটা জটিল অসুখ আছে। বেশিদিন বাঁচবেন না।

আপনার বাসা কোথায়?

দিলু রোড। মগবাজার।

আমি কি আপনার মাকে একটু দেখতে আসতে পারি?

রাকিব খুবই অবাক। একইসাথে ঋদ্ধি অবাক নিজের আচরণে। ও কেন গায়ে পড়ে এই ছেলেটার মাকে দেখতে যেতে চাইছে? ওর মাথাই কাজ করছে না। ওর শুধু মনে হচ্ছে ওর যেতে হবে। মানুষটাকে দেখতে হবে।

ঋদ্ধি লিখল, আমি কাল সন্ধ্যায় আসছি আপনার বাসায়। আপত্তি নেই তো।

কি যে বলেন? এত মেঘ না চাইতেই জলের জোয়ার।

আপনার ঠিকানাটা দিন। আর ফোন নম্বরটা।

ব্যাস এটুকুই।

পরদিন সন্ধ্যায়। রাকিব বন্ধুদের নিয়ে গল্প করছে আর বারবার ফোনের  দিকে তাকাচ্ছে। ঋদ্ধির ফোন আসছে না। মেয়েটা ফাজলামি করলো না তো? বন্ধুরা নানান গল্প করছে। কোনো কিছুতেই রাকিবের মন নেই। শুধু ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে বারবার। আর কেবলই ভাবছে ঋদ্ধি ওকে ঠকিয়েছে। এভাবে ফেসবুকে একটা মানুষের প্রেমে পড়ে নাকি কেউ। ওর মতো গাধা ছাড়া। নিজের ওপর খুব বিরক্তি বোধ হয়। তাছাড়া সারপ্রাইজ দেবার জন্য মাকেও কিছু জানায়নি। মা দরজা খুলে অবাক হবে যখন দেখবে একটা মেয়ে একদম মায়ের মতো মুখ।

এসব ভাবতে ভাবতেই কলিং বেল বাজলো।

রাকিব কেন যেন ভেবে বসে এইবার ঋদ্ধি এসেছে। ছুটে মায়ের ঘরে আসে। মা একটা মেয়ে এসেছে। দরজাটা তুমিই খোলো। একটু অবাক হও।

রাকিব খুব চুপচাপ স্বভাবের। এত উত্তেজিত ওকে কখনো দেখেননি নাসিমা। অসুস্থ শরীর নিয়েও উঠে পড়লেন। খুব আগ্রহ ভরে জানতে চাইলেন।

কেন, কে এসেছে?

যাও আগে,  খোলো দরজাটা। নাসিমা গেলেন। দরজা খুললেন।

একটা অপরূপ সুন্দরী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নাসিমা  সত্যিই অবাক হলেন এতো মিল দেখে তার নিজের সাথে। মেয়েটি কেমন যেন খুব বিব্রত। এদিক-ওদিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, এটা কি রাকিবের বাসা?

এসো মা। আদর ভরে নাসিমা ঋদ্ধিকে ঘরে নিয়ে বসালেন।

রাকিব সোফায় বসেই বলল, একটা ফোনও করলেন না। ঠিকানা এতো সহজে চিনে ফেললেন?

রাকিব ভেবেছিল ঋদ্ধি অন্য মেয়েদের মতো ঘেনঘেন করবে। বাসা চিনবে না হয়তো। রাকিবের হয়তো রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কিছুই করতে হলো না। মেয়েটা ঠিক ঠিক পৌঁছে গেল। আর মেয়েটা সত্যি মায়ের মতো কেন? অপূর্ব দেখতে। শুধু মা শ্যামলা। মেয়েটার মিষ্টি গায়ের রঙ। 

এভাবেই পরিচয়ের প্রথম পর্বটা রাকিবের সাথে ঋদ্ধির। কিন্তু ঋদ্ধি অবাক হলো রাকিবের মাকে দেখে। দিব্যি সুস্থ একটা মানুষ। তাহলে রাকিব কি মিথ্যে বলল? নাসিমা ওদের রেখে নিজের ঘরে চলে গেলেন। মহিলাটা এতো সুন্দর করে হেঁটে গেলেন বোঝার উপায় নেই তিনি বাঁচবেন আর মাত্র কদিন। ঋদ্ধির খুব সন্দেহ হলো। রাকিব নিশ্চয়ই মিথ্যে করে মায়ের কথা বলে ওকে এখানে এনেছে।

প্রশ্নটা করতে যাবে ঠিক তখন রাকিব নিজেই বলল, আমার মাকে দেখে অবাক হলেন? তাই না? আজ একটু সুস্থ। দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। যে কোনও সময় মারা যেতে পারে। খুব কষ্টে বাঁচিয়ে রেখেছি।

রাকিবের বাসায় কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে চলে যাবার সময় রাকিব নিচ পর্যন্ত নামলো। ঋদ্ধি গাড়িতে ঢুকে দরজা বন্ধ করেই আবার খুলল।

এই যে রাকিব সাহেব, এটা আমার গানের অ্যালবাম। সময় পেলে শুনতে পারেন। রাকিব অ্যালবামটা নেবার জন্য যেই না মাথাটা ঝোঁকালো চোখ পড়লো ঋদ্ধির চোখের দিকে। কিছুক্ষণ অপলক চেয়ে রইল রাকিব। খুব সম্ভবত ওটাই প্রথম প্রেমের দৃষ্টি বলে রাকিব আর ঋদ্ধির ধারণা। ঋদ্ধি প্রায় বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, একটা এসএমএস উড়ে এলো ফোনে।

আপনাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। আপনি কি বাসায় পৌঁছে গেছেন? জানাবেন।

সেই থেকে ওদের দেখা হওয়া। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একসাথে যাওয়া। ঋদ্ধি বুঝতেই পারেনি কখন কবে রাকিব ওকে এক অদ্ভুত বন্ধনে বেঁধে চলেছে। আদর যাকে বলে রাকিব ঋদ্ধিকে ঠিক তাই করতো।

ভালোবাসার চেয়েও বেশি।

ঋদ্ধির কেমন একটা শূন্য অনুভূতি হচ্ছে। ও কি জয়কে ফোন করবে? জয় চট্টগ্রাম গেছে। আজ বিকেলের ফ্লাইটে আসার কথা। কিভাবে বলবে ও রাকিবের কথা। ১৮ বছরের সংসার জীবনে জয়কে সে কিছুই লুকায়নি। কোনো দিন না। সুন্দর সুখি জীবনটাতে অতৃপ্তি ছিল না তো কিছুর। মিষ্টি একটা সংসার। শুধু জয় আর ঋদ্ধির চাওয়ায় বিস্তর ব্যবধান। ওইটুকু মেনে নিতেই হয়। মা বলেছে। ঋদ্ধির কাছে প্রিয় ছিল শ্রাবণের বৃষ্টি। আর জয় ভালোবাসে শীতকাল। বাংলাদেশে সব কালেই গরম। গরম ওর একেবারেই পছন্দ নয়। জয়ের কথা শুনতে শুনতে আর ওর সুরে সুর মেলাতে মেলাতে ঋদ্ধিও আজকাল শীতকাল ভালোবাসে। এই রাকিব একটা ছেলে কোথা থেকে যে উড়ে এসে বসলো। ঋদ্ধির সব এলোমেলো হয়ে গেল। সব সবকিছু। কিন্তু ছেলেটা অদ্ভুত। সে কখনো ঋদ্ধিকে সংসার ভাঙতে বলে না। কোনো দিন কিছু এলোমেলো করে দেয় না। বরং গুছিয়ে দেয়। ঋদ্ধির মেয়েটা ওর প্রাণ। রাকিব এলেই মেয়েটা এতো খুশি হয়। রাকিব ওর সাথে এমনভাবে কথা বলে ঋদ্ধি শুধুই অবাক হয়। আসলে রাকিব ওর এক অন্যরকম বন্ধু। যার কাছে সব কিছু খুলে বলা যায়। কোনো গোপনীয়তা ছাড়া পুরোটা জীবনের সমস্ত কষ্ট, ভালোলাগা, বিরক্ত লাগা বলে ফেলা যায়। আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো রাকিব ওর জীবনে আসার পর জয়ের সাথে সম্পর্কটা যেন আরো মজবুত হয়েছে। জয় ওকে এখন অনেক বোঝে। ঋদ্ধি যে পাগলামিগুলো ভালোবাসতো জয় সবকিছু করার চেষ্টা করে এখন। ঋদ্ধি রাকিবকে বলেছে এটা, রাকিব শুধু বলে, শোন, আমি এসেছি তোমার না পাওয়াগুলো সব পূরণ করে দিতে। বুঝলে রাজকন্যা? ঋদ্ধি অবাক হয়। দুদিকে বসবাস। দুটো দু রকমের ভালোবাসা। একদিকে রাকিব। একদিকে জয়। জয়ের জন্য মনটা ততবারই কোমল হয়ে ওঠে যতবার রাকিবের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়।

ঋদ্ধির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠার মাত্র ছয় মাসের মাথায় রাকিবের মা মারা গেলেন। ঋদ্ধি বিশাল একটা সময় রাকিবের মায়ের সাথে ছিল। অত্যন্ত  ঘনিষ্ঠ হয়েছিল হাসপাতালের ক’টা দিন।  যাবার আগে নাসিমা ঋদ্ধির হাত ধরে কেবল বলে গেলেন, আমার ছেলেটাকে একটু দেখে রাখিস। ও কোনো দিন কারোর কোথা শোনেনি শুধু আমার কথা ছাড়া। আমার মনে হয় ও তোর কোথা শুনবে। ও বিয়ে করবে না আমি জানি। তুই শুধু একটু দেখে রাখিস ওকে।

ঋদ্ধির সবকিছুই রাকিবের ভালো লাগে। সবচেয়ে ভালো লাগে ওর শাড়ি পরাটা। ২ মিনিটে শাড়ি পরে মেয়েটা। একটুও সাজে না। শুধু চোখে কাজল আর একটা ছোট টিপ। তাতেই ওকে পরীর মতো লাগে। কে বলবে মেয়েটার বয়স ৩৬। এখনো বাচ্চা মেয়ের মতো। ঋদ্ধির ভেতর যে একটা অসম্ভব অনুভূতিপ্রবণ মানুষ আছে, এটাই রাকিব ধীরে ধীরে বের করে নিয়ে আসে।

খুব জোরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল হঠাৎ। সোহেল বলল, ম্যাডাম, অনেক জ্যাম লেগে গেল রাস্তায়। দেরি হবে।

সম্বিৎ ফিরে পেল ঋদ্ধি। ফোনের দিকে তাকালো। না আর কোন ফোন আসেনি এয়ারপোর্ট থেকে। আচ্ছা? ঋদ্ধি ভুল শোনেনি তো?

এমন করে বৃষ্টি ঝরছে কেন? পুরো শহর তো পানিতে ডুবে যাবে। রাকিব ওকে প্রথম দেখিয়েছে বৃষ্টিতে নৌকায় করে ভিজতে কেমন লাগে। আর রাকিবের কাজ হলো শুধু ছবি তোলা। কত যে ছবি তুলেছে ও এই ২ বছরে। শুধুই ঋদ্ধির ছবি। সেই প্রথম বৃষ্টিভেজা চুমু। অনেক অনেকক্ষণ ধরে। ঋদ্ধির খেয়াল ছিল না ওরা নৌকায়। সবকিছু দুলছে। কেমন যেন একটা অনুভূতি। ওর মনে হচ্ছিল। ও যেন সেই কিশোর বেলায় ফিরে গেছে। সদ্য কিশোরী হতে যাওয়া মেয়েটার ঠোঁট ছুয়ে গেল একটা নরম কাঁশফুল। নদীর ওপারে ঠিকই কাঁশের দেশ ছিল। ওরা ওখানটায় নৌকা ভিড়িয়ে ভিজেছিল কিছুটা সময়।

একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো ঋদ্ধির গালে। তার উষ্ণতায় আবার যেন বাস্তব জীবনে ফিরে এলো ঋদ্ধি। এমন করে কষ্ট হচ্ছে কেন?

অবশ্য কয়েক মাস ধরে ওদের সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছিল না। রাকিব খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছিল কাজে। ঢাকা-কলকাতা লেগেই ছিল। আর কলকাতা গেলেই রাকিবের কি যেন হয়। হারিয়ে যায়। কোনো খবর পাওয়া যায় না। ঋদ্ধির খুব অস্থির লাগে। কিন্তু এবার কলকাতায় যাবার পর রাকিব অন্যরকম ছিল। বারবার শুধু ফোন করেছে। বারবার শুধু বলেছে ঋদ্ধি তোমাকে খুব মিস করছি। আমি শিগগির চলে আসবো। এইতো কাল রাতেও কথা হয়েছে। ঋদ্ধিকে একটা নীল শাড়ি পরে থাকতে বলেছে।

তাহলে এমন হলো কেন? ঋদ্ধি ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছে। নানা জনের ফোন আসছে। ধরতে ইচ্ছে করছে না। ঋদ্ধি বারবার স্মৃতি হাতড়াচ্ছে। একবার ডুবছে একবার ফিরে আসছে।

সোহেলের ডাকে আবারো ঘোর কাটলো।

ম্যাডাম চলে আসছি। নামেন।

খুব স্বাভাবিকভাবেই নামলো ঋদ্ধি। যেন কিছুই হয়নি। এয়ারপোর্টের ঝামেলাগুলো ঋদ্ধি একটু কম বোঝে। কোনদিকে ইন্টারন্যাশনাল, কোনদিকে ডোমেস্টিক খুব গণ্ডগোল করে। ওকে ইতস্তত করতে দেখে একজন কর্মকর্তা এগিয়ে এলেন।

ম্যাডাম। কাউকে খুঁজছেন?

জী। একজন মারা গেছেন কলকাতার ফ্লাইট-এ।

কলকাতার ফ্লাইট-এ?

জী, আমাকে ফোন করে জানানো হয়েছে।

না ম্যাডাম। কলকাতার ফ্লাইট তো বৃষ্টির জন্য এখনো ল্যান্ড করতে পারেনি। চট্টগ্রাম থেকে আসা ফ্লাইটে একজন মারা গেছেন। হার্ট অ্যাটাক করে। আপনি কি তাঁর কথা বলছেন?

জী? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।

আপনি আমার সঙ্গে আসুন। আপনার কি চট্টগ্রাম থেকে কারোর ফেরার কথা?

জী, আমার স্বামী। কিন্তু সে তো বিকেলে ফিরবে। কিন্তু আমার একজন বন্ধুর কলকাতা থেকে ফেরার কথা। ওর কথাই তো আমাকে বলেছে।

কথা বলতে বলতে ওরা লাশের সামনে গিয়ে পৌঁছালো।

একজন কর্মকর্তা এগিয়ে এলেন। ম্যাডাম, আপনার নাম কি ঋদ্ধি?

জী।

জয় ইফতেখার আপনার কে হন। আমরা এইমাত্র তাঁর ডিটেইল পেলাম। আর উনার মোবাইলে লাস্ট কল ছিল আপনাকে করা কাল রাতে। ওখান থেকেই আপনাকে খবরটা দিয়েছি। এই নিন ম্যাডাম। আমাদের কিছু ফরমালিটিস আছে। কিছু সাইন লাগবে আপনার ডেডবডি নিতে হলে। আপনার সাথে কি আর কেউ এসেছেন?

এএল/

 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad