স্মৃতির অপূর্ব সৌধ তাজমহল

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ মে ২০১৮ | ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

স্মৃতির অপূর্ব সৌধ তাজমহল

পরিবর্তন ডেস্ক ১২:৪৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০১৮

print
স্মৃতির অপূর্ব সৌধ তাজমহল

তাজমহল ভারতের আগ্রায় অবস্থিত একটি রাজকীয় সমাধি। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রী আরজুমান্দ বানু বেগম যিনি মুমতাজ মহল নামে পরিচিত, তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই অপূর্ব সৌধটি নির্মাণ করেন। সৌধটি নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে যা সম্পূর্ণ হয়েছিল প্রায় ১৬৫৩ খ্রিস্টাব্দে। সৌধটির নকশা কে করেছিলেন এ প্রশ্নে অনেক বিতর্ক থাকলেও, এ পরিষ্কার যে শিল্প-নৈপুণ্যসম্পন্ন একদল নকশাকারক ও কারিগর সৌধটি নির্মাণ করেছিলেন যারা উস্তাদ আহমেদ লাহুরীর সাথে ছিলেন, যিনি তাজমহলের মূল নকশাকারক হওয়ার প্রার্থীতায় এগিয়ে আছেন।

তাজমহলকে (কখনও শুধু তাজ নামে ডাকা হয়) মুঘল স্থাপত্যশৈলীর একটি আকর্ষণীয় নিদর্শন হিসেবে মনে করা হয়, যার নির্মাণশৈলীতে পারস্য, তুরস্ক, ভারতীয় এবং ইসলামী স্থাপত্যশিল্পের সম্মিলন ঘটানো হয়েছে। যদিও সাদা মার্বেলের গোম্বুজাকৃতি রাজকীয় সমাধীটিই বেশি সমাদৃত, তাজমহল আসলে সামগ্রিকভাবে একটি জটিল অখণ্ড স্থাপত্য। এটি ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম তাজমহল।তখন একে বলা হয়েছিল "universally admired masterpiece of the world's heritage।"

১৬৩১ খ্রিস্টাব্দে শাহ জাহান, যিনি মুঘল আমলের সমৃদ্ধশালী সম্রাট ছিলেন। তার স্ত্রী মুমতাজ মহল-এর মৃত্যুতে প্রচণ্ডভাবে শোকাহত হয়ে পড়েন। মুমতাজ মহল তখন তাদের চতুর্দশ কন্যা সন্তান গৌহর বেগমের জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

তাজমহলের নির্মাণ কাজ মুমতাজের মৃত্যুর খুব শীঘ্রই শুরু হয়। মূল সমাধিটি সম্পূর্ণ হয় ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে এবং এর চারদিকের ইমারত এবং বাগান আরও পাঁচ বছর পরে তৈরি হয়। ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে আগ্রা ভ্রমণ করে ফরাসি পর্যটক ফ্রান্সিস বেরনিয়ার (François Bernier) লিখছিলেন,

‘দু’টো বিস্ময়কর সমাধির বিবরণ দিয়ে আমি চিঠিটি শেষ করবো যারা আগ্রাকে দিল্লীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ করেছে। একটি নির্মাণ করেছেন সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর পিতা আকবরের সম্মানে এবং অন্যটি সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রীর স্মরণে তৈরি করেছেন "তাজমহল", যা অসাধারণ সৌন্দর্য্যের অধিকারী, স্বামী তাঁর স্ত্রীর শোকে এতই শোকার্ত যে স্ত্রী জীবনে যেমন তার সাথেই ছিলেন, মরণেও তিনি তার কবরের কাছেই থাকবেন।’

তাজমহল তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী নকশার উপর, বিশেষ করে পারস্য ও মুঘল স্থাপত্য অনুসারে। নির্দিষ্ট কিছু নকশা তিমুর ও মুঘল ইমারতের মত হুবহু করা হয়েছে। যাদের মধ্যে তিমুরের গুর-ই-আমির, সমরখন্দে মুঘল সাম্রাজ্যের পূর্বসূরী, হুমায়ূনের মাজার, ইমাদ-উদ-দৌলার মাজার (কখনো ডাকা হয় শিশু তাজ নামে), এবং দিল্লীতে শাহজাহানের নিজের তৈরি দিল্লী জামে মসজিদ। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায়, মুঘল ইমারত পরিমার্জনের এক নতুন স্তরে পৌছায়।যেখানে পূর্ববর্তী মুঘল ইমারতসমূহ তৈরি হয়েছিল লাল বেলে পাথরে, শাহজাহান চালু করেছিলেন সাদা দামি মার্বেল পাথরের প্রচলন।

বাগান:
তাজমহলের সামনের চত্বরে একটি বড় চারবাগ (মুঘল বাগান পূর্বে চার অংশে বিভক্ত থাকতো) করা হয়েছিল। ৩০০ মিটার X ৩০০ মিটার জায়গার বাগানের প্রতি চতুর্থাংশ উচু পথ ব্যবহার করে ভাগগুলোকে ১৬টি ফুলের বাগানে ভাগ করা হয়। মাজার অংশ এবং দরজার মাঝামাঝি অংশে এবং বাগানের মধ্যখানে একটি উঁচু মার্বেল পাথরের পানির চৌবাচ্চা বসানো আছে এবং উত্তর-দক্ষিণে একটি সরল রৈখিক চৌবাচ্চা আছে যাতে তাজমহলের প্রতিফলন দেখা যায়।

এছাড়া বাগানে আরও বেশ কিছু বৃক্ষশোভিত রাস্তা এবং ঝরনা আছে।চারবাগ বাগান ভারতে প্রথম করেছিলেন প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর, যা পারস্যের বাগানের মতন করে নকশা করা হয়েছিল। চারবাগ মানেই যাতে স্বর্গের বাগানের প্রতিফলন ঘটবে।

মুঘল আমলের লেখায় এক ফার্সি মরমিবাদী স্বর্গের বাগানের বর্ণনা দিয়েছিলেন আদর্শ বাগান হিসেবে, যাতে পূর্ণ থাকবে প্রাচুর্যে। পানি বা জল এই বর্ণনায় একটি বড় ভূমিকা রেখেছে।ঐ লেখায় আছে, স্বর্গের বাগানের মাধ্যখানে একটি পাহাড় থেকে তৈরি হয়েছে চারটি নদী, আর তা আলাদা হয়ে বয়ে গেছে বাগানের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে।

অন্যান্য ইমারতসমূহ:
তাজমহল এর চত্বরটি বেলে পাথরের দুর্গের মত দেয়াল দিয়ে তিন দিক থেকে বেষ্টিত। নদীর দিকের পাশটিতে কোন দেয়াল নাই। এই দেয়াল বেষ্টনির বাইরে আরও সমাধি রয়েছে যার মধ্যে শাহজাহানের অন্য স্ত্রীদের সমাধি এবং মুমতাজের প্রিয় পরিচারিকাদের একটি বড় সমাধি রয়েছে। এ স্থাপত্যসমূহ প্রধানত লাল বেলে পাথর দ্বারা তৈরি, দেখতে সেসময়কার ছোট আকারের মুঘল সাধারণ সমাধির মতন।

ভিতরের দিকে (বাগান) দেয়ালগুলো স্তম্ভ এবং ছাদ সম্বলিত। যা সাধারণত হিন্দু মন্দিরে দেখা যেত এবং পরে মুঘলদের মসজিদের নকশায় আনা হয়েছিল। দেয়ালগুলোয় বিচিত্র গম্বুজাকৃতির ইমারত দিয়ে সংযুক্ত যা থেকে বেশ কিছ জায়গা নজরে আসে, যা পর্যবেক্ষণ চৌকি হিসেবে ব্যবহার করা হত। যা বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।তাজমহলে ঢোকার প্রধান ফটক বা দরজাও তৈরি হয়েছে মার্বেল পাথরে। দরজাটির নকশা ও ধরন মুঘল সম্রাটদের স্থাপত্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এর খিলানসমূহের আকৃতি হুবহু সমাধির খিলানসমূহের অনুরূপ এবং এর পিস্তাক খিলান সমাধির ক্যালিগ্রাফি বা চারুলিপির নকশার সাথে মিলিয়ে করা হয়েছে। এর ছাদে অন্যান্য বেলে পাথরের ইমারতের মতই নকশা করা আছে সুন্দর সুন্দর জ্যামিতিক আকৃতি।জাওয়াবের ভিতরের নকশা চত্বরের একেবারে শেষে বেলেপাথরের দু’টো বিশাল ইমারত রয়েছে যার সমাধির দিকের অংশ খোলা। এদের পিছন ভাগ পূর্ব ও পশ্চিম দিকের দেয়ালের সমান্তরাল।

তাজ মহল মসজিদ দু’টো ইমারত দেখতে একেবারে হুবহু যেন একটা আরেকটির প্রতিচ্ছবি। পূর্ব দিকের ইমারতটি মসজিদ, অন্যটি হল জাওয়াব (উত্তর), যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারসাম্য রক্ষা করা (যা মুঘল আমলে মেহমানদের থাকার জন্য ব্যবহৃত হত)। জাওয়াব আলাদা শুধু এর মেহরাম নেই আর এর মেঝে নকশা করা যেখানে মসজিদের মেঝে ৫৬৯ জন্য মুসল্লি নামাজ পড়ার জন্য কালো পাথর দিয়ে দাগ কাটা।

মসজিদটির প্রাথমিক নকশা শাহজাহানের তৈরি অন্যান্য ইমারতের মতই। বিশেষ করে তার মসজিদ-ই-জাহান্নুমা অথবা দিল্লী জামে মসজিদ- একটি বড় ঘর যার উপর তিনটি গম্বুজ। মুঘল আমলের মসজিদগুলোর নামাজ পড়ার জায়গা তিন ভাগে ভাগ করা থাকতো। বড় নামাজ পড়ার জায়গা এর দু'পাশে সামান্য ছোট নামাজ পড়ার জায়গা। তাজমহলের প্রত্যেকটি নামাজ পড়ার জায়গায় উপরে বিশাল গম্বুজ আছে কিন্তু জায়গাটি খোলা। ইমারতটির নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছিল ১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে।

ভিত্তিটি আদতে একটি কোণগুলো ভাঙ্গা ঘনক্ষেত্র, প্রতিদিকে প্রায় ৫৫ মিটার (ডানে, মেঝের পরিকল্পনা দেখুন)। লম্বা পাশে একটি বড় পিস্তাক, অথবা বড় ধনুক আকৃতির পথ, আইওয়ানের কাঠামো, সাথে উপরে একই রকমের ধনুক আকৃতির বারান্দা। এই প্রধান ধনুক আকৃতির তোরণ বৃদ্ধি পেয়ে উপরে ইমারতের ছাদের সাথে যুক্ত হয়ে সম্মুখভাগ তৈরি করেছে। তোরণের অপর দিকে, বাড়তি পিস্তাকসমূহ উপরে পিছনের দিকে চলে গেছে, পিস্তাকের এই বৈশিষ্টটি কোণার দিকে জায়গায় একইভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। নকশাটি সম্পূর্ণভাবে প্রতিসম এবং ইমারতের প্রতিটি দিকেই একই রকম। চারটি মিনার রয়েছে, ভিত্তির প্রতিটি কোণায় একটি করে মিনার, ভাঙ্গা কোণার দিকে মুখ করে রয়েছে।

মালামাল সামগ্রী ও উপাদান:
তাজমহল তৈরি হয়েছে সারা এশিয়া এবং ভারত থেকে আনা বিভিন্ন উপাদান সামগ্রী দিয়ে। নির্মাণ কাজের সময় ১,০০০ এরও বেশি হাতি ব্যবহার করা হয়েছিল নির্মাণ সামগ্রী বহন করে আনার জন্য। আলো-প্রবাহী অস্বচ্ছ সাদা মার্বেল পাথর আনা হয়েছিল রাজস্থান থেকে, ইয়াশ্‌ব্‌- লাল, হলুদ বা বাদামী রঙের মধ্যম মানের পাথর আনা হয়েছেল পাঞ্জাব থেকে। চীন থেকে আনা হয়েছিল ইয়াশ্‌ম্‌- কঠিন, সাধা, সবুজ পাথর, স্ফটিক টুকরা। তিব্বত থেকে বৈদূর্য সবুজ-নীলাভ (ফিরোজা) রঙের রত্ন এবং আফগানিস্তান থেকে নীলকান্তমণি আনা হয়েছিল। নীলমণি- উজ্জ্বল নীল রত্ন এসেছিল শ্রীলঙ্কা এবং রক্তিমাভাব, খয়েরি বা সাদা রঙের মূল্যবান পাথর এসেছিল আরব থেকে। এ আটাশ ধরনের মহামূল্যবান পাথর সাদা মার্বেল পাথরেরে উপর বসানো রয়েছে।

১৯ শতকের শেষ দিকে লর্ড কার্জন তাজমহল পুণঃনির্মাণের একটি বড় প্রকল্প হাতে নেন। প্রকল্পের কাজ ১৯০৮ সালে শেষ হয়। তিনি তাজমহলের ভিতরের মঞ্চে একটি বড় বাতি (যা কায়রো মসজিদে ঝুলানো একটি বাতির অনুকরণে তৈরি করার কথা ছিল কিন্তু তৎকালীন কারিগরেরা ঠিক হুবুহু তৈরি করতে পারেনি) বসিয়েছিলেন। তখনই বাগানের নকশা পরিবর্তন করে ইংরেজ পার্কের মত করে গড়া হয় যা এখনও রয়েছে।

বিংশ শতাব্দিতে তাজমহলের ভাল রক্ষণাবেক্ষণ হয়। ১৯৪২ সালে যখন জার্মান বিমান বাহিনী এবং পরে জাপানি বিমান বাহিনী দ্বারা আকাশপথে হামলা চালায় তৎকালীন সরকার তখন তাজমহল রক্ষার জন্য এর উপর একটি ভারা তৈরি করেছিল।১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তান-বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় তাজমহলকে ভারা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল যাতে বিমান চালকদের ভ্রম তৈরি করে। কারণ ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বব্যাপি অকুন্ঠ সমর্থন জুগিয়েছিল ।

দিল্লি থেকে আগ্রা মাত্র ২০০ কি.মি.।চাইলে আপনি ট্যাক্সি ভাড়া করে দিল্লি থেকে আগ্রা যেতে পারেন।৭ সিটের জাইলো গাড়ী পেয়ে যাবেন ২৫০০-৩০০০ রুপির মধ্যে।চাইলে বাস/ট্রেনেও যেতে পারেন।কলকাতা থেকে রাজধানী এক্সপ্রেসে দিল্লি।ভাড়া এসি থ্রী-টায়ার ৩০০০ রুপি।(তৎকাল)।দিল্লি থেকে জাইলোতে আগ্রা।আগ্রাতে প্রচুর দালাল আপনার পেছনে লাগবে।কাউকে পাত্তা দিবেন না।আগ্রা পৌঁছে নিজে হোটেল ঠিক করুন এবং ঘোরার জন্য গাড়ীও নিজে ঠিক করুন।

তথ্য: টিওডি

ইসি/

 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad