নবম শতাব্দী নয়, ‘শূন্য’ ব্যবহার ৬০০ বছর আগে

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ৯ কার্তিক ১৪২৪

নবম শতাব্দী নয়, ‘শূন্য’ ব্যবহার ৬০০ বছর আগে

পরিবর্তন ডেস্ক ১:১৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭

print
নবম শতাব্দী নয়, ‘শূন্য’ ব্যবহার ৬০০ বছর আগে

গোটা বিশ্ব এখন যেভাবে চলে, প্রাচীন ভারত সেই পথে চলা শুরু করেছিল ১৭০০ বছর আগেই! শূন্য বা জিরোর জন্ম অনেক আগেই হয়েছিল ভারতে। খ্রিস্টের জন্মের ৩০০ বছরের মধ্যে। আর সেই শূন্যকে ‘ডট’ দিয়ে লেখা হতো সেই সময়, যেভাবে লেখা হয় আধুনিক গণিত ও বিজ্ঞানে।

আমরা ইংরেজি বাক্যে ‘ডট’ দেই বা বাক্যের শেষে ব্যবহার করি ‘ফুল স্টপ’। আধুনিক গণিতেও শূন্যকে ‘ডট’ দিয়ে লেখে গোটা বিশ্ব। আর ঠিক সেইভাবেই সংখ্যার ভূবনের এই শূন্য বা জিরো লেখার চল ছিল প্রাচীন ভারত ভূখণ্ডে, খ্রিস্টের জন্মের তিন শতকের মধ্যেই।

আর তা লেখা হত ভূর্জপত্রে। বার্চ গাছের ছাল বা বাকলকেই বলা হয় ভূর্জপত্র। প্রাচীন ভারত ভুখণ্ডের বাখশালী গ্রামে (অধুনা তা পাকিস্তানের পেশোয়ারে) পাওয়া একটি ভূর্জপত্রে মিলেছে তেমন ‘ডট’-এর হদিস।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দাবি, বাখশিলা গ্রাম থেকে পাওয়া ওই ভূর্জপত্রটি ১৭০০/১৮০০ বছর আগেকার। খ্রিষ্টীয় তৃতীয়/ চতুর্থ শতকের। কার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে ওই ভূর্জপত্রটির বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে বলে গবেষকদের দাবি।

যে সংখ্যা নিয়ে এত অঙ্ক, পাটিগণিত, বীজগণিত, ক্যালকুলাস, জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, নিউটন, আইনস্টাইনের যাবতীয় তত্ত্ব, সেই সংখ্যার ব্রহ্মাণ্ডে যে আদি ও অনন্ত, ‘কিং মেকার’, সেই শূন্য বা জিরোর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সংখ্যা-সাম্রাজ্যের যাবতীয় গূঢ় ও জটিল রহস্য। এর আগে জানা ছিল, খ্রিস্টীয় নবম শতকে শূন্যের জন্ম হয়েছিল প্রাচীন ভারত ভূখণ্ডে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বার্চ গাছের ছাল দিয়ে বানানো ওই ভূর্জপত্রগুলোকে বলা হয় ‘বাখশালী পুঁথি’। অধুনা পাকিস্তানের ভূখণ্ডে পড়া বাখশালী গ্রাম থেকেই ওই পুঁথির প্রথম সন্ধান মেলে বলে গ্রামের নামেই নামকরণ হয়েছে ওই পুঁথির। ১৮৮১ সালে মাটি খুঁড়ে ওই পুঁথি উদ্ধার করা হয়। তারপর সেটিকে নিয়ে যাওয়া হয় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বোদলেইয়ান লাইব্রেরিতে। ১৯০২ সাল থেকে সেই লাইব্রেরিতেই রয়েছে সেই বাখশালী পুঁথি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের বিশিষ্ট অধ্যাপক মার্কাস দু’সতয় বলেছেন, ‘এই আবিষ্কার গণিতশাস্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী ঘটনাগুলোর অন্যতম। এই প্রথম জানা গেল, খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকেই প্রাচীন ভারতে শূন্যের আবিষ্কার ও তার ব্যবহার শুরু হয়ে গিয়েছিল, যা পরে আধুনিক পৃথিবীর যাবতীয় তাত্ত্বিক গবেষণার সবচেয়ে মৌলিক উপাদান বলে স্বীকৃত হয়েছে।’

বাখশালী পুঁথিই যে প্রাচীন ভারতের গণিতচর্চার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ও নিখুঁত প্রমাণ, তা আগেই জানা ছিল। কিন্তু তা এতটাই প্রাচীন যে তার বয়স আন্দাজ করাটা গবেষকদের পক্ষে আদৌ সহজ হচ্ছিল না। শেষমেশ কার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানতে পেরেছেন ওই বাখশালী পুঁথি খ্রিষ্টীয় তৃতীয় বা চতুর্থ শতকের। গবেষকরা জানিয়েছেন, যে পুঁথিগুলি তারা হাতে পেয়েছেন সেগুলিতে শূন্য বোঝাতে হাজার হাজার ‘ডট’ লেখা রয়েছে। এটাই প্রমাণ করে প্রাচীন ভারতের বাখশালী আর তার আশপাশের এলাকায় শূন্যের কি বহুল ব্যবহার ছিল।

অন্য কোনো সংখ্যার সঙ্গে শূন্যকে যোগ বা বিয়োগ করলে তার কোনো পরিবর্তন হয় না। গুণ করলে সেই সংখ্যাটা শূন্য হয়ে যায়। আর কোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে তা অসীম হয়, এ সব জানা সত্ত্বেও বাখশালী পুঁথিতে শূন্যের বহুল ব্যবহার দেখে গবেষকদের এই বিশ্বাস আরও জোরালো হয়েছে, প্রাচীন ভারতের মানুষ বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের চেয়ে অনেক আগেই গণিতশাস্ত্রে যথেষ্ট পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন।

গবেষকরা জানিয়েছেন, এর আগে প্রাচীন ভারতে শূন্যের ব্যবহারের যে প্রমাণ মিলেছিল, তা নবম শতকের। মধ্যপ্রদেশের গ্বালিয়রের একটি মন্দির গাত্রে সেই শূন্যের প্রতিকৃতি খোদাই করা ছিল। মায়া বা ব্যাবিলনীয় সভ্যতাতেও শূন্যের ব্যবহারের চল ছিল। কিন্তু এখন যেভাবে গোটা বিশ্বে শূন্যকে ‘ডট’ দিয়ে বোঝানো হয়, তা যে প্রাচীন ভারতে অনেক দিন আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল, বাখশালী পুঁথি।

তথ্য ও ছবি : এবিপি

ইসি/

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad