ফেনীতে পর্যটন শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা

ঢাকা, বুধবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৭ | ৩ কার্তিক ১৪২৪

ফেনীতে পর্যটন শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা

আবদুল্লাহ আল-মামুন, ফেনী ৭:০৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০১৭

print
ফেনীতে পর্যটন শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা

ফেনীতে পর্যটন শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ শিল্পের বিকাশে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ। মাত্র ৯৮৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ঐতিহাসিক জেলাটি দেশের মানচিত্রে খুব কম স্থান দখল করলেও পর্যটন শিল্পে রাখতে পারে বিশাল অবদান।

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় দেশের বৃহত্তম মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকায় গড়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে এ এলাকার চিত্তাকর্ষক নৈসর্গিক শোভা ও মনোমুগ্ধকর অসংখ্য দৃশ্য বিদ্যমান। ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯৮৭ সালে নির্মিত মুহুরী সেচ প্রকল্পের ৪০ গেট বিশিষ্ট রেগুলেটর ও ক্লোজার ড্যামটি দেখতেও আকর্ষণীয়। এছাড়া নদীর পাড়ে সবুজ বনানী ঘেরা মায়াবী পরিবেশ। শীতকালে অতিথি পাখির আগমন ও তাদের কলকাকলি যে কাউকে মুগ্ধ করবে।

নদীতে নৌকার সারি, মাছ ধরা ও নৌকা ভ্রমণের দৃশ্য ভ্রমণ পিয়াসী মানুষদের আকৃষ্ট করে। প্রতিবছর শীত মওসুমে বহু দেশি-বিদেশি পর্যটক ও পিকনিক পার্টির আগমন ঘটে এখানে। এখানকার মৎস্য খামারগুলোও দেখার মতো।

সোনাগাজী ও চট্টগ্রামের সাথে দ্বিমুখী সড়ক যোগাযোগ ভৌগলিক অবস্থান, পরিবেশ সবকিছু মিলিয়ে দারুণ দর্শনীয় স্থান। কিন্তু এখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৬ কক্ষ বিশিষ্ট একটি রেস্ট হাউজ ছাড়া থাকা-খাওয়ার আর কোনো সুব্যবস্থা নেই। এতে দর্শনার্থীদের বিপাকে পড়তে হয়।

এছাড়া শহরের মধ্যেই অসংখ্য দৃশ্য বিদ্যমান। বড় মসজিদের অনতিদূরে রয়েছে ফেনীর আধ্যাত্মিক সাধক পাগলা মিয়ার মাজার।

শহরের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে ঐতিহাসিক রাজাঝির দীঘি। প্রাচীর ঘেরা দীঘির ৪ পাশে রয়েছে প্রায় ৩ কি.মি. রাস্তা।

আরেকটি ঐতিহাসিক দীঘি রয়েছে শহর থেকে ২ কিলোমিটার পশ্চিমে। রাজা বিজয় সিংহের স্মৃতি ধারণ করে আছে সুবিশাল বিজয়সিংহ দিঘী। দীঘি ও সবুজ বনানীর দৃশ্য ছাড়াও পাশে আছে সার্কিট হাউজ।

এছাড়া শহরের অদূরে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত পুরাতন বিমান বন্দর, আছে গার্লস ক্যাডেট কলেজ ও কম্পিউটার ইনস্টিটিউট।

সোনাগাজীর দর্শনীয় স্থানের মাঝে রয়েছে ইরি বোরো ধানের ওপর গবেষণার জন্য একমাত্র প্রতিষ্ঠান সোনাগাজী ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। এখানে কর্মরত আছেন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাবৃন্দ।

সোনাগাজী বাজার সংলগ্ন স্থানে রয়েছে হাঁস নিয়ে দেশের একমাত্র গবেষণাগার আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার। পাশেই রয়েছে মেষের লোম দিয়ে হাতের তৈরি উন্নত ধরনের কার্পেট বুনন শিল্প।

সদর থানার শর্শদি গ্রামে পূর্ববঙ্গের স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের দ্বিতীয় রাজধানী ছিল। সেই সময়ের কিছু কিছু নিদর্শন সেখানে আজও বর্তমান। শর্শদিতে সুলতান মুবারক শাহের প্রতিষ্ঠিত একটি সেনানিবাস ও হাম্মাম খানাও রয়েছে। এছাড়া শর্শদি মসজিদ ও সাগর দীঘি আজও সেই শাসকের স্মৃতি বহন করছে।

ফেনী শহর থেকে ৪ কিলোমিটার উত্তরে ফতেহপুর গ্রামে পুরাতন কেল্লা আছে।

ফেনীর ঐতিহাসিক স্মৃতি নিদর্শন :

ভাটির বাঘ শমসের গাজী আনুমানিক ১৭১০ সালে আধুনিক ফেনী জেলার নিজকঞ্জরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম পীর মোহাম্মদ এবং মায়ের নাম কৈয়ারা বেগম।

এখানে দর্শনীয় স্থান হলো শমসের গাজীর বাড়ীর সুড়ঙ্গ পথটি। এটি ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত। লম্বায় ৫০ ফুট। কথিত আছে গাজীর পরিবারের সদস্যরা ওই পাশের পুকুরে যাতায়াতের জন্য সুড়ঙ্গটি তৈরি করেছেন। শমসের গাজীর মায়ের নামে কৈয়ারা দীঘি খনন করেন।

শিলুয়ার শিল পাথর বিশাল প্রাচীন ধ্বংসবিশেষ। সবগুলোর বেলে পাথর। সম্ভবত মূল মূর্তির ওপর থেকে ভেঙ্গে পড়া দুটি অংশ দুই পাশে পড়ে আছে। ছাগলনাইয়ার চম্পক নগরে রয়েছে এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন। ছাগলনাইয়ায় এছাড়াও রয়েছে দর্শনীয় সাত মন্দির।

এছাড়া রয়েছে শুভপুর ব্রিজ। মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে এখানে যুদ্ধ হয়।

এখানে আছে ঐতিহাসিক বিলোনিয়া স্থলবন্দর। ফেনী থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে পরশুরামের বিলোনিয়ায় ১৯৬৫ সালের আগে বিলোনিয়া চেকপোস্ট স্থলবন্দর হিসাবে চালু হয়। সে সময় ভারতীয় পণ্য সামগ্রী চট্টগ্রাম বন্দরে আনা নেওয়া হত এ রেলপথে।

১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট অলাভজনক ঘোষণা করে রেল বিভাগ এটিকে বন্ধ ঘোষণা করে। বর্তমানে স্থলবন্দরটি আবার চালু হয়েছে। অপরদিকে ফেনী শহরের অদূরে কাশিমপুর গ্রামে আছে ঐতিহ্যবাহী কামার শিল্প ও কামার সম্প্রদায়। আবার ছাগলনাইয়ার চম্পক নগরের মৃৎশিল্পও ঐতিহ্যের ধারক বাহক।

ফেনীর পূর্বাঞ্চলের স্বনামধন্য জমিদার ছিলেন চাঁদগাজী ভূঞা। তার নির্মিত চাঁদগাজী ভূঞা মসজিদ মোঘল স্থাপত্যের অনুকরণে এক অপূর্ব সৌধমালা। এখনও দর্শক পর্যটকদের বিস্মিত করে এটি।


ফেনীর অচিন বৃক্ষ বাংলাদেশের উদ্ভিদ জগতে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। বিরল প্রজাতির এ গাছটি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। এটিও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

এসব ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোও পর্যটন শিল্পের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে। এ সকল নিদর্শন দেখার জন্য সারা বছরই ভিড় করছে দর্শনার্থীরা।

ফেনী চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি সাহিদ রেজা শিমুল বলেন, এসব নিদর্শনগুলো রক্ষায় ও পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে।

এতে করে ফেনীর পর্যটন শিল্প থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করা সম্ভব হবে।

এএম/জেআই

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad